বিশ্বজনীন তাবলীগ জামাতঃ ব্যতিক্রম বাংলাদেশ।

লেখকঃ আবু ওবায়দুল্লাহ, নিউইয়র্ক।

প্রারম্ভিকাঃ

আজ থেকে ৩০ বছর আগে দেশ ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছি। কিন্তু মন সব সময় পড়ে থাকে দেশের বাড়িতে। দেশের কোন ভাল সংবাদ পেয়ে মনটা ভরে যায়। আর যখন কোন দুঃসংবাদ শুনি অকপটে চোখ দুটি সিক্ত হয়ে আসে। বাচ্চারা বলে আব্বু তুমি ঘরে এসেই বাংলাদেশের খবর নিয়ে ব্যস্ত থাক কেন? আমি বলি, যে দেশের আলো, বাতাস, মাটি, পানিতে এই শরীর তৈরি হয়েছে তাকে কি করে ভুলি। বাংলাদেশ কোন সময়ই বিশ্বে প্রথম হতে পারবে না, এটা কঠিন সত্য। কিন্তু ধর্মীয় দিক থেকে, বিশেষ করে তাবলীগ জামাতের মেহনতের দিক দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করে রেখেছিল। বিশেষ করে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা বিশ্বের সব দেশের মুসলমানদের মন কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু শয়তানের বদ নজর থেকে এটা রেহাই পায়নি। সার্কভুক্ত আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর নজরে এটা ছিল এক হিংসার কারন। বর্তমানে তারা কামিয়াব হয়েছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। পাকিস্তান থেকে উদ্ভব “আলমী শুরা” নামে এক ষড়যন্ত্র কমবেশি প্রায় অনেক দেশেই চলিতেছে। এটা নতুন কিছুই নয়। তাবলীগের ভিতর ঘাপটি মেরে পড়ে থাকা ষড়যন্ত্রকারী একটি বিশেষ গ্রপ দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছর ধরে তাবলীগ ধ্বংসের চেষ্টা করে যাচ্ছে। যেটা প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগ থেকেই আমরা গুনগুনানি শুনেছি। কিন্তু এর প্রভাব আজ অবধি বিশ্বের কোন দেশে তেমন নজরে আসেনি। এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৭০ ভাগ দেশে ষড়যন্ত্রকারী এই গোষ্ঠী “আলমী শুরা” এর অবস্থান শূন্যের কোটায়। বাকী যে ৩০ ভাগ দেশ আছে, সেখানে তাদের ৫ শতাংশ লোকও নাই। আজ অবধি বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীতে কোথাও কোন সামান্যতম অপ্রীতিকর ঘটনাও শুনতে পায়নি। পুরা দুনিয়ায় যে বিষয়টা চলিতেছে, সেটা হলো, ইমারত ও শুরা নিয়ে। কিন্তু শুধু বাংলাদেশেই এর রুপ হলো ভিন্ন। “ওলামা” ও “আওয়াম”। এখন প্রশ্ন হলো, বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ কেন ব্যতিক্রম?

আসুন কতকগুলি “কেন” একএিত করে এর রহস্য উদঘাটন করি।

(১) সারা দুনিয়াতে সমস্যা হলো “ইমারত” ও “শুরা”। বাংলাদেশে ” ওলামা” ও “আওয়াম” কেন?

(২) সারা বিশ্বে কোথাও কোন ঝগড়াঝাটি বা মারামারি নাই কিন্তু বাংলাদেশে হেদায়েতের পূণ্য ভূমি টঙ্গীর ময়দানে শহীদের রক্ত ঝরলো কেন?

(৩) পুরো বিশ্বে “আলমী শুরা” এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোন মজমা কায়েম করতে পারে নাই। তবে এ বছরই বাংলাদেশে প্রথম টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি পাইলো কেন?

(৪) সারা দুনিয়ায় কোন দেশেই সরকার বা প্রশাসন তাবলীগের কাজে হস্তক্ষেপ করে নাই কিন্তু বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম হলো কেন?

