বাংলাদেশের প্রথম আমীর বড় হুজুর খ্যাত মাওলানা আব্দুল আজিজ (রহ.) এর সাহেবজাদা মাওলানা মাসুম বিল্লাহ সাহেবের মতামত ও দুনিয়া জুড়ে আলমী শুরার ব্যর্থতার বিশ্লেষণঃ

মাওলানা মাসুম বিল্লাহ সাহেবের মতামতঃ

“মুফতী মুনসুরুল হক দামাত বারকাতুহুম। তিনি আমার শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদ ও রাহবার। তিনি সম্প্রতি একাধিক বার দাবি করেছেন আলমী শূরা তথা যৌথ নেতৃত্ব শরীয়ত সম্মত নয়। তিনি ব্যক্তিপূজা এবং স্থানপুজার ব্যাপারে যে ফতোয়া দিয়েছেন উস্তাদ হিসাবে আমি তাঁকে ১০০% সমর্থন করি। তবে সম্মানের সাথে কিছু আপত্তিও করি, তা হল তিনি যে নিসবত স্থাপন করেছেন এটা সঠিক হয়নি।

মাওলানা সাদ সাহেবের সাথে আমাদের সম্পর্ক শুধুই আমীর মামুরের সম্পর্কে। ব্যক্তি হিসাবে আমরা তাঁকে খুব ভালোভাবে চিনি না। তাই ব্যাক্তিপূজার কোন সুযোগই নেই। তাঁর বয়ান শুনি, রাহবারী নিই, আমীর হিসাবে সম্মান করি। এর বেশি তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্ক নেই। তিনি তো সব সময়ে থাকবেন না। তাঁর পরে নতুন আমীর আসবেন। আমরা তাঁকেই মানব, তাঁর ইতায়াত করব।

নিজামুদ্দিনের সাথেও আমাদের সম্পর্ক মারকাজ হিসাবে। আমীর যেখান থেকে উম্মতের খিদমত আঞ্জাম দেন তাকেই মারকাজ বলে। ইসলামে মারকাজের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনার বাইরে যেতেন কাউকে না কাউকে স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। জিম্মাদার সাথীরা যদি আমীরের নেতৃত্বে অন্য কোথাও মারকাজ সরিয়ে নেয়ার ফয়সালা করেন তাহলে আমরা সেই মারকাজই অনুসরণ করবো।

তাই আমাদের উপর স্থানপুজা ও ব্যক্তিপূজার যে অপবাদ চাপানো হচ্ছে একে আমরা হাশরের ময়দানে বিনা পরিশ্রমে কিছু ফায়দা হাসিলের জন্য এক সুযোগ মনে করি।”

এছাড়া বাংলাদেশের প্রথম আমীর, বড় হুজুর খ্যাত মাওলানা আব্দুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহির ছেলে সহ কয়েক হাজার আলেম মাওলানা সাদ সাহেবের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশের সাধারণ আলেমদের মধ্যে যে বিরোধিতা ছড়িয়ে পড়েছে এটা মূলতঃ আলমী শূরার অনুসারীদের মিথ্যা প্রোপাগান্ডার কারণে সাময়িক বিভ্রান্তি। এটা কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ।

কাজেই বুঝতেই পারছেন যারা দাবি করছেন জমহুর আলেমগণ সাদ সাহেব ও নিজামুদ্দিনের বিরোধী তারা নিতান্তই মিথ্যাবাদী। একথা পরিষ্কার তাবলীগের চলমান অস্থিরতার ব্যাপারে জমহুর উলামকেরামের বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই। বরং এটা ১০০% অবৈধ আলমী শূরাপন্থীদের অপপ্রচার এবং চাপ প্রয়োগের অপকৌশল। ‘জমহুর’, ‘ইজমা’ শরীয়তের সম্মানিত এই পরিভাষা গুলোর অপব্যবহার দ্বারা তারা সাধারণ সাথীদের ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইলিং করে বিভ্রান্ত করতে চায়। দেওবন্দের ফতোয়া এদের কাছে শুধুই একটা অজুহাত। কেননা দেওবন্দের এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া এদেশের আলেমদের হাতেই কবরস্থ হয়েছে। যেমন মাস্তুরাত জামাত এবং মহিলা মাদ্রাসা। মহিলা মাদ্রাসার ব্যাপারে খুবই সুস্পষ্ট ফতোয়া বিদ্যমান। এবং এ ব্যাপারে সকল যুগের সকল ধরনের আলেমদের ইজমা আছে যে এটা কোনক্রমেই দ্বীনি কোন খিদমত নয়।

তাই ‘জমহুর আলেম’, ‘উম্মতের ইজমা’ এসব পবিত্র পরিভাষা গুলোকে যারা অপব্যবহারের দ্বারা কলুষিত করে ফায়দা হাসিল করতে চায় এরা নিঃসন্দেহে কুচক্রী এবং ইসলামের শত্রু।

আলমী শূরার ব্যর্থতা || আলমী শূরা – ব্যর্থতার হালখাতা ||

ব্যর্থতা ১ –

নিজামুদ্দিন থেকে মূল মারকাজ সরানোর ব্যর্থতা।

তারা গুজরাট, ব্যাঙ্গালোর, আলীগড় আরো বহু জায়গায় মারকাজ সরাতে চেয়েছে। কিন্তু ফলাফল? ব্যর্থ।

