মাওঃ সাদ সাহেব এর ইমারত সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

ইমারত সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের বিস্তারিত বিশ্লেষণঃ

অনুবাদঃ শামীম হামিদী।

ইমারতের ব্যাপারে মাওলানা মেহবুব সাহেবের কিস্তির নির্যাস।

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রারম্ভিকা

তাবলীগের বর্তমান সংকটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা ধারাবাহিক ভাবে সিরিজ প্রকাশ করে আসছিলাম। এ পর্যায়ে আমাদের প্রকাশনা, ইমারতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা।

পরবর্তী সিরিজ  – তাবলীগের নাহাজ নিয়ে তেলেসমাতি, আসলেই কি কোন বিচ্যুতি হয়েছে? বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

এই সিরিজটি আমরা তিনটি পর্বে ভাগ করবো।

প্রথম পর্ব

মাওলানা মেহবুব সাহেব দামাত বারকাতুহুম এর কিস্তি থেকে মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারতের বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা।

দ্বিতীয় পর্ব

অনুবাদক জামাতের পক্ষ থেকে, মাওলানা সাদ সাহেবই কেন আমীর?

তৃতীয় পর্ব

শেইখ (মাওলানা) আব্দুল ওয়াহিদ মালিক মাদানী দামাত বারকাতুহুম এর বর্ণনায় হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের সময়কার দিনগুলোর বিস্তারিত বিবরণ।

প্রথম পর্ব

মাওলানা মেহবুব সাহেব দামাত বারকাতুহুম এর কিস্তি থেকে মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারতের বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা।

তাবলীগের সাথীদের জন্য অত্যাবশ্যকঃ

তাবলীগের সাথীদের জন্য ফরজ বা অত্যাবশ্যক কর্তব্য যে, তারা তাদের মনোযোগ কেবলমাত্র নিজামুদ্দিনের দিকেই নিবদ্ধ রাখবেন এবং তাবলীগের যে কোন বিষয়ে শুধু আমীর মাওলানা সাদ সাহেবের কথাই শুনবেন এবং শুধুমাত্র তাঁকেই মান্য করবেন। একই সাথে মারকাজের হেফাজত, মারকাজের মর্যাদা তথা মারকাজিয়াতের হেফাজত এবং মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারতের হেফাজত – এ সব কিছুই বর্তমান পরিস্থিতিতে তাবলীগের সাথীদের উপরে অবশ্য কর্তব্য হিসাবে আরোপিত হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পরীক্ষা:

বর্তমানে তাবলীগের সাথীরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে এক বড় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। যে অটল থাকতে পারবে সে রক্ষা পাবে আর যে স্লিপ কাটবে সে পস্তাবে। একটি শাখাকে ততক্ষণই শাখা বলা হয়, যতক্ষণ তা গাছের সাথে জুড়ে থাকে। এটি যখন মূল গাছ থেকে স্বাধীন তথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তখন আর একে শাখা বলা যায় না, এবং এটা গাছও হতে পারে না। বরং একপর্যায়ে শুকিয়ে যায়, মাটিয়ে মিশে গিয়ে অস্তিত্ব হারায়।

মারকাজের বুনিয়াদ কুরবানী:

আসলের ব্যাপারেই সবাই কথা বলে। কেউ শাখার ব্যাপারে কিছু জানতেও চায় না। [একসময় মাদীনা মুনাওয়ারা মুসলমানদের রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক তথা সব ধরনের মারকাজ ছিল।] লোকজন মাদীনা মুনাওয়ারা ছেড়ে দিয়েছে। এরপরে কুফা, বসরাহ, সমরখন্দ, বুখারা কত জায়গায় মারকাজ কায়েম করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মদীনাতেই ফিরতে হয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত মক্কা মদীনাতেই মারকাজ থেকে যাবে। [মুসলমানরা আজ খিলাফত হারিয়েছে। কিন্তু রূহানী মারকাজ হিসাবে সকল মুসলমানের দিল মক্কা মদীনার সাথেই জুড়ে আছে।] অন্যান্য মারকাজ গুলোর এখন কোন অস্তিত্বও নেই। এবং সেগুলো থেকে কোন বরকত হাসিলও সম্ভব নয়।

একইভাবে দারুল উলূমও দুটি শাখা হয়েছে। কিন্তু দারুল উলূম বলতে লোকজন আসল পুরানো দারুল উলূমই বুঝে। মাজাহেরুল উলূমের গল্পও একই।

