একজন আত্মস্বীকৃত আওয়ামের মনোদর্পনে আম্বিয়া, ওয়ারিশে আম্বিয়া এবং একটি ফতোয়ার ইতিবৃত্ত।

লেখকঃঃ শামীম হামিদী।

একজন আত্মস্বীকৃত আওয়ামের মনোদর্পনে আম্বিয়া, ওয়ারিশে আম্বিয়া এবং একটি ফতোয়ার ইতিবৃত্ত।

………………………………………………
সারসংক্ষেপ

ছোটবেলায় এবং তাবলীগে লাগার আগে আলেম সম্পর্কে আমার ধারণা।
আলোমদের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের ধারণা।

আগে দিল দেয়া পরে দিল নেয়া। যেভাবে তাবলীগে লাগলাম।
আমার ব্যক্তি জীবনে আলেমদের ভূমিকা।

আম্বিয়াদের মূল সুন্নত কি ছিল?
ওয়ারিশে আম্বিয়াদের মূল দায়িত্ব।

শুধু বাত/কথা পৌঁছানো দাওয়াত নয়, বরং সশরীরে হাজির হয়ে দাওয়াত দেয়া।
ওয়াজ বা বয়ানের প্রভাব আসলে কতটুকু?

* মুফতি মুনসুরুল হক সাহেবের সাথে সম্পর্ক।
মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের প্রতিবেশী হওয়া এবং সম্পর্ক।
এক ফাহেসা মহিলার ইসলাম কবুল করা।

সাদ সাহেবের সাথে এক সোনালি স্মৃতি।
আমার ব্যক্তি জীবনে সাদ সাহেবের বয়ানের প্রভাব।

সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগের হাকিকত।
সাদ সাহেবের শৈশব।

যুগে যুগে ইলিয়াস খান্দানের সাথে শত্রুতা।
কাটপিস ব্যবহারে অসততা।

আব্দুল মালেক সাহেবের ফতোয়া পুঁজি করে দাঙ্গার উস্কানি।
এমন ফতোয়ায় উপকারের বদলে অপকার হওয়া।

*আব্দুল মালেক সাহেবের সমীপে কিছু আরজ।
………………………………………………….

আমি একজন আত্মস্বীকৃত আওয়াম। তাবলীগে লাগার পরে আলেমদের সাথে মেলামেশা বেড়ে যাওয়া, আরবী ভাষার প্ৰতি মুহাব্বত এবং বাহ্যিক সুরতের কারণে অনেকের কাছেই আমাকেও আলেম বলে ভ্রম হত। জিজ্ঞেস করত কোথা থেকে ফারেগ ইত্যাদি। তাই পরিষ্কার ভাষায় বলতে হত, নারে ভাই, আমি জাহেল। তখন আমার আলেম বন্ধুরা হেসে উঠতেন এবং বলতেন, ভাই, আপনি আলেম না হলেও আলেম থেকে কমও না। জাহেল বলেন কেনো, বলুন আওয়াম। তাই আমার আলেম বন্ধুদের পরামর্শক্রমে আমি একজন ‘আওয়াম’। আত্মস্বীকৃত ‘আওয়াম’ও বলতে পারেন।

মুসলমান হিসাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে আমার জীবন পরিষ্কার দুই ভাগে ভাগ করা যাবে।
– তাবলীগে লাগার আগে
– তাবলীগে লাগার পরে।

তাবলীগে লাগার আগে আসলে দ্বীন সম্পর্কে খুব বেশি ফিকির ছিল না। তাই আম্বিয়া এবং ওয়ারিশে আম্বিয়া সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা ছিল না। সীরতের বই বলতে পড়েছি গোলাম মোস্তফার ‘বিশ্বনবী’। এটা কতটুকু সীরতের বই তা আলেমরা ভালো বলতে পারবেন।

ছোটবেলা থেকে উলামাকেরামদের সুহাবত পাইনি। এর মূল কারণ আমরা আলেম চিনতাম না। আমরা চিনতাম ‘হুযুর’। সাধারণত মসজিদ মাদ্রাসার সাথে জড়িত ব্যক্তিদেরই বিনা বাছ বিচারে ‘হুযুর’ বলা হত। তবে ছোটবেলা তো এতকিছু বুঝতাম না। আমার মা যাদের ‘হুযুর’ বলতেন আমিও তাদের ‘হুযুর’ জানতাম।