ব্যর্থতা ২ –

উম্মতকে আমীরশূন্য করতে ব্যর্থতা।

একজন দাঈর প্রকৃত জীবন আমীরের অধীনে, বিচ্ছিন্ন মেহনত নয়। “হে মুমিনগণ, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তাঁরা তোমাদের আহ্বান করেন।” (সূরাহ আনফাল: ২৪) উম্মতের ঐক্য শুধুমাত্র এক আমীরের আনুগত্যের অধীনেই অর্জিত হইতে পারে। ১০/২০ জন শূরা তথা মাদবরের অধীনে ঐক্য সম্ভব নয়। ‘আলমী শূরা’র অধীনে ‘ইমারত’ সম্ভব নয়। কেননা যেদিন ‘আলমী শূরা’ থেকে ‘ইমারত’ কায়েম হবে সেদিন ‘আলমী শূরা’র উদ্দেশ্যই অপ্রয়োজনীয় এবং অকার্যকর হয়ে যাবে।
‘ইমারত’ সম্পর্কে কয়েক ডজন সহীহ হাদীস রয়েছে:
যখন কেউ আমীর না থাকে, শয়তান আমীর হয়।
যদি তোমাদের তিনজনও সফর করে, তাহলে একজন যেন আমীর হয়।
যে কেউ জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মারা যাবে, তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের উপরে হবে। (সহীহ রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত)।

ব্যর্থতা ৩ –

কথিত ‘আলমী শূরা’ এবং এর বিশ্বাসীগণ লোকজনকে নিজামুদ্দিন থেকে বিরত রাখার প্রয়াস পেয়েছে। যদি তাদের ক্ষমতা থাকত তাহলে শক্তিপ্রয়োগ করে হলেও নিজামুদ্দিন যেতে বাধা দিত।
ব্যাঙ্গালোরের ভাই ফারুকের কারণে ব্যাপারটা এত দূর গড়িয়েছে। তার থেকে প্রকাশ পাওয়া কথাগুলোর প্রধান জিনিস হল রাগ, বিদ্বেষ, শত্রুতা, বিদ্রুপ ও আফসোস, কুরআনের আয়াতের বিকৃতি যেমন, “আল্লাহর দিকে ডাকা” এর বদলে “নিজামুদ্দিনের দিকে ডাকা।” “আলা বাসীরত” এই বদলে তিনি ব্যঙ্গ করে বলেছেন, “আলা আকীদাত”। ইহা কুরআন। এ কোন রঙ্গ তামাশার বিষয় নয়। কুরআনের তাহরীফ খুব জরুরী, অনেক সময় তা’উইলের পার্থক্য হলে ইরতেদাদের হুকুমও এসে পড়ে। এমন আরেকজন মানুষ হলেন আবু খানসা, তার whatsapp মেসেজ আমি মাঝে মাঝে পেতাম। এসব মেসেজে তিনি এমন সব বিষয় উল্লেখ করতেন যাতে কাউকে মুরতাদ হিসাবে বিবেচনা করা যায়। আরেকজন লোক (রাওয়াত), যে রাগের সময় নিজেকে শরীয়তের সীমার মধ্যে রাখতে পারেন নি। তার সাথে কথা বলে ছিলাম। তিনি কথা আমলে নিয়েছেন। এখন সতর্কতা অবলম্বন করছেন। আল্লাহ তার উত্তম তরবীয়ত করুন।

যারা ইখতিলাফ করছেন তারা আমাদের ভাই। ইখতিলাফের যদি শরঈ ভিত্তি থাকে তাহলে ভুল হলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু ইখতিলাফ যদি বাজারী কথার স্তরে পৌঁছে, তাহলে এটা হারামও হতে পারে। যাইহোক, তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও লোকজনকে নিজামুদ্দিন থেকে ফিরাতে পারে নি। বরং লোকজন ঠিকই নিজামুদ্দিন যাওয়ার উপায় বের করেছে।

ব্যর্থতা ৪ –

কথিত ‘আলমী শূরা’গণ সব সময়েই দাবি করে আসছে যে, উলামা কেরাম মাওলানা সাদ সাহেবের ব্যাপারে আস্থাশীল নন।

সাহারানপুরে এক বিবাহ অনুষ্ঠানে ভারতের অনেক আকাবির উলামা কেরাম উপস্থিত ছিলেন। সাহারানপুর, দেওবন্দ, নদওয়া, থানাভবন, কান্ধালা এবং ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে অনেক আকাবিরগণ অংশ নেন। এদের মধ্যে মাওলানা তলহা সাহেব, মাওলানা রাবী’ হাসান সাহেব প্রমুখ ছিলেন। দামাত বারকাতুহুম। সেখানে তাঁরা মাওলানা সাদ সাহেবের প্রতি সমর্থন জানান, এমনকি তাঁকে কিছু কথা রাখতেও অনুরোধ জানান। অতি সম্প্রতি হযরত পীর সাহেব মাওলানা তলহা সাহেবের স্ত্রীর জানাযায় মাওলানা সাদ সাহেবকে ইমাম বানিয়ে সম্মানিত করা হয়। যদিও সেখানে আরো বড় বড় বুযুর্গানে কেরাম উপস্থিত ছিলেন।
এগুলোই কি অনাস্থার নমুনা?

ব্যর্থতা ৫ –

এছাড়া অনেক মাদ্রাসা নিজামুদ্দিনে আলেমদের জামাত পাঠাচ্ছেন, যারা মাওলানা সাদ সাহেবের সাথে সাক্ষাত করছেন। গত মাদ্রাসা ছুটির সময় আমাদের কাছে খবর এসেছে ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে ১৬৯ টি শুধুমাত্র আলেমদের জামাত নিজামুদ্দিন এসেছেন। তলাবাদের হিসাব ভিন্ন। তাঁরা মাওলানা সাদ এবং নিজামুদ্দিন থেকে হেদায়েত নিয়েছেন।

ব্যর্থতা ৬ –

কথিত ‘আলমী শূরা’র ফিৎনাকারী লোকগুলো উমরার নামে হিজায গিয়েছিল। সেখানে তারা আরবদের সমর্থন আদায়ের জন্য অনেক চেষ্টা চালায়। সেখানে তারা একটি জোড় করতে সমর্থ হয়েছিল। কিন্তু বহু কষ্টের পরে সামান্য কিছু আরব জড়ো হন। সেখানে উপস্থিত ‘আলমী শূরা’র এক নেতা কথা রাখেন যে, “আমরাই সহীহ নাহাজে তাবলীগ করছি। আমাদের সমর্থন করুন।”