যদি এই ফিৎনায়ে খবিসা আলমী শূরা কোন প্রতিদ্বন্দ্বী মারকাজ বানাতে চায়, তার অনুমতি অনুমোদন কোনটাই থাকবে না, এটা শুধুই একটা জায়গা হবে, মারকাজ হবে না। মারকাজের আশেপাশের সম্পত্তি ওয়াকফ করা হয়। [মারকাজ কুরবানীর বুনিয়াদের উপরে তৈরি হয়, কোন এলানের দ্বারা হয় না। যেমন ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের পরিবারের কুরবানীর দ্বারা মক্কা মুকাররমা সারা জাহানের মানুষের মারকাজ হয়েছে।]

সাম্প্রতিক সময়ে, শুধুমাত্র মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির পরিবারবর্গই পাওয়া যাঁরা ইসলামের জন্য সমস্ত কিছু কুরবানী করেছেন। অন্যান্য প্রসিদ্ধ, খ্যাতিমান ও সুপরিচিত ব্যক্তিবর্গ শুধুই তাবলীগের সাথে এসে জড়িত হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই তাবলীগ থেকে অনেক কিছু অর্জন করেছেন। এমন নয় যে তাঁরা তাবলীগ থেকে কিছু চুরি করেছেন বা নষ্ট করেছেন। বরং তাবলীগই তাঁদের দু হাত ভরে দিয়েছে। [সম্মান, ইজ্জত, সুনাম এমনকি সম্পদও।] কথিত আলমী শূরা বা তাদের সমর্থকদের এখন সম্পদশালী দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তাবলীগে লাগার আগে তাদের মুরুব্বীদের মধ্যে অনেকেই অনেক গরীব ছিলেন। যেমন একজন ছিলেন ঘড়ির মেকার, আরেক জন চা স্টল চালাতেন। তাবলীগের মাধ্যমে তাঁরা বড় বড় দুনিয়াদারদের সাথে সম্পর্ক করেছেন এবং সম্পদশালী হয়েছেন। (ইল্লা মাশা আল্লাহ)

পরিছন্নতার জামানা চলছে:

তিনটি জামানা পার হয়ে গেছে।
১. এই মেহনতের জন্ম ও অস্তিত্ব লাভ।
২. তরবীয়ত তথা বিকাশের জামানা
৩. নুসরাতের জামানা।

এখন চতুর্থ জামানা চলছে; যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অসীম ক্ষমতা বলে এক কুদরতী পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। যাদের অন্তরে কোন গুপ্ত বাসনা রয়েছে বা কোন ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য রয়েছে তারা নিজেরা পরিচ্ছন্ন হবে অথবা এই মেহনত থেকে আত্ম-বহিষ্কৃত হয়ে মেহনতকে পরিচ্ছন্ন করবে। আর যাদের অন্তরে ইখলাস থাকবে তারা আরো মজবুত হওয়ার তৌফিক পাবে।

হজরতজী মাওলানা ইউসুফ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন, যারা সবর ও ইস্তেকমাতের (ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার) সাথে মারকাজের সাথে লেগে থাকবে তারা রক্ষা পাবে। আর যারা মারকাজ থেকে দূরে থাকবে তারা হালাক হবে।

একজন ফাসেকও যদি ইজতেমাইয়াত ধরে রাখে এটা তার হেদায়েত ও নাজাতের জরিয়া হবে। অন্যদিকে একজন ধার্মিক ব্যক্তিও যদি ইজতেমাইয়াত থেকে সরে যায়, তার মৃত্যু জাহেলিয়াতের উপরে হবে। এবং ব্যর্থতা ও হতাশা ছাড়া তার কিছুই অর্জিত হবে না।

শূরা ও ইমারতের আদি কথা:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে দশ জন সাহাবীকে বিশেষ ভাবে সম্মানিত করে যান। তাঁদের আশারা মুবাশশারা বলা হয়। রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম। এ কথা প্রশ্নাতীত যে তাঁরাই এই উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত ছিলেন। এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁদের পরামর্শ বিশেষ ভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে বলেই সীরতের কিতাবসমূহে পাওয়া যায়। সে হিসাবে তাঁদের শূরা হিসাবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। পরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদাহগণ এঁদের মধ্যে থেকেই হয়েছেন।

