ফিরে দেখা টঙ্গী ইজতেমা ২০১৮ || কাকরাইল মারকাজে হজরতজীর অবরুদ্ধ দিনগুলি।

শামীম হামিদী।

ফিরে দেখা টঙ্গী ইজতেমা ২০১৮ || কাকরাইল মারকাজে হজরতজীর অবরুদ্ধ দিনগুলি।

◆ কাকরাইল মারকাজে হজরতজী মাওলানা সাদ সাহেবের তিনদিনঃ

ক) স্থানীয় সাথীদের সাথে মুজাকারা।
খ) ১০০+ দেশের শূরাদের সাথে মুজাকারা এবং তাজাকা প্রদান।
গ) বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার জিম্মাদার সাথীদের সাথে মুজাকারা এবং মার্চে নিজামুদ্দিনে বাংলাদেশ জোড়ে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ। (যা ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।)
ঘ) উপস্থিত প্রায় ৩০০০ সাথীর তরতীব সম্পন্ন হওয়া।
ঙ) ভারতের ত্রৈমাসিক মাসোয়ারাকে আলমী মাসোয়ারায় রূপান্তর। এই মাসোয়ারায় স্থানীয়দের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সাথীদেরও অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান এবং তাকাজা আদান প্রদানের সুযোগ দেয়ার ফয়সালা।
চ) পরবর্তী টঙ্গী ইজতেমার তারিখ তায় করা।
ছ) আলমী মাসোয়ারার জন্য দুটি স্থান তায় করা, নিজামুদ্দিন এবং হজের মৌসুম।

যদি হজরতজী মাওলানা সাদ সাহেব ঐ সময়ে ইজতেমায় থাকতেন, এসব ফয়সালা করতে কয়েক বছর লেগে যেত। কারণ ইজতেমা চলাকালে সময় বের করা আসলেই খুব কঠিন। এভাবে মারকাজে ফ্রী সময় পাওয়া গেছে আলহামদুলিল্লাহ। প্রায় দশ বছরের তাকাজা এই তিনদিনে সম্পন্ন হয়।

◆ হজরতজী মাওলানা সাদ সাহেবের অন্তর্দৃষ্টিঃ

যদি হজরতজী মাওলানা সাদ সাহেব এবং তাঁর জামাত উদ্ভূত বৈরী পরিবেশের কারণে বাংলাদেশে না আসতেন তাহলে এটা বেশ উঁচু পর্যায়ের শিরক হত। কেননা তখন এটা বলা যেত যে তিনি পরিবেশ থেকে তাসীর নিয়েছেন এবং খুরুজ থেকে পিছিয়ে গেছেন।

এমন বৈরী পরিবেশে বাংলাদেশ সফর করা ছিল আল্লাহর উপরে তাঁর অত্যন্ত উচ্চ স্তরের ইয়াকীন ও নির্ভরশীলতার প্রমাণ। এবং এটাই এই মেহনতের সহীহ নববী নাহাজ, অর্থাৎ, “মেহনত আমাদের জিম্মায়, ফলাফল আল্লাহর জিম্মায়।”

যদি এই মেহনতটি না হত তাহলে এটি একটি আত্মরক্ষা এবং নিজের জ্ঞান, বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার উপরে নির্ভরতার একটি নজীর হয়ে থাকত।

এছাড়া, যদি মাওলানা সাদ সাহেব বাংলাদেশ সফর না করতেন আল্লাহ তায়ালার অদেখা ওয়াদার উপরে ইয়াকীনের বদলে চোখের দেখার উপরে আমল করার একটি নজীর হয়ে থাকত। এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার উপরে আস্থা ও নির্ভরতার বিপরীত নজীর স্থাপিত হত। ঈমানের খোলাসা হল আল্লাহর উপরে নির্ভরতা এবং সমস্ত কিছুর বিপরীতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওয়াদা এবং ও’ঈদ (ধামকি বা সতর্কতা) স্মরণে রাখা। এর বিপরীত হল নিজের জ্ঞান, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার উপরে নির্ভর করা।

একটি সহীহ রেওয়াতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু কাতাদাহ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু প্রতিনিয়ত দুআ করতেন, “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা আপনার ওয়াদার উপরে আশা রাখে এবং আপনার ধামকির (ও’ঈদ) ব্যাপারে ভয় করে। হে কল্যাণের মালিক, হে দয়াময় প্রভু!”

