ফিরে দেখা টঙ্গী ইজতেমা ২০১৮ || পর্দার অন্তরালে কি হয়েছিল?

অনুবাদঃ শামীম হামিদী। 

ফিরে দেখা টঙ্গী ইজতেমা ২০১৮ || পর্দার অন্তরালে কি হয়েছিল?

হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির খাদেম এবং তাঁর মাসোয়ারায় লন্ডনে হিজরতকারী মাওলানা মেহবুব সাহেবের ৩০১ ও ৩০২ নম্বর কিস্তির অবলম্বনে এ পর্যায়ে আমরা একটি বিশেষ সিরিজ প্রকাশ করছি, ২০১৮ টঙ্গী ইজতেমায় পর্দার অন্তরালে আসলে কি হয়েছিল?

বিশেষ সিরিজ – ফিরে দেখা টঙ্গী ইজতেমা ২০১৮। পর্দার অন্তরালের তৎপরতা এবং কাকরাইল মারকাজে হজরতজীর অবরুদ্ধ দিন গুলি।

মাদানী পরিবার ও বাংলাদেশ :

বাংলাদেশে মাদানী পরিবারের ব্যপক প্রভাব রয়েছে। অতি সম্প্রতি টঙ্গীর উদ্দেশ্যে মাওলানা সাদ সাহেবের ঢাকা সফরের সময় এই প্রভাব কাজে লাগানো হয়েছে।

বাংলাদেশে উলামাকেরামদের রাজনৈতিক অংশের ২০১২-১৩ সালের নাস্তিক বিরোধী গণআন্দোলনের পরে সরকারের সাথে আলেমদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে এই সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য মাদানী পরিবারের এই প্রভাব কাজে লাগানো হয়।

বাংলাদেশের যে সকল উলামাকেরাম নিজামুদ্দিন মারকাজ ও মাওলানা সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তাঁরা বেশিরভাগই মাওলানা আরশাদ মাদানী বা মাদানী পরিবারের ঘনিষ্ঠজন। এই উলামাকেরাম যাঁরা ছাত্র ও সাধারণ মাদ্রাসা শিক্ষকদের রাস্তায় নামিয়ে ছিলেন তাঁদের ব্যাপারে খুব ভালোভাবেই জানা আছে যে, তাঁদের পূর্বে কখনো তাবলীগের ধারে কাছেও দেখা যায় নি। তাবলীগের নেতৃত্ব দখলের এই প্রক্রিয়ায় আলমী শূরার সমর্থকগণ এটাও পরোয়া করেন নি যে, এর দ্বারা দারুল উলূম এবং উলামায়ে দেওবন্দের মর্যাদাহানী হচ্ছে।

মাওলানা সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে উলামাকেরামদের দ্বারা সংঘটিত বিশৃঙ্খলার প্রেক্ষিতে মুফতী আবুল কাসেম সাহেবের সহযোগিতা চাওয়া হলে তিনি এসব বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে এড়িয়ে যান, এখানে দেওবন্দের কোন দায় নেই এবং তাঁরা ভারতে কোথাও কোন বাধা দিচ্ছেন না।

দারুল উলূমের এই অবস্থানের বিপরীতে মাজাহেরুল উলূম ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁরা তাৎক্ষণিক বিশেষ সভা ডেকে নিজামুদ্দিন মারকাজ এবং মাওলানা সাদ সাহেবের প্ৰতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।

তাবলীগের যে কোন বিষয়ের সমাধান তাবলীগের সাথীরা এবং তাবলীগের সাথে সম্পৃক্ত আলেমগণ তাবলীগের তরতীব মতই করবেন। অন্যান্য উলামা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা মাশায়েখগণের পক্ষে তাবলীগের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা শুধু অসামঞ্জস্যপূর্ণই নয় বরং ন্যায়ের পরিপন্থীও বটে।

তাবলীগের ইজতেমা বা ইজতেমায় হস্তক্ষেপ করার সাথে এই আলেমদের কি সম্পর্ক?

তাবলীগের সাথীরা তো মাদ্রাসা বা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মাথা গলায় না। অতএব এই আলেমদের তাবলীগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কে দিল?