নিজামুদ্দিন মারকাজে মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারত প্রতিষ্ঠা:

হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইন্তেকালের পূর্বে মাওলানা সাদ সাহেবকে বললেন দুআ ও মেহনতের দ্বারা নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। কেননা তাঁর (হজরতজী) পরে তাঁকেই (মাওলানা সাদ) এই জিম্মাদারী নিতে হবে।

মাওলানা সাদ সাহেব তাঁকে আরো গভীর ভাবে বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আপনি আমাকে আমীর মনোনীত করলে মাওলানা যুবায়ের সাহেবের মুহিব্বীনগণ কষ্ট পাবে। আবার মাওলানা যুবায়ের সাহেবকে আমীর মনোনীত করলে কিছু লোক আপনাকে দোষারোপ করতে পারে। হজরতজী ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি উত্তর করেন, তাহলে মাওলানা ইজহারুল হাসান তোমাদের দুজনের তত্ত্বাবধায়ক থাকবেন। রহিমাহুমুল্লাহ। তোমরা তিনজন সম্মিলিত ভাবে এই মারকাজ এবং কাজের দায়িত্ব সামলাবে।

মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেব, মিয়াজী মেহরাব সাহেব এবং না’ঈমুল্লাহ খান সাহেব এই কথপোকথন সম্পর্কে জানতেন। রহিমাহুমুল্লাহ। পরবর্তীতে হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের পরে তাঁর বানানো জামাত কোন একক আমীর মনোনীত করতে ব্যর্থ হলে তাঁরা হজরতজীর ঐ আশা বাস্তবায়ন করেন। এভাবে পূর্বল্লখিত তিনজনকে মারকাজ এবং এই মেহনতের জিম্মাদারী অর্পণ করা হয়।

পাঠকদের দিলের প্রশান্তির জন্য এই তিন হযরতের কিছু বৈশিষ্ট্য ও কর্মধারা সম্পর্কে জানা জরুরি।

(ক) মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। দুর্বলতা সত্ত্বেও তিনি কাশিফুল উলূম মাদ্রাসার জিম্মাদারী সামলাতেন। এছাড়া মারকাজের মসজিদওয়ার জামাতের জিম্মাদারীও তাঁর উপরে ছিল। (এই দায়িত্বকে আমাদের প্রচলিত মসজিদগুলোর সেক্রেটারির সাথে তুলনা করা যায়। অর্থাৎ মারকাজের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন।) এছাড়া প্রতিদিন রাতে তিনি মিম্বরে হায়াতুস সাহাবাহ পড়তেন। হায়াতের একটা লম্বা সময় ধরে তিনি এই দায়িত্বগুলো সামলিয়েছেন। এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দায়িত্বসমূহ পালন করেন।

(খ) মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি বেশ ভারী ছিলেন। এবং শারীরিক ভাবে খুব একটা সক্ষম ছিলেন না। তিনি মোটামুটি সারাক্ষণ দুআ এবং যিকিরে মশগুল থাকতেন। ১৯৮০ সালের হজ্জ সফরে শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রায় বেশির ভাগ সময় তাঁকে সাথে সাথে রাখেন। এবং এক পর্যায়ে তাঁকে খিলাফত দান করেন। যখন তিনি মারকাজে ফেরত আসেন তখন আমি (মাওলানা মেহবুব) সেখানে ছিলাম। আমি তাঁর হাবভাবের মধ্যে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা দুআ কান্নাকাটিতে মশগুল থাকতেন। ফলশ্রুতিতে তাঁর শরীর ভারী হয়ে যায়। [শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহির বিশিষ্ট খলিফা মাওলানা ইউসুফ মুত্বলা দামাত বারকাতুহুমের বিভিন্ন মুজাকারায় জানা যায়, শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহি মাওলানা সাদ সাহেবকেই ভবিষ্যতের আমীর হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন। তখনও মাওলানা সাদ সাহেব শিশু মাত্র। শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহি তৎকালীন মারকাজের জিম্মাদার সাথীদের উদ্দেশ্যে এক চিঠিতে বিশেষ ভাবে নির্দেশ দেন যে, শিশু সাদ সাহেবের যেন এমন তরবীয়ত হয় যাতে তিনি পরবর্তীতে এই কাজের জিম্মাদারী আদায় করতে পারেন। তাই ভবিষ্যৎ ইমারতের অন্যতম দাবিদার মাওলানা যুবায়ের সাহেবের মেহনতের রুখ পাল্টে দিয়ে তিনি যেন মাওলানা সাদ সাহেবকেই ইমারতের একমাত্র উত্তরসূরি মনোনয়ন করলেন।]