(৫) মাওলানা সাদ সাহেব দাঃবাঃ পুরো দুনিয়ায় দাওয়াতের মেহনতে চষে বেড়াচ্ছেন। প্রায় প্রত্যেক সপ্তাহে কোন না কোন দেশে ইজতেমা হচ্ছে। ঐ সকল ইজতেমায় লাখ লাখ থেকে কোটি কোটি দেশী-বিদেশী মানুষের উপস্থিতি হচ্ছে। ঐ সকল ইজতেমায় মাওলানা সাদ সাহেবকে বাঁধা দেওয়ার সামান্য একটা নজিরও নেই। এমতাবস্থায় মাওলানা সাদ সাহেবের বাংলাদেশে আসতে মানা কেন?

(৬) বিগত ৫৪ বছর যাবত টঙ্গী ইজতেমায় ৩০-৪০ হাজার বিদেশি মেহমান আসেন, অথচ এইবার দুই ধাপেও ১(এক) হাজার বিদেশি মেহমান আসেন নাই কেন?

(৭) প্রত্যেক বছর ৫-৭ হাজার জামাত টঙ্গীর ইজতেমা থেকে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়, এবার ১(এক) হাজারের নিচে কেন?

(৮) সারা দুনিয়ায় তাবলীগ জামাতে কোন মাইকিং, মিটিং, মিছিল, পোষ্টার, ফেস্টুন, ওজাহাতি জোড় নাই। বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতে এসকল নতুন জিনিসের আমদানী হলো কেন?

(৯) পুরো দুনিয়ায় দাওয়াতে তাবলীগের হক ওলামাগন একমত যে মিথ্যা, গীবত, শেকায়েত, চোগলখোরি, ঝগড়াঝাটি, ফ্যাসাদ, মারামারি, মারকাজ-মসজিদ দখল, মসজিদ থেকে জামাত বের করে দেওয়া, মুসলমানদের কাফের আখ্যা দেওয়া ইত্যাদি হারাম। তবে বাংলাদেশে এসব জায়েজ কেন?

(১০) দেওবন্দ সহ পুরো দুনিয়ার ওলামায়ে কেরামগন মাওলানা সাদ সাহেব দাঃবাঃ কে বড়ই ইজ্জতের সাথে দেখে। বিশ্বের সমস্ত মুসলমানদের কাছে যিনি অতি প্রিয় ও সম্মানের পাএ। কিন্তু বাংলাদেশের কতিপয় জমহুর কতিথ ওলামাদের কাছে তিনি মুরতাদ বা কাফের কেন?

(১১) পুরো দুনিয়ায় এখন পর্যন্ত একজন আলেমও পাওয়া যায় নাই যে, মাওলানা সাদ সাহেবকে মুরতাদ বা কাফের বা ইয়াহুদীর দালাল বলেছেন কিন্তু বাংলাদেশের কতিপয় কতিথ আলেমদের মুখে অনর্গল ফতোয়া বের হচ্ছে কেন?

(১২) দুনিয়া জোড়া যতগুলি কওমী মাদরাসা আছে ছাএরা কোরআন, কিতাব নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের কওমী ছাএদের হাতে লাঠি ও ইটপাটকেল কেন?

(১৩) সারা দুনিয়ায় কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাঠশালায় ব্যস্ত দেখা গেলেও, বাংলাদেশের কওমী শিক্ষার্থীদের মাঠে দেখা যায় কেন? যেমনঃ শাপলা চওর, এয়ারপোর্ট, টঙ্গীর ময়দান, কাকরাইল মারকাজ।

(১৪) সারা দুনিয়ায় কওমী শিক্ষার্থীদের আদবকায়দা, ভদ্রতা, বিনয়ী ইত্যাদি শিক্ষা দেওয়া হয়। বাংলাদেশে তাদের বেয়াদব ও সন্ত্রাসী বানানো হচ্ছে কেন?

(১৫) বিশ্বের সমস্ত ওলামায়ে কেরামগন সাধারণ ও বিনয়ী ভাষায় বয়ান করেন কিন্তু বাংলাদেশের কতিথ জমহুর ওলামাগন কখনো উচ্চস্বরে, আবার কখনো কর্কশস্বরে, আবার কখনো সুর মাতাইয়া, কখনো রাজনৈতিক স্টাইলে ওয়াজ করেন কেন?