মোটামুটি সম্পর্ক এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে পার্থক্য :

তাবলীগের কাজের সাথে উলামাকেরাম সাধারণ ভাবে যে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন তা হল মোটামুটি সম্পর্ক। একে নিসবত বলা হয়, যা মুনাসিবাত থেকে ভিন্ন। মুনাসিবাত হল, তাবলীগের কাজের তাকাজা নিয়ে চলা এবং তাকাজা পূরণ করা। একই ভাবে তাবলীগের সাথীদের মাদ্রাসার সাথে নিসবত রয়েছে, মুনাসিবাত নেই। নিসবত থেকে একাডেমিক কোন ডিগ্রী পাওয়া যায় না, যেমন মুফতী হওয়া যায় না। তেমনি ভাবে শুধু নিসবত দ্বারা কি তাবলীগের কোন দায়িত্ব/ইমারত/ফয়সাল হওয়া যাবে?

আগের ইজতেমাতেই (মোটামুটি এক বছর আগে) মাওলানা সাদ সাহেবকে আলমী আমীর এবং হজরতজী হিসাবে আনুষ্ঠানিক ভাবে সম্মানিত করা হয়। বিশ্বের ২০১ টি দেশ তা দেখেছে অথবা শুনেছে অথবা বুঝেছে। তাহলে এই এক বছরের মধ্যে এমন কি পচে গেল, যা উলামাকেরামদের এভাবে রাস্তায় নামতে বাধ্য করল?

অথচ স্মরণ করুন এর মাত্র কিছুদিন আগেই
যখন বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধি দল জিজ্ঞাসা করেন যে, মাওলানা সাদ সাহেবের টঙ্গী ইজতেমায় অংশ গ্রহণ মুনাসিব কিনা তখন মুফতী আবুল কাসেম সাহেব উত্তর দেন, “আমরা শুধু চাচ্ছি তিনি প্রকাশ্যে জনসম্মুখে এলানী রুজু করুন। একবার এটা হয়ে গেলে তখন আপনাদের মর্জি তিনি টঙ্গী যাবেন কি যাবেন না।”

২৫ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে হায়াতুস সাহাবার তালীমের পরে, মাওলানা সাদ সাহেব তাঁদের হুবহু পরামর্শ মাফিক রুজু করেন। ঐ প্রতিনিধি দলও তাঁদের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। (অডিও রয়েছে)

মুফতী আবুল কাসেম সাহেব এবং মাওলানা আরশাদ মাদানীঃ

এরপরে মুফতী আবুল কাসেম বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেন যে, “আমরা মাওলানা সাদ সাহেবের রুজুর উপরে সন্তুষ্ট নই এবং তিনি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত থেকে প্রান্ত সীমায় আছেন। তাই আপনাদের দায়িত্ব তাঁকে টঙ্গী ইজতেমায় বাধা দেয়া।” এর উপরে ভিত্তি করেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মাওলানা সাদ সাহেবকে ফেরত পাঠানো হয়।

মাওলানা আরশাদ মাদানী সম্পূর্ণ ব্যাপারে মুফতী আবুল কাসেম সাহেবকে পূর্ণ সমর্থন দেন। তিনি ভারতেই অবস্থান করতে থাকেন, তবে তাঁর ভাই মাওলানা আসজাদ মাদানীকে বাংলাদেশে পাঠান। এবং বিভিন্ন মজমাতে হাজির হয়ে সাদ সাহেবের বিরোধীদের সহযোগিতার (মাওলানা সাদ সাহেবের আগমন বাধাগ্রস্থ করা) দায়িত্ব দেন।

এছাড়া বাংলাদেশের মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষকদের রাস্তায় নামাতে তিনি তাঁর ভাইকে ব্যবহার করেন।

অন্যদিকে দেওবন্দ থেকে অফিসিয়ালি তাঁরা দাবি করেন যে, তাঁরা নিরপেক্ষ। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে তাঁরা পাকিস্তানী আলমী শূরার পক্ষে কাজ করেছেন, অন্যদেরও তাদের পক্ষে কাজ করিয়েছেন।