যদি এ কথা মাথায় রাখি যে, ৭০ জন কুরআনের আলেম কুরআনের তাবলীগ ও তালীম করতে গিয়ে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ও নিরস্ত্র অবস্থায় শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন, এটা ছিল আল্লাহর উপরে সেই নির্ভরতা যা, যে কোন বোঝা হালকা করে দেয়। সেই তুলনায় তো আমরা অনেক আরামে আছি আলহামদুলিল্লাহ, আমালে দাওয়াতে মশগুল আছি।

◆ ফিকহী মাসআলাঃ

যদি কোন মসজিদে নির্ধারিত ইমাম থাকেন সেখানে ইমামের অনুমতি ছাড়াই যদি অন্য কেউ জবরদস্তি করে নামাজ আদায় করায়, সেক্ষেত্রে মূল ইমাম ঐ জামাতে হাজির না থাকলে কারোই নামাজ হবে না।

এখান থেকে আমরা পাই, যখন দাওয়াত ও তাবলীগের ইমাম মাওলানা সাদ সাহেব উপস্থিত আছেন, অন্যরা তাঁর অনুমতি ছাড়া জবরদস্তিমূলক ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় এবং মাসোয়ারা ও ইজতেমায় অন্যদের প্রাধান্য দেয়, তখন কিছুই গ্রহণযোগ্য হবে না, না মাসোয়ারা না ইজতেমা। এজন্যই মাওলানা সাদ সাহেবকে ইজতেমা শেষ হওয়া পর্যন্ত রাখার ব্যবস্থা করা হয় যাতে ইজতেমাতে অংশ নেয় সকল মুসুল্লির আমল হেফাজত হয়।

শরীয়তের আলোকে ইজতেমা হেফাজতের দ্বিতীয় পদ্ধতি ছিল মাওলানা সাদ সাহেব প্রতিনিধি মনোনীত করবেন, এরপর তিনি ফিরে যেতে পারেন।

◆ দাওয়াতের মেহনতের মূলনীতিঃ

দরজা খোলার ব্যবস্থা করে যাওয়া, দরজা ভেঙে না যাওয়া। (আমাদের প্রচলিত ভাষায় আমরা বলে থাকি হা এর উপরে রেখে আসা)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারতের অধীনে দাওয়াতের এই মোবারক মেহনতের সকল কর্মীদের হুদায়বিয়ার সন্ধির সেই সুন্নতের উপরে আমল করার তৌফিক দিয়ে সম্মানিত করেছেন। যেমন সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর জামাতকে ঐ বছরের জন্য আপাততঃ ফিরে গিয়ে পরবর্তী বছর আসার কথা বলা হয়েছিল। মাওলানা সাদ সাহেবকেও ২০১৮ সালে ফিরে গিয়ে পরবর্তী বছর আসার অনুরোধ জানানো হয়। একটি নির্ভরযোগ্য সনদের হাদীসের মাফহুম, “যার সাথে যার মিল হয় সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়।”

কোন এক ব্যক্তির সারাজীবনের আয় এবং সম্পদের বিনিময়েও যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর মোবারক সাহাবাদের কোন একটি আমলের তৌফিক হয়, তাহলে জেনে রাখুন এর চেয়ে বড় ব্যবসায় আর নেই। যারা নিজামুদ্দিনের মাসোয়ারার সাথে এই মহান মেহনতের জিম্মাদারী আদায় করে চলছেন এবং মাওলানা সাদ সাহেবকে আমীর হিসাবে তাঁর নির্দেশনা মোতাবেক মেহনত করে যাচ্ছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁদের এই জামানায় এমন একটি মহান সুন্নতের উপরে আমল করার দ্বারা ধন্য করলেন, যার সুযোগ অনেক প্রখ্যাত বুযুর্গ সারা জীবনেও পান না।

এমন কোন নবী বা রাসূল পাওয়া যাবে না যারা বল খাটিয়ে দাওয়াতের মেহনত আঞ্জাম দিয়েছেন। বরং তাঁরা মানুষের কাছে গিয়ে অনুনয় বিনয় করেছেন, নম্রতা, বিনয়, কোমলতা, শ্রদ্ধা, যৌক্তিক আচরণ, সৌহার্দ্য, ভালোবাসা ও মমতাপূর্ন আচরণ ও পন্থা অবলম্বন করেছেন।