(গ) মাওলানা সাদ সাহেব দামাত বারকাতুহুম ছিলেন প্রাণশক্তিতে ভরপুর এক কর্মচঞ্চল তরুণ। হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁকে শুরু থেকেই বিভিন্ন সফরে নিজের সাথে নিয়ে চলতেন। মূলতঃ হজরতজীর আশীর্বাদেই মাওলানা সাদ সাহেব দাওয়াতে তাবলীগের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে একেবারে কচি বয়স থেকেই পরিচিত ছিলেন।

তাই এই তিনজনের মধ্যে প্রধানত সাদ সাহেবই জিম্মাদারী পালন করতেন।

২০১৪ এর আগে পর্যন্ত মাওলানা আহমাদ লাট সাহেব এবং ভাই ফারুক সাহেব (ব্যাঙ্গালোর) তাঁদের কখনো মাওলানা সাদ সাহেবের প্রশংসায় ক্লান্ত হতে দেখা যায় নি। হাফিজহুমুল্লাহ।

সকল আরব হযরতগণ এ কথা স্বীকার করেছেন যে তাঁরা মাওলানা সাদ সাহেবের বয়ানে স্পন্দিত হন, এবং তাঁর বয়ান তাঁদের মাওলানা ইউসুফ রহমাতুল্লাহি আলাইহির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

শুধু ভারতবর্ষই নয় বরং সমস্ত দুনিয়া তাঁর কথা পছন্দ করত। এবং যেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর পারদর্শীতা সবাইকে মুগ্ধ করত।

মাওলানা ইজহারুল হাসান এবং মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহিমাহুমুল্লাহ খুশি মনে তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে চলতেন এবং সহযোগিতা করতেন। এভাবেই সাদ সাহেবের নেতৃত্বে সব কিছু সুন্দর ভাবে চলছিল। [ভারতের সকল বড় বড় আলেমই এ কথা স্বীকার করেন যে, মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারত বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেব বহু আগেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও ফয়সালা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে অনানুষ্ঠানিক ভাবে মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারত প্রতিষ্ঠিত করে দেন। তিনি নিজে কখনো বড় কোন সিদ্ধান্ত নেন নি, বরং সাদ সাহেবের উপরে ছেড়ে দিতেন, তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নিতেন এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন।] এবং সারা দুনিয়ার লক্ষ লক্ষ পুরাতন সাথী এবং নিজামুদ্দিন মারকাজের প্রায় ১৫০ জন পুরাতন মুকিমীন হযরত আনন্দচিত্তে মাওলানা সাদ সাহেবকে আমীর হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছেন।

মানতে পারেননি শুধু চারজন
১. মাওলানা আহমাদ লাট
২. ভাই ফারুক
৩. প্রফেসর খালিদ সিদ্দিকী
৪. প্রফেসর সানাউল্লাহ
হাফিজহুমুল্লাহ

এই চারজন শূরা বানানোর ইস্যু উঠান এবং তাঁদের এই দাবী শক্তিশালী করতে বিভিন্ন ভাবে মাওলানা ইব্রাহীম দেউলা এবং মাওলানা ইয়াকুব সাহেবকেও দলে ভিড়ান। হাফিজহুমুল্লাহ। যদিও পরের জন খুব অল্প সময় পরেই মারকাজে ফিরে আসেন এবং এখনো অবস্থান করছেন।

হজরতজীর বানানো মাসোয়ারার জামাত বা শূরাদের ১৯৯৫ সালের মাসোয়ারার ফয়সালা অনুসারে বর্তমানে এই জাতীয় শূরা বানানোর অধিকার শুধুমাত্র মাওলানা সাদ সাহেবই রাখেন। হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহির বানানো বিশেষ মাসোয়ারার জামাত তথা শূরাকে সম্মান দেখিয়ে বড়জোর হাজী আব্দুল ওয়াহাব সাহেবের কর্তৃকও মেনে নেয়া যেতে পারে। (উল্লেখ্য ২০০০ সালে তাঁদের মধ্যে সম্পাদিত এক অঙ্গীকারনামার কারণে হাজী সাহেবও একক ভাবে এই অধিকার রাখেন না। মূলতঃ পাকিস্তানের হযরতগণ বিভিন্ন সময়ে নিজামুদ্দিনকে পাশ কাটিয়ে স্বাধীন ভাবে কিছু নতুন রীতি চালু করতেন, এটা বন্ধ করাই এই অঙ্গীকারনামার উদ্দেশ্য ছিল।)