(১৬) বঙ্গবন্ধু টঙ্গীর মাঠকে দিয়েছিলেন তাবলীগের কাজে কিন্তু গত ২০১৮ সাল সহ এবছর টঙ্গীর মাঠ হেফাজতে ইসলামের দখলে ছিল কেন?

(১৭) বিশ্বের কোথাও শোনা যায়না ওলামারা চুক্তিবদ্ধ হয়ে ওয়াজ মাহফিল করেন। কিন্তু বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম কেন?

(১৮) মসজিদ হলো মুসলমানদের অতি নিরাপদ ও পবিত্র জায়গা। কিন্তু বাংলাদেশে মসজিদ আবাদকারীদেরকে মারধোর করে বের করে দেওয়া হচ্ছে কেন?

আসুন তাহলে আমরা দেখি এর মূল কারণ কি!

বড় সহজভাবে বলা যায়ঃ

(১) হুজুগে বাঙালি।

(২) রাজনৈতিক ওলামে কেরাম।

(৩) দীনকে দুনিয়া কামাইয়ের সহজ উপায় হিসাবে ব্যাবহার করা।

(৪) বিনা তাহকিকে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

এর সমাধান একান্ত জরুরি। অন্যথায় বাংলাদেশ মুসলিম জগৎ থেকে অচিরেই ছিটকে পড়বে। আমেরিকাতে বিশ্বের সব দেশের মানুষ বাস করে। তাদের কাছে লজ্জায় আমরা মুখ দেখাতে পারিনা। শুধু একটাই কথা, “তোমাদের দেশে কি হচ্ছে?”

আমাদের কাছে সহজভাবে এর সমাধান হলোঃ

(১) সরকার যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিলেন তাহার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, আন্তরিক ও দ্রুত সেই প্রজ্ঞাপন সারা দেশে বাস্তবায়ন করা। অন্যথায় ঘরে-ঘরে, পাড়ায়-পাড়ায় যে ভাবে আগুন ছড়াচ্ছে, তাতে সরকার বাহাদুরও নিরাপদ থাকবেন না।

(২) তৃতীয় শক্তির হাত থেকে তাবলীগ জামাতকে মুক্ত করতে হবে। যেমনঃ মাদরাসা ওয়ালারা ছাএদের লেখা পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। খানকা ওয়ালারা মুরিদান নিয়ে মশগুল থাকবেন। সবই দীনের কাজ কিন্তু ক্ষেএ আলাদা।

(৩) বাংলাদেশকে মুসলিম বিশ্ব থেকে আলাদা করার ক্ষেএে মাষ্টার মাইন্ড হিসাবে কাজ করছেন বাংলাদেশী আমেরিকান একজন ডক্টরেট ডিগ্রীধারী নিউইয়র্ক শহরের অধিবাসী এক প্রতাপশালী। যার ডান হাত হলো জনৈক মুফতি নজরুল ইসলাম এবং বাম হাত হলো জনৈক ইন্জিনিয়ার মাহফুজ। এই নেটওয়ার্ক যদি সরকার বন্ধ করতে পারে তাহলে তাবলীগ জামাতের বাংলাদেশের সমস্যা রাতারাতি ৫০ ভাগ কমে যাবে।

পরিশেষে নিবেদনঃ

বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, হোম মিনিস্ট্রি, রিলিজিয়াস মিনিস্ট্রি, ওলামে কেরাম, তাবলীগের মেহনতি ভাই-বোনদের সমীপে এই প্রবাসী বাংলাদেশি আমেরিকান হিসাবে এই অধম আল্লাহর গোলামের বিনীত অনুরোধ আসুন জিদ ও হিংসা ভুলে গিয়ে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া সোনার বাংলাকে বিশ্বের মাঝে আাবারো প্রথম কাতারে দাঁড় করি। তাবলীগের মোবারক মেহনতকে আগে বাড়ার সুযোগ করে দিই।

Advertisements