আরব সাথীগণ উত্তর দেন, “আপনারা জানেন আমরা নিজামুদ্দিনের সাথে আছি। এবং শেইখ সাদ আমাদের আমীর। আমরা আপনাদের প্রয়োজন অনুভব করি না।”

ব্যর্থতা ৭ –

কিছুদিন আগে ব্লাকবার্ন ইজতেমায় সামান্য কিছু মুখচেনা আলেম অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমরা পূর্বের এক কিস্তিতে ইতিমধ্যেই কারগুজারী দিয়েছি। এটা পুরোপুরি ব্যর্থ একটি ইজতেমা ছিল। বরং একটি আইওয়াশ ছিল। ইজতেমার ছদ্দবেশে বলা চলে এটি ‘গুজরাটের পীর সাহেবদের’ ওয়াজ মাহফিল। ব্লাকবার্নের গুজরাটি কমিউনিটির কিছু মানুষ এতে উপস্থিত ছিল। এর বাইরে খুব কম সংখ্যক মানুষই এতে অংশ নিয়েছেন।

তাই মাথা ঠান্ডা করে, মনমানসিকতা স্থির করে তওবা করুন। নিজামুদ্দিন ফিরে যান। নিজামুদ্দিনের নাহাজ এবং তরতীবের উপরে উঠুন। মাওলানা সাদ সাহেবকে আমীর হিসাবে মেনে নিয়ে চলুন। আপনাদের প্রয়োজন এবং চাওয়া পাওয়া মাসোয়ারায় পেশ করুন।
আল্লাহ আমাদের মুক্তি দিন, এই খবিসা বিদ্রোহী ফিৎনা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

আলমী শূরার ব্যর্থতা || আলমী শূরার বাস্তবতা||

মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবের গ্রুপ, আলমী শূরা, প্রথম বারের মত নিজামুদ্দিন এবং মাওলানা সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে মাসোয়ারার ব্যবস্থা করে, ভারতের বিভিন্ন স্থানের বিশেষ করে পুরাতন/জিম্মাদার সাথীদের দাওয়াত দেয়া হয়। দাওয়াতনামা পাঠানো হয়, পোস্টার ছাপানো হয়, প্রচুর টাকা পয়সা খরচ করা হয়। ভারত এক বিশাল দেশ, দেশের প্রতিটি কোনায় কোনায় আওয়াজ লাগানো হয় যে, “এই মাসোয়ারা সারা দুনিয়ার মেহনতের মধ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাবে।” ইত্যাদি ইত্যাদি।

এর সমাপ্তি হয়েছিল এভাবে, প্রায় প্রত্যেক রাজ্য, এলাকা এবং এমনকি গ্রাম থেকেও জিম্মাদার সাথীরা উত্তর দেন, “আমরা এই মাসোয়ারায় আসছি না।” ― এই দাওয়াতনামা এক ব্যক্তি থেকে এসেছে। হ্যাঁ, মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবের সম্মান ও মর্যাদা আমাদের অনেক উপরে। কিন্তু এটা ততক্ষণ ছিল যতক্ষণ তিনি নিজামুদ্দিনে ছিলেন। এখন তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। তাই তার চিঠি এবং ব্যক্তিত্ব কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয়। যেহেতু এই চিঠি মারকাজ থেকে আসেনি, তাই আমরা এই দাওয়াত গ্রহণে অপারগ। কেউ কেউ এমনও লিখেছেন, এই মাসোয়ারা হল, নিজামুদ্দিনের বিদ্রোহীদের মাসোয়ারা। তাই আমরা এতে অংশ নিতে পারি না।

গভীর দুঃখের সাথে আমরা একথা লিখতে বাধ্য হচ্ছি যে, আগে যে কোন জায়গায় তারা হাজির হলে এক/দুই ঘণ্টার মধ্যে হাজারো সাথী জমা হয়ে যেতেন। এখন সাধারণ সাথীরাও তাদের বিদ্রোহী গং হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। কেনই বা হবে না? এই গোষ্ঠীই মাওলানা সাদ সাহেবকে অন্যায় ভাবে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছে যে,

তিনি: ( লাইনচ্যুত, ( কারো এজেন্ট, ( অবাধ্য,
( উন্মত্ত, ( জাদুগ্রস্থ, ( অভদ্র ও উদ্ধত, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

মুম্বাইয়ের ব্যর্থতার পর এই খবিসা আলমী শূরা ভারতের মিরাটে তাদের প্রথম আলেমদের জোড় ঘোষণা করে। কিন্তু সাধারণ সাথীরা তা হতে দেয়নি। এটাও ব্যর্থ হয়েছে। এরপর তারা বিহার, কলকাতা এবং বানারসে ইজতেমা রাখে। বানারসে ইমারতের পক্ষেও একটি ইজতেমা ছিল। এই ইজতেমা সর্বসাধারণকে আসল বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়। ফলে উপরের তিনটি ইজতেমাই ক্যানসেল/বাতিল করা হয়েছিল। এরপর তারা বাতিলের মেহনতের মত দুরদুরান্তে নজর দেয়, যেমন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং আশপাশের এলাকা। সেখানে অনেক গুজরাটি ধনবান বড় বড় গো খামার ও মাংশ ব্যবসায়ী থাকেন। যখন সেখানে ইজতেমা রাখা হয়, এ সকল ধনবান ব্যবসায়ীগণ তাদের শ্রমিকদেরও সেখানে নিয়ে যায়। এভাবে ১০০০-১৫০০ এর মজমা কায়েম হয়। তাদের মধ্যে তাবলীগী কোন উদ্দীপনা ছিল না বললেই চলে। জামাত বের করার তেমন কোন চেষ্টাই করা হয় নি। মেহনতের সাথী হলে তাশকীল করা যায়। নতুন নতুন সাথীদের কিভাবে তাশকীল করবেন?