হাজী সাহেব বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে অনেকটাই মাসুম শিশুর মত হয়ে গেছেন, অন্যের দয়ার উপর নির্ভর করতে হয় এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে তিনি মজুর। মাওলানা সাদ সাহেব নিজামুদ্দিনের জন্য শূরা বানিয়ে নিয়েছেন, যারা দৈনিক মিলিত হয়ে মেহনত সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিবেন।

এই দুইজন বাদে না কেউ কোন শূরা বানাতে পারে আর না মারকাজ বানাতে পারে। [ কিন্তু আফসোস! হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহির নামে মরাকান্নাকারী এই খবিসা আলমী শূরা গং হজরতজীর বানানো মাসোয়ারার জামাত তথা শূরাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজেরা নিজেরা শূরা হয়। পরবর্তীতে মাজুর হাজী সাহেবের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে দিয়ে একটি কাগজ সাইন করায়। এবং হাজী সাহেবের নামে ব্ল্যাকমেইল করে মাওলানা সাদ সাহেবকে কথিত শূরা কবুল করতে চাপ দেয়। এতেও ব্যর্থ হয়ে সারা দুনিয়াতে ফিৎনার সয়লাব বইয়ে দেয়।]

হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি ১০ জনের জামাত বানান তখন এই ইব্রাহীম সাহেব বা আহমাদ লাট সাহেব বা ফারুক ভাই এঁদের কাউকেই অন্তর্ভুক্ত করেন নি। হাফিজহুমুল্লাহ। এটা ছিল আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে। এসব বিদ্রোহীদের ঐ জামাত বা শূরাতে অন্তর্ভুক্ত করলে এঁরা কেয়ামত ঘটিয়ে ফেলত।

হজরতজী এবং মিয়াজী মেহরাব সাহেব, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁদের দূরদৃষ্টি এবং অন্তর্দৃষ্টি দান করেছিলেন। রহিমাহুমুল্লাহ। তাঁরা জানতেন এই উপদ্রব সৃষ্টিকারী লোকগুলো এমন একটা মহান দায়িত্ব পালনের উপযোগী নন। (মুমিনদের অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় কর, কেননা তাঁরা আল্লহর নূর দ্বারা দেখেন।) অবশেষে এই লোকগুলো প্রমান করলেন যে, আজকের বাস্তবতা সেদিনই হজরতজী এবং মিয়াজীর সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। রহিমাহুমুল্লাহ।

এটা সম্ভব নয় যে, হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইচ্ছাকৃতভাবে মাওলানা ইব্রাহীম দেউলা এবং মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবকে উপেক্ষা করেছেন। হাফিজহুমুল্লাহ। বরং আমাদের সম্মানিত মুরুব্বীগণ যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে প্রতিনিয়ত ইস্তেখারার এহতেমাম করতেন।

মিয়াজী মেহরাব সাহেব, যিনি ঐ মাসোয়ারার ফয়সাল ছিলেন, এই দুই হযরতের (মাওলানা ইব্রাহীম দেউলা ও মাওলানা আহমাদ লাট সাহেব) কারো নাম উচ্চারণ করেন নি। এমন কি মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেবও নন। রহিমাহুমুল্লাহ। সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হল, এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর একজনের নামও হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ১০ জনের জামাতের মধ্যে রাখেন নি। তা সত্ত্বেও এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা যাতে নিজামুদ্দিন বন্ধ হয়ে যায়, দাওয়াতের এই মোবারক মেহনত খতম হয়ে যায়, ইমারত অপসারণ হয় এবং মারকাজের একশ বছরের জোড় মিল মুহাব্বত ধ্বংস হয়ে যায়।