অন্ততঃ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আলমী শূরার সমর্থকদের থেকে এভাবেই দাবি করা হচ্ছে।

তাঁরা দুজনেই বাংলাদেশের বিক্ষোভ ও অবরোধের ব্যবস্থা করেন এবং বিভিন্ন মাদ্রাসার কোমলমতি বাচ্চাদের রাস্তায় নামান। অথচ এই মেহনতে কখনো বিক্ষোভ মিছিল বা অবরোধ ছিল না। এই মেহনত সব সময়েই ছিল শান্তিপূর্ণ।

কোন সমস্যা সৃষ্টি করে দাবি আদায় করার সাথে একমত হতে পারছি না। আমাদের মেহনত হতে পারে কলমের দ্বারা, ন্যায়সঙ্গত ভাবে, সীরতের অনুসরণে, আন্তর্জাতিক মানে।

আমরা এই দুইও হযরত, মাওলানা আরশাদ মাদানী এবং মুফতী আবুল কাসেম হাফিজহুমুল্লাহ, থেকে অজাহাত চেয়েছিলাম যে, আপনাদের বিরুদ্ধে এই যে অভিযোগ বা গুজব উঠেছে, তা কি মিথ্যা? তাহলে জনসম্মুখে কসম করে এসব গুজব অস্বীকার করে আমাদের আশ্বস্ত করুন। আমরা টঙ্গী ইজতেমার দ্বিতীয় ধাপ শুরুর আগেই তাঁদের ব্যাপারে আশ্বস্ত হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক যে, তাঁরা কোন পদক্ষেপ নেন নি।

প্রতিহত করার মানসে ইজতেমা বাধাগ্রস্থ করাঃ

যখন বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল মাওলানা সাদ সাহেবের রুজুর প্রেক্ষিতে সন্তুষ্ট চিত্তে দেশে ফিরলেন, তখন পাকিস্তানী আলমী শূরা কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে আলমী শূরার সাথে সংশ্লিষ্ট আলেমদের বললেন, যদি মাওলানা সাদ সাহেব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করেন, তাহলে তাঁকে ফয়সাল হতে দেয়া যাবে না এবং সকল বয়ান স্থানীয় লোকজনই করবেন যেভাবে রায়বেন্ডে করা হয়েছে।

ড. নাদীম সাহেব কারী যুবায়ের সাহেবের কাছে বার্তা পাঠান। তিনি কারী যুবায়ের সাহেবকে জানান যে, যেকোন সময়ে মাওলানা এহসান সাহেব এবং ভাই ইয়ামীন সাহেব রওয়ানা দিবেন এবং তাঁরাই মাসোয়ারা করবেন। এর পরে মাওলানা সাদ সাহেবকে বাংলাদেশে ডাকা যেতে পারে, যাতে তাঁর অনুপস্থিতিতে নিজেদের খুশি মত মাসোয়ারা সম্পন্ন করা যায়।

কিন্তু এই পরিকল্পনা পণ্ড হয়, কারণ তার আগেই মাওলানা সাদ সাহেব ঢাকায় চলে আসেন। তাই মুফতি আবুল কাসেম সাহেবের থেকে চিঠি আনা হয় যা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে দেয়া হয়। সেখানে মাওলানা সাদ সাহেবকে ইজতেমাতে অংশগ্রহণে বাধা প্রদানের জন্য বলা হয় যে, তিনি আহলে সুন্নাতের প্রান্ত সীমায় আছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় পরে প্রতিনিধি দলকে অনুরোধ করেন এ বছরের জন্য আপাততঃ ফিরে যেতে। এখানে প্রশ্ন ওঠে যদি আহলে সুন্নাত থেকে খারিজ হবার ব্যাপারই থাকে তাহলে শুধু এ বছর কেন? পরবর্তী বছরগুলোতে কি হবে তাঁরা কিভাবে জানলেন?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় মুসলিম বিশ্বের এই অন্যতম বৃহৎ জমায়েতকে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে খুশি রেখে সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করার ব্যাপারে শুরু থেকেই খুবই আন্তরিক ছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন। এবং খুবই আন্তরিকতার সাথে তিনি সম্ভাব্য সকল পন্থাই অবলম্বন করেছেন। তাঁর ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতায় কখনোই কোন ঘাটতি ছিল না। তাঁর নিঃস্বার্থ ও নিরপেক্ষ প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে তিনি বেশ বিব্রত বোধ করছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি অভিমান করেই বলেন, এভাবে কারো থেকে সহযোগিতা না পেলে তাঁর পদত্যাগ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