তিন জায়গা মারকাজের জন্য সম্ভাব্য হয় – ১. ব্যাঙ্গালোর ২. আম্বুর (মাদ্রাজ) ৩. সাউথ আফ্রিকা।

বর্তমানে এই তিন তিনটি জায়গাই তারা হারিয়েছেন। একই ভাবে ছোট ছোট এলাকাও তাদের হাত ছাড়া হয়ে যায়। যেমন থানাভবন, গানতুর, সুরাট, মহিসুর ইত্যাদি।

ফেরাউনের জাদুকরদের মত, যারা লাঠি এবং দড়ি দিয়ে ছোট ছোট সাপের কুহেলিকা বানিয়েছিল এবং বিজয়ানন্দে উৎফুল্ল হয়েছিল। একই ভাবে আল্লাহ তায়ালা মুসা আলাইহিস সালামকে হুকুম করেছিলেন লাঠি মাটিতে ফেলতে, যা এক বিরাট অজগরে পরিণত হয়ে এক গ্রাসে জাদুকরদের ছোট ছোট সব সাপ গিলে ফেলে। সব জাদুকর সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, পরাজয় স্বীকার করে এবং ঈমান কবুল করে।

একই অবস্থা হয়েছে কথিত আলমী শূরাদের। নিজামুদ্দিনের মাতাহাতে অনুষ্ঠিত আওরঙ্গবাদ ইজতেমা যেন তাদের প্রহেলিকার ছোট ছোট ইজতেমা গুলোকে গিলে খেয়ে ফেলেছে। ২০১৮ এর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত এই ইজতেমার জনসমাগম দেখে ভারতের বেশ কিছু প্রসিদ্ধ সাংবাদিক এতই অভিভূত হন যে, কেউ কেউ একে মানব ইতিহাসের সর্ব বৃহৎ জনসমাগম হিসাবে অভিহিত করেন। ইজতেমার আয়োজকদের ধারণা মতে প্রায় ৬০-৭০ লক্ষ মানুষ এখানে অংশগ্রহণ করেন। যদিও কোন কোন সাংবাদিক ১ কোটি ২০ লাখ পর্যন্ত বলেছেন।

কিন্তু দুঃখজনক, সেই কাফের জাদুকরগণ পরাজয় স্বীকার করে মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গী হয়েছিলেন। কিন্তু ফিৎনায়ে খবিসা আলমী শূরা একগুঁয়েমি করে এখনো তাদের ভুলের উপরেই অটল রয়েছেন। তারা সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েও সফল হচ্ছেন না। “তাদের মধ্যে কি বিচক্ষণ কেহই নেই?” (সূরাহ হুদ:৭৮)

আলমী শূরার ব্যর্থতা || মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবের দিবাস্বপ্নের অপমৃত্যু ||

একেবারে শুরু থেকেই মাওলানা আহমাদ লাট সাহেব আগের পর্ব সমূহে বর্ণিত উচ্চাভিলাষী গোষ্ঠীর মধ্য থেকে ছিলেন। মাফিয়া সমতুল্য কিছু গুজরাটি চক্র যারা, আগে থেকেই নিজামুদ্দিন মারকাজ কব্জা করে রেখে ছিল, তাঁকে নদওয়াতুল উলামা থেকে ফারেগ হতে না হতেই একেবারে সরাসরি হজরতজী ইনআমুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহির প্রধান খাদেম বানিয়ে দেয়। কেউ যখন উচ্চাভিলাষী হয়ে যায় তখন আর তার তরবীয়ত সম্ভব হয় না।

এ কারণেই মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেব এবং মাওলানা আবুল হাসান আলী মিয়া নদভী (রাহিমাহুমুল্লাহ) তাঁকে অনুগত ও ছোট হবার উপদেশ দ্বারা সংশোধন করার চেষ্টা করেছিলেন (যেমন,শেষ অংশে উল্লেখ করা হয়েছে)। সমগ্র মানব জাতির মধ্যে, তিনি একমাত্র ব্যক্তি যে একই উপদেশ বিভিন্ন মুরুব্বিদের থেকে পেয়েছেন! কেন এমন চিঠি সমূহ শুধু মাওলানা লাট সাহেবের জন্য লেখা হয়? এটা ছিল তাঁদের দূরদৃষ্টি; এই ব্যক্তি হজরতজীর এমন খিদমত করেছেন, এক দিন নিজেও হজরতজী হবেন, এমন স্বপ্ন ছিল এবং এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একদিন বিশ্বজুড়ে ফিৎনার উত্থান ঘটাবেন! সত্যই, যদি সেদিন ‘আলমী শূরা’ গৃহীত হত, তার এই আকাঙ্ক্ষাও পূরণ হত।

দুঃখজনক, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাঙ্গণেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন; যখন একজন উম্মত স্বপ্নে দেখেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন, “কে আছ! আহমাদ লাটকে মদীনা থেকে বাহিরে নিয়ে যাবে (সে আমাকে অনেক কষ্ট দিচ্ছে)?” সেই রাতেই তাকে মদীনা থেকে চলে যেতে হয়েছিল এবং জেদ্দায় যেতে হয়েছিল। এরপরে আর তিনি কখনোই উমরাতে ফিরতে পারেন নি। অন্যথায় তিনি খুব তাড়াতাড়িই উমরাহ করতে আসতেন, কয়েক মাসের মধ্যেই। মাওলানা সাহেব! মদীনায় ফিরে যান, সবাইকে শান্তির মধ্যে আনুন; আপনার প্রতি তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনুন।