যেহেতু এই মারকাজের চার দেয়ালের অভ্যন্তরীণ আমলের সাথে তাঁদের কোন অংশগ্রহণ নেই, তাই তাঁরা কিছুই অর্জন করতে পারবে না তাঁদের উদাহরণ উর্দু সেই শেরের মত – বিয়ে বাড়িতে কতই না ফুর্তি, কিন্তু অপরিচিত আব্দুল্লাহ যে এখানে বড়ই একা।

সাথীদের সমীপে কয়েকটি জরুরী আরজ:

এই গোষ্ঠী যেহেতু নিজেরাই বিদ্রোহ করেছে, তাই এরা আর মারকাজের শূরা নন। এমনকি মারকাজ বা মাদ্রাসা কোন কিছুর সাথেই তাঁরা আর জড়িত নন। তাই যারা নিজেদের দাওয়াত ও তাবলীগের এই মহান মেহনতের সাথে জড়িত মনে করেন তাদের জন্য নিচের কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক:
১. নিজামুদ্দিনই আমাদের মারকাজ। আমাদের সমস্ত কাজ নিজামুদ্দিনের হেদায়েত অনুসারেই করতে হবে।
২. মাওলানা সাদ সাহেবই তাবলীগের কাজের সারা দুনিয়ার আমীর।
৩. কেবলমাত্র মাওলানা সাদ সাহেবের নির্দেশনা এবং মানসাই অনুসরণ করতে হবে।
৪. মারকাজের বর্তমান শূরাই প্রকৃত শূরা।
৫. বিশ্বের সকল মারকাজই নিজামুদ্দিন মারকাজের আজ্ঞাবহ। তাঁদের দায়িত্ব শুধু মাওলানা সাদ সাহেবের মাসোয়ারাকৃত নকশা বাস্তবায়নের মধ্যেই সীমিত। (ফাজায়েলের পাশাপাশি তাই মুন্তাখাব আহাদীসের তালীমও চালু রাখা।)
৬. আঞ্চলিক কোন স্বার্থ বা চাহিদা মারকাজ বা কেন্দ্রীয় অনুমোদনের উর্ধে নয়। এটাই মারকাজিয়াত বা কেন্দ্রের আনুগত্যের সংজ্ঞা। মারকাজ থেকে বাতানো আমল গুলোর মধ্যে কিছু করা কিছু বাদ দেয়া, এটা মারকাজ প্রত্যাখ্যান করা এবং আমীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শামিল।
৭. সমগ্র দুনিয়া অবশ্যই মুন্তাখাব হাদীসের তালীম করবে। এবং দিল মন পাক করে যে কোন উমুর হজরতজী মাওলানা সাদ সাহেবের সামনে পেশ করবে, এবং যে ফয়সালা নিজামুদ্দিনে হবে তাই স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৮. আমীরের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্য। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে আমার আমীরের আনুগত্য করবে সে আমার আনুগত্য করে। যে আমার আনুগত্য করে সে আল্লাহর আনুগত্য করে।

মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারত প্রত্যাখ্যান করা সুনিশ্চিত ফিৎনা, জুলুম এবং সিরতল মুস্তাকীম হতে বিচ্যুতি। ইমারত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অস্বীকার করা নিজেকে বঞ্চিত করার সামিল। খুবই সামান্য কিছু বাদে, সমগ্র দুনিয়া মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারত কবুল করে নিয়েছে।

এসব বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের বুঝানোর চেষ্টা হয়েছে কিন্তু তারা শূরা হবার নেশায় বিভোর হয়ে সকল যুক্তি ও দলীল প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই উম্মতকে এদের দূষিত দুরভিসন্ধি থেকে হেফাজতের জন্য এদের আখলাকের সাথে পাশ কাটিয়ে চলতে হবে।

কুরআন কারীমের আয়াত, “জান্নাতের ঘর শুধু তাদের জন্য যারা দুনিয়াতে কোন পদ চায় না। এবং তারা দুনিয়াবী কোন পদ বা নেতৃত্ব লাভের জন্য ফাসাদ করে না। মুত্তাকীদের পরিণাম সর্বোত্তম।” (সূরাহ কাসাস)

আমলের রূহ হল আন্তরিকতা তথা ইখলাস। ইখলাস বিহীন আমল জীবনবিহীন লাশের মত। এর কোন মূল্য আছে?

পরবর্তী পর্ব ইনশাআল্লাহ মাওলানা সাদ সাহেবই কেন আমীর?

Advertisements

Leave a Reply