ঘৃণা, বৈরিতা, আক্রোশ এসব আম্বিয়া এবং তাঁদের সাথীদের মেহনতের ভিত্তি হতে পারে না। আমাদের হৃদয় সকলের ব্যাপারে সাফ করতে হবে, নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করতে হবে। ক্ষমা এবং ত্রুটিসমূহ উপেক্ষা করার সিফাত সব সময় যেন প্রতিশোধ পরায়ণতার উপরে বিজয়ী হয়।

সম্মান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে আসে। এবং তাঁর সুমহান সিদ্ধান্ত হল, আল্লাহর হুকুম সমূহ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে উপস্থাপন কর, তুমি এতে সম্মানিত হবে।

কোন কিছুই আমাদের হাতে নেই। দাওয়াতের মেহনতের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হল আমাদের দিলের দূষিত ইয়াকীন বের করা, আল্লাহ পাকের যাতে আ’লীর উপরে ইয়াকীন করতে শেখা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের শক্তি দিন, আমাদের ছিটকে পড়া থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের সহায় হউন। আমীন।

◆ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের জন্য ধ্বংসঃ

এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, যারা এই মোবারক মেহনতে অত্যাচার সহ্য করেছেন তাদের আমল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবাহ রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমদের অনুরূপ, তেমনি যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন তাদের কর্ম কুরাইশদের অনুরূপ হয়েছে। এদের মধ্যে তারা সকলেই শামিল, যারা সশরীরে রাস্তায় নেমেছেন, যারা উৎসাহিত করেছেন এবং যারা ফতোয়া, উপদেশ ইত্যাদির দ্বারা তাদের সহযোগিতা ও প্রচরণা দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাদের সবাইকে তওবার তৌফিক দেন, তাদের ভুলসমূহ মাফ করেন, তাদের ইনসাফকারী বানান। (সহীহ রেওয়াত: একজন ইনসাফকারী মুফতীর অর্ধ দিনের মেহনত ৬০ বছর ইবাদাতের সমতুল্য।)

সকল সাথীদের ইজতেমাইয়াত বজায় রেখে খুব জমে মেহনত করার অনুরোধ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ঘটনাই প্রমাণ করে এখনো কত মেহনত বাকি। যারা রাস্তায় নেমে এসেছে তারা কেউ অশিক্ষিত বা নিরক্ষর লোক নয়। তারা বিভিন্ন মাদ্রাসার তলাবা, তাদের শিক্ষক এবং উলামা। কিন্তু তারা বাস্তবতা, সীরত এবং ইসলামী অনেক আইন কানুন সম্পর্কে ওয়াকিফাহাল নন। বাংলাদেশের উলামা কেরাম সাদা মনের ইসলামের একনিষ্ঠ খাদেম। তারা যা করেছেন ইসলামের মূহাব্বতেই করেছেন। তাদের ভুল নির্দেশনা এবং ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তাদের সহায় হোন, তাদের উপর আলা দরজার রহম করুন। তাদের সরলতা এবং ইসলামের প্রতি অপরিসীম আবেগ ইসলামের বৃহত্তর খিদমতে লাগান।

সাম্প্রতিক ইতিহাস বলে বাংলাদেশে আওয়ামদের উপরে মেহনত হলেও আলেমদের উপরে যে মেহনত হয়েছে তা যৎসামান্য। মূলতঃ এ কারণেই উলামা কেরাম প্রকৃত সত্য সম্পর্কে ওয়াকিফাহাল নন। পক্ষান্তরে ভারতে সেই ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির জামানা থেকেই আলেমদের উপর মেহনত হয়ে আসছে। বিশেষ করে হজরতজী মাওলানা সাদ সাহেব নিজামুদ্দিনে উলামাকেরামদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েম করেছেন। তাই সম্পূর্ণ ভারতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টা। খুবই সামান্য কিছু ব‍্যতিক্রম বাদে নিজামুদ্দিন মারকাজের এই বিভেদের সময় সারা ভারতের উলামা কেরাম মাওলানা সাদ সাহেবের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এজন্য উলামা কেরামদের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে হবে। তাঁদের বেশি থেকে বেশি এই মেহনতে সম্পৃক্ত করতে হবে।

photo editor-20180914_2108551217673288..jpg

(সংগৃহীত, সংক্ষেপিত, সম্পাদিত)

 

Advertisements

Leave a Reply