একটি সুন্দর দিবাস্বপ্নের বেদনাদায়ক অপমৃত্যু

হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমতুল্লাহির পরে যদি কেউ হজরতজী হতে পারে তাহলে তিনি মাওলানা আহমাদ লাট। অন্য কেউ তো এই কাজের যোগ্য বলেই মনে হয় না। মাওলানা ইব্রাহীম দেউলা একজন চুপচাপ মানুষ। তিনি কি মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবের সামনে কিছু করতে পারবেন? কিন্তু দৃশ্যপটে হাজির হল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ক্ষমতা! হঠাৎ করেই দান পাল্টে যেতে লাগলো। গতকালের বাচ্চা, নবীন এবং কাঁচা, মাওলানা সাদ দাঁড়িয়ে গেলেন। কে জানত যে, সে এত উপরে উঠবে, আল্লাহ তাঁকে এত মদদ ও নুসরাত করবেন! এবং আমাদের বড়দের নূরের আভা তাঁর থেকেই এত পরিমাণ জ্যোতির্ময় হয়ে আবারো বিচ্ছুরিৎ হবে! আল্লাহর সাহায্য না থাকলে এই তাবলীগী পলিটিক্সের মাফিয়াগণ বহু আগেই তাঁকে সাইড কাটাতে পারতো। যেভাবে তারা তাঁর বাবা মাওলানা হারুন সাহেবের সাথে করেছিল (রাহিমাহুমুল্লাহ)।

মাওলানা সাদ সাহেবের এমন মজবুত এবং দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে যাওয়া, এবং ২০১ দেশের সাথীদের কাছে আমীর হিসাবে গৃহীত হওয়া, এবং ইলম ও বাসীরতের সাথে এই মেহনতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং এই ঘোর ফিৎনার বিরুদ্ধেও বুক চিতিয়ে অটল থাকা যেন মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবের ৫০ বছরের স্বপ্নে পানি ঢেলে দিয়েছে এবং তার স্বপ্নের সৌধ যেন কাদামাটির স্তূপে পরিণত হয়েছে। মাওলানা যুবায়েরুল হাসান (রহ) দাফন সম্পন্ন হবার পরে এই ফিৎনাবাজ লোকগুলো মাওলানা সাদ সাহেবকে বলেছিল, “তোমার বিছানা ও জিনিস পত্র গুছিয়ে নাও। আমরা ট্রাক নিয়ে আসছি। তোমাকে এখনই নিজামুদ্দিন খালি করে দিতে হবে!” অবস্থা যখন এমনই চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন মেওয়াত ও দিল্লীর সাথীরাও চরম সিদ্ধান্ত নিল যে এই খবিসা মাফিয়াদের ঝেড়ে ফেলতে হবে। খুব শীঘ্রই এই মাফিয়ারা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং নিজামুদ্দিন খালি করে চলে যায় এই ভেবে যে, যদি ফলদায়ক কিছু করার থাকে তা হল নিজেরাই আলাদা কিছু করা। এরপর তারা এই আলমী শূরা বানায়।

মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান এবং মাওলানা আলী মিয়া নদভী রহমতুল্লাহি আলাইহুমা –

১৯৭৬ সালে মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেব এক পুরনোদের জোড়ে ছিলেন। সাথে মাওলানা আহমাদ লাট সাহেব, মাওলানা ইসমাঈল গোদরা এবং আরো কিছু পুরান সাথী ছিলেন। মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেব হঠাৎ মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবের দিকে ফিরলেন এবং বললেন, “দেখ! কখনো মারকাজ নিজামুদ্দিন ত্যাগ কর না। তাতে যত যাই ঘটুক।”

মাওলানা আলী মিয়া নদভী রহমতুল্লাহি আলাইহি –

হযরত মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেবের মত তিনিও মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবকে উপদেশ দেন, “কখনো কারো কাছে বিক্রি হয়ো না। অনেক নিলামকারী ক্রেতা দেখতে পাচ্ছি।”
এটাই আমাদের আকাবিরদের দূরদৃষ্টির নমুনা। যা আজ সত্য হয়েছে। এমন কথা তাঁরা চার দশক আগেই বলে গিয়েছেন। রহিমাহুমুল্লাহ। কখনো কখনো আল্লাহর ওলীদের কিছু জ্ঞানগর্ভ গুরুত্বপূর্ণ বাণী যা তাঁরা উচ্চারণ করেন, অনেক পরে গিয়ে সত্য প্রমাণিত হয়।

আলমী শূরার ব্যর্থতা || মাওলানা ইব্রাহীম সাহেব এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ ||

মাওলানা ইব্রাহীম দেউলা হাফিজাহুমুল্লাহ –

আমরা প্রত্যয়ের সাথে বলতে পারি মাওলানা ইব্রাহীম সাহেব একটা মানসিক টানা পোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর দিল বলে এক কথা কিন্তু বিবেক বলে আরেক কথা। যদি বিবেক জয়ী হয় তিনি নিজামুদ্দিন ফিরে আসবেন। আর যদি অন্তর জয়ী হয় তাহলে তাঁর ভাগ্য হবে ভবঘুরেদের মত উদ্দেশ্য বিহীন। বিবেক এবং অন্তরের এই যুদ্ধে প্রায়ই সিদ্ধান্তে পৌঁছা অসম্ভব হয়ে পড়ে, এবং ব্যক্তি এক মানসিক যন্ত্রণা ভোগের পরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া যায় একটা রাস্তা বের হয়ে আসে। যতই দেরি হবে জিন্দেগী কঠিন হয়ে যাবে।

মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রিয় ইব্রাহীম সাহেবকে তাঁর চিরচেনা ঘর নিজামুদ্দিন ফিরে আসা সহজ করে দেন। এবং তাবলীগের মহান মেহনতের সাথীদের তরবীয়ত করার তৌফিক দান করেন।

মাওলানা ইব্রাহীম সাহেবের ব্যাপারে জর্ডান থেকে পাওয়া খবর। ‘জর্ডান ইজতেমা – জুন ২০১৮’ –