মাওলানা সাদ সাহেব তাবলীগের চিরাচরিত প্রথা অনুসারে শান্তিপূর্ণ ভাবে নিজামুদ্দিন ফিরে আসেন।

এখানে কদর্য ব্যাপার যা ঘটেছে তা হল, পাকিস্তানী এই চক্রের কি দরকার ছিল দারুল উলূম দেওবন্দকে তাঁদের এই নিজামুদ্দিন ও মাওলানা সাদ সাহেব বিরোধী অবস্থানে জড়ানোর? বাংলাদেশ একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র, সে দেশের আলমী শূরার সদস্যগণও পাকিস্তানীদের তালে তাল মিলিয়ে দেওবন্দের নাম অপব্যবহার করে নিজেদের দেশের অসম্মান করেছেন।

যখন মুফতী আবুল কাসেম সাহেবকে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে যত কিছু হচ্ছে সব তাঁর এবং মাওলানা আরশাদ মাদানীর দোহাই দিয়ে হচ্ছে, তাই এই ফিৎনা প্রশমনে তাঁর থেকে সহযোগিতা মূলক কোন বক্তব্য চাওয়া হলে, তিনি অস্বীকার করে বলেন যে, এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং এ বিষয়ে তার কিছুই করার নেই। কেননা ভারতে কোন ঝামেলা হচ্ছে না, সব শান্তিপূর্ণ ভাবেই চলছে। এতটুকু বলে তিনি ফোন রেখে দেন।

দারুল উলূম সর্বসম্মতিক্রমে উপমহাদেশের এবং আহনাফদের ইলমের মারকাজ। শুধু ভারত নয়, সমগ্র উম্মতের ব্যাপারেই তাঁরা দায়িত্বশীল। এই মারকাজের কর্ণধার হিসাবে অবশ্যই মুফতী সাহেবের উম্মতের যে কোন ব্যাপারে জিম্মাদারী ও দায় রয়েছে। কিন্তু তাঁর থেকে এমন আচরণে মর্মাহত হয়েছি।

দ্বীনের ব্যাপারে শ্রদ্ধেয় মুফতী সাহেবের আত্মসম্মানবোধ কোথায় গেল? একজন নিরক্ষর তাবলীগের সাথীও সারা দুনিয়ার সকল মানুষের হেদায়েত ও কল্যাণের জন্য নিজেকে দায়িত্বশীল মনে করে। এমন একজন প্রখ্যাত মুফতী এবং উপমহাদেশের অহংকার দারুল উলূমের প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তির এই ফিৎনার ব্যাপারে কি কিছুই করার ছিল না? অথচ তাঁর একটি ফোনকল বা কলমের খোঁচা এই ফিৎনা মিটিয়ে দিতে পারত। এভাবে রাস্তা আটকিয়ে সাধারণ মানুষকে ঘন্টার পর ঘন্টা কষ্ট দেয়ার দ্বারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে উলামকেরামদের মর্যাদা ও অবস্থান ক্ষুন্ন হয়েছে।

মাওলানা আরশাদ মাদানীও উপমহাদেশের একটি প্রভাবশালী এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় পরিবারের সদস্য হিসাবে অন্ততঃ উপমহাদেশের মুসলমানদের ব্যাপারে একই ভাবে দায়িত্বশীল। যদিও তাঁর থেকে আমরা কিছু আশা করিনি। তিনি একজন তুখোড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ‘শব্দে’র সময় ও স্থান উপযোগী ব্যবহার তাঁর পেশার অংশ। কিন্তু মাওলানা মাদানীর বাংলাদেশে যে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তাতে তাঁর একটি ফোনকলই হয়ত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে উলামাকেরামদের এহেন সম্মানহানী রোধ করতে পারত। এমন একটি বিশাল ইজতেমা ফিৎনা থেকে রেহাই পেত।