যখন আলমী শূরাদের জামাত জর্ডান মারকাজে পৌঁছল, স্থানীয় এক সরকারী অফিসার আসলেন। তিনি দাওয়াতে তাবলীগেরও জিম্মাদার সাথী। মাওলানা ইব্রাহীম সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন (এগুলো আমাদেরও বহুদিন ধরেই জিজ্ঞাস্য), “শেইখ! আপনার কথিত এই শূরাইয়াত পদ্ধতি কুরআন, হাদীস ও সীরতের আলোকে প্রমাণ করুন।” কিন্তু মুরুব্বীগণ উত্তর দিতে ব্যর্থ হলেন। ওই শেইখ আবারো জিজ্ঞাসা করলেন, “তাহলে কি আপনারা এখানে সাধারণ মানুষদের ভুল রাহবারী করতে এসেছেন?” তখন হযরতগণ জবাব দেন, “আমরা আপনাদের আমীরের নিমন্ত্রণে এসেছি।” স্থানীয় ঐ সরকারী কর্মকর্তা ও সাথী বলেন, “আমাদের আমীর তো আমরাই পছন্দ করেছি। আমরা তাঁকে সরিয়েও দিতে পারি, যদি তিনি শূরা পদ্ধতি সমর্থন করেন, যা কুরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। একইভাবে আমরা আপনাদের বহিষ্কার করার অধিকার সংরক্ষণ করি কেননা আপনারা আমাদের দেশে শূরাইয়াত ফিৎনা ছড়ানোর কারণ হচ্ছেন।” মাওলানা ইব্রাহীম সাহেব হাফি: কাঁদতে শুরু করেন। তাই ঐ স্থানীয় শেইখ বলেন, “এখানে কাঁদবেন না। নিজামুদ্দিন যান, সেখানে কাঁদুন।” মুম্বাইয়ের মাওলানা আব্দুর রহমান সাহেব কিছু একটা বলতে যান। কিন্তু ঐ শেইখ হস্তক্ষেপ করেন এবং বলেন, “আপনি চুপ করুন।” আরো বাড়তি বিব্রতকর অবস্থা এড়াতে মাওলানা ইব্রাহীম সাহেব দীর্ঘ ছয় ঘন্টা আগেই তাঁর জামাত নিয়ে এয়ারপোর্ট চলে যান।

মন্তব্য: এই শূরার লোকজন তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য মাওলানা ইব্রাহীম সাহেবকে ব্যবহার এবং অপব্যবহার করছে, এবং এভাবে তাঁর অমর্যাদা করছে। এই একই পদ্ধতি তারা মাওলানা ইহসান সাহেবের সাথেও করছে। তাঁর চরম অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে সারা দুনিয়াতে ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে। এসব প্রকাশ্য জুলুম!

শুধু একটি চিঠি নয় || এ যেন অস্থির উম্মার আকুল আবেদন ||

বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে শেইখ ইব্রাহীম দেউলা দামাত বারকাতুহুম এর প্রতি একটি চিঠি –

১লা শাওয়াল ১৪৩৯
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ
সম্মানিত শেইখ ইব্রাহীম দেউলা, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু।

আমি আপনাকে এই চিঠি লেখার আগে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করেছি, লম্বা সময় ধরে বিস্তারিত ভাবে মাসোয়ারা করেছি এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সাথে এতদিন ইস্তিখারা করেছি যতদিন না আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমার দিলে এই কথা গুলো ঢেলেছেন। আমি আল্লাহর কাছে উমিদ রাখি আপনি গভীর চিন্তা ভাবনা এবং বিবেচনা নিয়ে এই চিঠি পড়বেন। আল্লাহর তৌফিকে হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমতুল্লাহির ইন্তেকালের পরে ১৯৯৪ সালে নিজামুদ্দিনে একবার আপনার মুবারক কদমের কাছে বসার সুযোগ হয়েছিল। এবং প্রথম যে কথাটা আপনার থেকে শুনে ছিলাম তা হল…
انَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا

এবং শেষবার যখন ২০১৫ সালে আপনার সান্নিধ্য লাভ করেছিলাম তখনও আপনার থেকে শুনেছিলাম…
انَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا

এই দুই তারিখের মধ্যবর্তী সময়ে আমি বেশ কয়েকবার নিজামুদ্দিন, বাংলাদেশ, জর্ডান, ইউরোপ, আমেরিকা সফর করেছি এবং অসংখ্য ইজতেমায় শরীক হয়েছি। প্রতিবারই আপনি বয়ানে ইস্তিকামাত এবং জমে থাকার ব্যাপারে কথা বলেছেন। শেইখ ইনআমুল হাসান সাহিব, শেইখ উমার পালানপুরী, শেইখ মিয়াজী মেহরাব এবং নিজামুদ্দিনের প্রথম জামানার অগণিত উলামাকেরামদের পরে আপনিই সবচেয়ে বড় এবং বিশিষ্ট হিসেবে রয়ে গেছেন। পূর্ববর্তী মহান বুযুর্গগণ আপনার নিকটে এক আমানত রেখে গেছেন, তা হল দাওয়াতের মেহনতের আমানত। সারা জাহান আপনার কাছে জমা হতে শুরু করেছিল এবং রাহবারী নিতে শুরু করেছিল। আপনিই এই মহান মেহনতের পিতামাতা। আপনার কথাই এই মহান মেহনতের কানুন সমতুল্য।

কাজেই, হে আমাদের নেতা! আপনার প্রচেষ্টা, চোখের পানি, ঘাম, আপনার হাড়ভাঙা খাটুনি, আপনার পেরেশানী ও দুশ্চিন্তা, লম্বা মাসোয়ারা, আপনার জান মাল সময়ের অনন্য কুরবানী এবং কঠোর মুজাহাদার বদৌলতে এই মোবারক মেহনত আজ পাঁচও মহাদেশের প্রতিটি পাহাড়, উপত্যকায়, প্রতিটি শহর ও গ্রামে পৌঁছে গেছে। সারা জাহান সুচারুভাবে সহীহ নাহাজে ৬ সিফাত ও ৫ কাজের চর্চা করছে। কোন শক্তি, কোন ব্যক্তি হোক সে নাসারা বা ইয়াহুদী, শিয়া বা অন্য যে কেউ, কেউই এই মেহনতের সামনে (প্রতিবন্ধক হয়ে) দাঁড়িয়ে সফল হতে পারেনি, যেমন কেউই উজ্জ্বল সূর্যের সামনে দাঁড়াতে পারে নি।

হায় আফসোস! “সেই মহিলার মত হয়ো না, যে যে তার সূতা বুননের পরে আবার টুকরো টুকরো করে ফেলে” (সূরা নাহল: ৯২)

আপনি নিজামুদ্দিন থেকে চলে যাওয়ার পরে সারা দুনিয়ার যত জায়গায় এই মোবারক মেহনত পৌঁছে ছিল সকল জায়গায় ইখতিলাফ ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে আমরা যারা এই মেহনতের সাথে জড়িত তারাই আজ এর পথে (বাধা হয়ে) দাঁড়িয়ে গেছি। যেখানে শয়তানও এই মেহনতের সামনে (প্রতিবন্ধক হয়ে) দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে আমরাই আজ এই মেহনতের প্রতিবন্ধক হতে সফল হয়েছি, তা দুর্ঘটনাবশতই হোক অথবা সুচিন্তিত ভাবেই হোক। এখন সকল দেশ, সকল মারকাজ, সকল মসজিদ, সকল মাসোয়ারা এবং সকল গাশতেই এই ইখতিলাফ হচ্ছে। এসব এত বেশি আলোচনা হচ্ছে যে মুমিনীনরা হতাশ হয়ে যাচ্ছেন, সহনশীলগণও ধৈর্য্যহারা হচ্ছেন, বুদ্ধিমানগণও এই ফিৎনার কারণে দিশাহারা হয়ে যাচ্ছেন। এবং এর দ্বারা প্রথমত এবং একমাত্র ফায়দাবান হচ্ছে শয়তান এবং তার দলবল (এছাড়া আমাদের কারোই কোন উপকার হচ্ছে না)।

আল্লহ কসম, এই ফিৎনা খিলাফত ধ্বংসের সমতুল্য।

এই আমলই অতীত এবং বর্তমানের উম্মতের রূহ। বাতিলের সকল শক্তি একত্রিত হয়ে প্ল্যান প্রোগ্রাম ষড়যন্ত্র করলেও কিছু আসে যায় না, তারা কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু যদি আমরা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ না থাকি তাহলে এটা আমাদের উপর খারাপ প্রভাব ফেলবে। আমরা ইখতিলাফ করতে থাকলে এই কাজ কখনো আগাবে না। কুরআন, হাদীস এবং সাহাবাদের জিন্দেগীতে ইখতিলাফ এবং মুখালীফাতের ক্ষতি সম্পর্কে যে সব বর্ণনা এসেছে সেগুলো আপনার সামনে উপস্থাপন করতে আমি একেবারেই অনাগ্রহী। কেননা আমাদের উস্তাদ হিসাবে এসব আপনি আমার চেয়ে ভালোই জানেন।

এ কারণে, আমাদের সম্মানিত শায়েখ, যে জিনিস আপনাকে শেইখ সা’দের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজামুদ্দিন ত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছে, তা নিশ্চয়ই এতদূর পর্যন্ত ইখতিলাফ সৃষ্টি করার মত ছিল না যতখানি ইখতিলাফ ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। আপনি নিজামুদ্দিন ছেড়ে না গেলে হত এত কিছু হত না। তাই (আদবের সাথে আরজ), নিজামুদ্দিন ফিরে যান, তাঁর সাথে জুড়ুন, সহযোগিতা করুন, পরামর্শ দিন, তাঁর ইমারতের সমর্থন করুন। কেননা এই মুহুর্তে এটাই তাঁর জন্য সবচেয়ে জরুরী। আপনি তাকে খুব ভালো ভাবেই চিনেন। তিনি আপনার পুত্রের মত এবং আপনার ছাত্র। মেহেরবানী করে তাঁর পথে (বাধা হয়ে) দাঁড়াবেন না। কেননা আপনার নিজামুদ্দিন এবং তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়া তাঁকে কপট (মুনাফিকীন) ও স্বার্থপরদের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীল করে ফেলেছে।

সম্মানিত শেইখ ইব্রাহীম, শেইখ সা’দের বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগের চেয়ে বরং আপনার মারকাজ ত্যাগই সারা দুনিয়াতে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাই আমাদের সম্মানিত উস্তাদ, (মেহেরবানী করে) ঐ ব্যক্তির মত হবেন না যে, যে কোন ভেড়া লালনপালন করে, ভালো মত খাওয়ায়, মোটাতাজা করে অতঃপর জবাই করে। এই ফিৎনা আপনি চলে যাওয়ার পর থেকে ছড়িয়েছে। দাওয়াহ ইলাল্লাহ এভাবে চলতে পারে না। নিজামুদ্দিন এবং শেইখ সা’দের নিকট ফিরে গিয়ে উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ করুন। তাঁকে সহায়তা করুন, সংশোধন করুন এবং সমর্থন দিন। কেননা আপনি সেই সকল মহান ব্যক্তিত্বের অন্তর্ভূক্ত যারা এই মেহনত প্রসারিত করেছেন, মদদ করেছেন এবং এতে অনন্য শক্তি দান করেছেন। (মেহেরবানী করে) এখন এ মেহনতকে হত্যা করবেন না।

পরিশেষে, আমাদের সম্মানিত উস্তাদ, সময় এখন আমাদের অনুকূলে নয়। আমার তো আশঙ্কা হচ্ছে পরিস্থিতি আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ভাবার মত সময় একদম নেই। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি আপনি অতিসত্বর নিজামুদ্দিন ফিরে গিয়ে সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু করবেন। কারণ সংশোধন শুধুমাত্র ভিতরে থেকেই করা সম্ভব, বাইরে থেকে নয়।