সম্প্রতি মুফতী আবুল কাসেম সাহেব কাশ্মীরের উলামাদের প্রতিনিধি দলের কাছে তথ্য ভুল ভাবে উপস্থাপন করে ধরা পড়েছেন। তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাবর চিঠির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। কিন্তু এসংক্রান্ত আরো কিছু প্রশ্নের সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই কাশ্মীরের উলামাকেরাম বেশ উষ্মা প্রকাশ করেছেন। এক পর্যায়ে তিনি কসম খেয়ে অস্বীকার করেন।

তাই দারুল উলূমের লেটার হেডের ডকুমেন্ট দেখে বিভ্রান্ত হবার কিছু নেই। যা সত্য তা স্বচ্ছও বটে। এখানে ঘাপলার কিছু থাকার কথা নয়। বরঞ্চ মিথ্যার মধ্যে অসংখ্য ঘাপলা থাকে। এর বিপরীতে সত্য সব সময়েই স্ফটিকতুল্য স্বচ্ছ। এখানে এমন কোন বিষয় থাকার কথা নয় যে, দারুল উলূমের মুহতামিমের মত মাননীয় ব্যক্তিত্বকে কসম খেয়ে কোন একটি কথা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তিনি এমন একটা ব্যাপারে কেন জড়ালেন যেখানে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুন্ন হয়?

দারুল উলূমের প্রায় পৌঁনে দুইশত বছরের ইতিহাসে কখনোই কোন মুহতামিমের কোন কথা নিয়ে এভাবে প্রশ্ন উঠে নি। শুধু দারুল উলূম কেন উপমহাদেশের যে কোন ইলমের মারকাজের ক্ষেত্রেই এমন নজীর খুঁজে পাওয়া ভার।

যেহেতু তিনি দাবি করেছেন তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কোন চিঠি দেন নি, এই এতটুকু কথাই আমরা টঙ্গী ইজতেমার সময় তাঁর থেকে আশা করেছিলাম। তিনি তখন প্রকাশ্যে ঠিক এই ঘোষণাটি দিলেই অনেক ফিৎনা এড়ানো যেত এবং সবকিছু সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করা যেত। কিন্তু তখন তিনি বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে এড়িয়ে যান। অথচ সেখানে প্রকাশ্যে তাঁদের নাম ব্যবহার করেই ফিৎনা করা হচ্ছিল। যেহেতু তিনি কসম করেছেন তাঁর কোন দায় ছিল না, এটা তখন বলতে তাঁর কি অসুবিধা ছিল? এর কোন সদুত্তর তিনি দিতে পারেন নি।

উপরন্তু বাংলাদেশের উলামাকেরামদের প্রতিবাদ, আমীর হজরতজী মাওলানা সাদ সাহেবের বিরোধিতা এবং ইজতেমায় অভ্যন্তরীণ ক্যু সফল করতে গিয়ে যে পরিমাণ অন্তর্ঘামূলক কার্যকলাপ হয়েছে তা এই মেহনতের সাথে খোলাখুলি দুশমনীর সামিল। বাংলাদেশের সার্বভৌম কতৃপক্ষেরও এই ব্যাপারে সচেতন থাকা দরকার যে, তাঁদের দেশে কে ঢুকবে বা না ঢুকবে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত বাইরের কেউ দিবে বা অনুমতি দেয়া হলেও কিভাবে তাঁকে বাধা দেয়া হবে এ সিদ্ধান্ত বা পরামর্শ বাইরে কোথাও (পাকিস্তানে) হওয়া সমীচীন নয়।

[অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও] মুফতী আবুল কাসেম, মাওলানা আরশাদ মাদানী ও তাঁর জমিয়তে উলামা এবং রায়বেন্ডের রাগের কোন হেরফের হয়নি। কারণ তারা তাদের বানানো জিনিস তথা আলমী শূরা থেকে দূরে সরতে পারেন নি।