আমার মাননীয় উস্তাদ, মহান আল্লাহর কাছে আমি ব্যাকুল ভাবে আপনার সুদীর্ঘ জীবন এবং উত্তম প্রত্যাবর্তন প্রার্থনা করি। আমাদের দূরতম কল্পনাতেও আসে না যে আপনি নিজামুদ্দিনের বাইরে ইন্তেকাল করবেন। কেননা এতে ফিৎনা অপ্রতিরোধ্য ভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং ঠেকানোর কেউই থাকবে না। এজন্য আপনিই হবেন প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি যাকে সবাই দায়ী করবে।

আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যে নিয়ন্ত্রণ করার মত অবস্থানে আছেন। আপনিই সেই শক্তির অধিকারী যিনি এই ফিৎনা ভঙ্গ করতে পারেন এবং সম্পূর্ণ পর্যদুস্ত করে একেবারে নীরব নিস্তব্ধ করে দিতে পারেন। এটা কেবলমাত্র তখনই ঘটবে, যদি আপনি নিজামুদ্দিন ফিরে যান।

আমাদের পূর্ববর্তী আকাবিরগণ আপনার কাছে এই মহান আমানত রেখে গেছেন। তাই আমরা কামনা আপনি ভবিষ্যতে কোন ধরনের ইখতিলাফ ব্যতীত এই মহান আমানতদারী রক্ষা করবেন, যেহেতু শেইখ সা’দের মুখালীফাত অনেক বড় এবং মারাত্মক।

আল্লাহর দরবারে আমার প্রার্থনা উম্মতকে আবারো এই মহান কাজের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করে দেন; যেন আমাদের এক কালিমাহ, এক মাসোয়ারা, এক মারকাজ তথা মারকাজ নিজামুদ্দিন। যথাযথ সম্মানের সাথে আপনার মাধ্যমে এই চিঠি শেইখ আহমাদ লাট সাহিবের সম্মুখেও পেশ করছি। (হাফিজহুমুল্লাহ)

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু।
إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ ۚ وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ ۚ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ.

লক্ষণীয়: মূল লেখকের মতামত তুলে ধরার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে অনুবাদটি সংকলন করা হয়েছে।

আলমী শূরার ব্যর্থতা || আলমী শূরাদের ব্যর্থ ইজতেমা সমূহ এবং আল্লাহর পাকড়াও ||

** দক্ষিণ আফ্রিকাতে অল্প কয়েক হাজার লোক অংশ নেয়। কিন্তু এমনই ভারী বর্ষণ শুরু হয় যে সবকিছু শেষ হয়ে যায় এবং লোকজন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

** গ্রীসের মাসোয়ারায় এই ফিৎনা থেকে ২০ জন অংশ নেয়। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল এই মাসওয়ারার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে। অপরদিকে নিজামুদ্দিন থেকে মাত্র একজন আসেন। স্থানীয় সাথীরা নিজামুদ্দিনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তাঁকেই মাসোয়ারার ফয়সাল বানান। এই মজমা নূরে ভরপুর থাকে।

** শূরাদের পুনে ইজতেমা __

২০১৮ এপ্রিলে শূরার সমর্থনে পুনেতে ৫ জেলার ইজতেমা রাখা হয়। অনেক ভাবে চেষ্টা করা হয়। রাস্তায় রাস্তায় মাইকিং করা হয়! কোন মসজিদ বা মাদ্রাসা তাদের এই ফিৎনার ইজতেমার ভেন্যু হতে রাজি হয় নি। তাই তারা একটি মন্দিরের হল রুম তিন দিনের জন্য ভাড়া করে! ২ দিনে যা মজমা হয়েছে তা উল্লেখ করার মত কিছু নয়। তৃতীয় দিনে ৪০০০ এর মত দুআয় শরীক হয়। কিন্তু কোন জামাত বের হয় নি। শূরার লোকদের মধ্যে শুধুমাত্র মাওলানা ইসমাঈল গোদরা উপস্থিত ছিলেন এবং মুজাকারা ও বয়ান রাখেন।
** সুরাটের ২ জামাতের কারগুজারী __

সুরাট থেকে ৪০ দিনের জন্য দুই জামাত কর্ণাটক যায়। কিন্তু সময় পুরা না করেই তারা ফিরে আসে। জিজ্ঞাসা করা হলে তারা উত্তর দেন, আমাদের নুসরাত করার কাউকেই পাওয়া যায় নি। সবাই নিজামুদ্দিনের সাথেই সম্পৃক্ত আছেন। আমরা উমুমী গাশত করতেও অসমর্থ হয়েছি। আমরা শুধু মসজিদে অবস্থান করার অনুমতি পেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের নিজস্ব কোন এজেন্ডাই রাখতে পারি নি। স্থানীয় সাথীরাই মুজাকারা করত। তারা বলত , “হজরতজী আমাদের এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনারা থাকার অনুমতি পাবেন। আপনাদের যথাসাধ্য খিদমত ও ইকরাম করব। কিন্তু ছয় নম্বরের বাইরে কোন কথা আপনারা বলতে পারবেন না।” তাদের খিদমত ও ইকরাম সত্ত্বেও আমরা এক পর্যায়ে অসহায় বোধ করি এবং ভিআইপি বন্দীর মত অনুভূতি হয়। তাই আর কোন উপায় না পেয়ে আমরা ফিরে আসি।

আল্লাহই মানুষের অন্তরসমূহের নিয়ন্ত্রণ কর্তা। তিনি যখন ইচ্ছা করেন এর মধ্যে পছন্দ অপছন্দ যে কোন অনুভূতি স্থাপন করেন। এত আদর যত্নের মধ্যেও তাদের অন্তরে অসহায়ত্ব এবং বন্দীত্বের অনুভূতি ঢুকিয়ে দেন।
৭০ টি বড় বড় গুনাহের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হল উম্মতের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করা।

Advertisements

Leave a Reply