ফলাফল যা দেখতে পাচ্ছি তার উপরে ভিত্তি করেই বলছি, এই তিন প্রতিষ্ঠান আসলে মাওলানা সাদ সাহেবের থেকে রুজু চান না, তারা চান কথিত আলমী শূরার দিকে তাঁর রুকু। মাওলানা সাদ সাহেব অসংখ্য রেফারেন্স দেখিয়েছেন [আরশাদ মাদানী সাহেবের নিজামুদ্দিন সফরকালে ২৭টি শুধুমাত্র আরবী তাফসীরগ্রন্থ দেখিয়েছেন।] উপরন্তু তাদের হুবহু পরামর্শ মোতাবেক বহুবার রুজুও করেছেন। সব বেকার সাব্যস্ত হয়েছে। [মূল কথা, তিনি রুকু না করা পর্যন্ত তার রুজু কবুল হবে না।]

এমন নিপীড়ন মূলক একগুঁয়েমি আর কিভাবে ব্যাখ্যা করব? টঙ্গী ইজতেমা ঘিরে যা কিছু হয়েছে এগুলো কি কোন আলেম তথা ওয়ারিশে আম্বিয়ার কাজ হতে পারে? সাধারণ মানুষদের ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় অবরুদ্ধ রেখে আলেমগণ সাধারণ মানুষের কাছে কি বার্তা দিলেন? দেওবন্দের হযরতগণ একটু ব্যাখ্যা দিবেন কি?

আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন এবং দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে জমে থাকার তৌফিক দান করুন।

বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ :

বাংলাদেশ সরকার নিচের ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

১৯৭৯ সালে যখন বায়তুল্লাহ আক্রান্ত হয়, আক্রমণকারী সকলেই দেখতে ১০০% মুত্তাকী ছিল। সে সময়ে একটি বড় জামাত মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেবের সাথে একটি টানেলের মধ্যে দিয়ে আগাচ্ছিল। এটা নির্দোষ সাধারণ তাবলীগী জামাত ছিল। কিন্তু সরকারের কাছে গুপ্তচররা এই খবর দিল।

সরকারের পক্ষ থেকে ঐ টানেলে বোম্বিং করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে যেভাবেই হোক, সরকার জানতে পারেন যে, টানেলে একজন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি আছেন এবং তিনি যদি তাদের বিরুদ্ধে দুআর জন্য হাত উঠান তাহলে তাদের নেতৃত্ব খতম হয়ে যাবে। এরপর তারা টানেলে বোম্বিং করার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসেন।

হে বাংলাদেশের কর্তাগণ, এই মুহুর্তে এমনই একজন আল্লাহর বান্দা আপনাদের জমিনে আছেন। যদি ভুলক্রমেও তাঁর উপরে কোন জুলুম হয়, আল্লাহর গজব কেউ ঠেকাতে পারবে না। [ এই কিস্তি গত টঙ্গী ইজতেমার সময়কার। ]

টঙ্গী ইজতেমা ও রায়বেন্ড ইজতেমা, একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ :

যখন নিজামুদ্দিন মারকাজ থেকে জামাত রায়বেন্ড যায় তাঁদের অনেক রকম শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। এসব শর্ত গ্রহণ করার পরই কেবল তাঁরা সীমিত পরিসরে অংশ নিতে পারেন।

সারা দুনিয়া দেখেছে রায়বেন্ড ইজতেমার কোন অংশে নিজামুদ্দিনের কোন সাথীকে কোন বয়ান দেয়া হয় নি। সব আমল ফিৎনায়ে খবিসা আলমী শূরার প্রবক্তাগণই করেছেন। এবং সম্পূর্ণ নাটকের কুশীলব ছিলেন মৌলভী খুরশীদ, মৌলভী ফাহিম গং।

টঙ্গী ইজতেমাতেও নিজামুদ্দিনের কেউ ছিলেন না। সব উমুর আলমী শূরার লোকেরাই চালিয়েছেন, কেমন কারী যুবায়ের, মাওলানা ফারুক, মাওলানা রবিউল হক; যাদের সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন মুফতী নুমানী সাহেব, মাওলানা আরশাদ মাদনী এবং মাওলানা আসজাদ মাদানী।

(সংগৃহিত, সংক্ষেপিত, সম্পাদিত)

Advertisements

Leave a Reply