আমার জন্মস্থানে ছিল দুই পীর। সেখানকার উলামকেরাম মোটামুটি ৯০% ই এই দুই পীরের মুরিদান ছিলেন। তাই আলেম সমাজ ছিল গভীর ভাবে বিভক্ত। আলেমদের এস্তেমায়ী এবং ইনফারাদি মজলিসে বসলে দুটি জিনিস খুব পেতাম। নিজ পীরের গুণগান ওপর পীরের বদনাম। তাঁরা খুব তৃপ্তি নিয়ে দ্বীনী খেদমত মনে করে এই কাজটি করতেন। এবং মনে করতেন আওয়ামরা খুব সবক হাসিল করছে। কিন্তু আওয়ামগণ তাঁদের সামনে চুপচাপ শুনলেও পিছনে এসে বিরক্তি প্রকাশ করতেন। তাঁদের মজলিসে ৭০% আলোচনার টপিকসই এই ছিল। তাই একান্ত বাধ্য না হলে কেউ আলেমদের মজলিসে বসতে চাইত না। যেমন জুমার আগে। তাও কিছু বয়স্ক মুসুল্লি। বাকিরা যথাসম্ভব দেরি করে যেতে পছন্দ করতেন।

তাই আওয়ামদের সাথে আলেমদের সম্পর্ক ছিল মূলতঃ মিলাদ মাহফিল, কুলখানি এবং চেহলাম নির্ভর। এর বাইরে কিছু বিশেষ দিন যেমন শবে মেরাজ, শবে বরাত, শবে কদর ইত্যাদি উপলক্ষে কিছু উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যেত। তাই খুবই সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে এটাই ছিল আলেম এবং আওয়ামদের সম্পর্ক।

আওয়ামগণ যেহেতু এর চেয়ে ভালো দৃষ্টিতে আলেমদের দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন না, তাই তারা নিজেদের সন্তানদেরও মাদ্রাসায় পড়ানোর কথা কল্পনা করতে পারতেন না। কেননা তাদের দৃষ্টিতে আলেমদের কোন ভবিষ্যৎ নেই। হয়ত মক্তবে কিছু পড়াতেন কুরআন তেলাওয়াত করতে শেখা এবং কিছু প্রাথমিক দ্বীনী শিক্ষা লাভের জন্য। এর বেশি কিছু নয়। অন্ততঃ আমাদের সময়ের আমাদের এলাকার চিত্র এমনই ছিল।

সে সময় মাদ্রাসার ছাত্র বলতে যারা ছিল, কিছু ছিল হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে পেলে, কিছু ইয়াতীম, কিছু বিকলাঙ্গ, কিছু মাত্রাতিরিক্ত দুষ্ট এবং কিছু হাবাগোবা ছেলে পেলে। মাদ্রাসাগুলো সবচেয়ে ভালো যাদের পেত তারাও ছিল হয় কোন আলেমের সন্তান অথবা বর্ণিত দুই পীরের ভক্ত। তাও সাধারণ ভক্ত নয় বরং একটু বেশিই ভক্ত। বাকিরা স্কুলেই দিত। আমাদের সময় অবশ্য স্কুলের পরিবেশ একে বারে খারাপ ছিল না। আর যারা মাদ্রাসায় দিত তারাও দ্বীন দুনিয়া উভয় তবারক হাসিল করার নিয়তে আলীয়া মাদ্রাসায় দিত। আমাদের সময় আমাদের এলাকায় কওমী মাদ্রাসা খুবই কম ছিল। ৯৫% আলেম ছিলেন আলীয়া মাদ্রাসার। কাউকে ছোট করা উদ্দেশ্য নয়, আসলে আলেম এবং আওয়ামদের মধ্যে এক একটা বিরাট গ্যাপ ছিল এটা বুঝানোই উদ্দেশ্য। এখন তাবলীগের মেহনতের বরকতে অবস্থা অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। বেশ কিছু কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।

আমি নিজেও আওয়াম ও আলেমদের এই গ্যাপের শিকার। আমার আব্বা খুব অল্প বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর কোন স্মৃতি আমার কাছে নেই। কিন্তু তিনি অসিয়ত করে গিয়েছিলেন আমাকে মাদ্রাসায় পড়ানোর জন্য। কিন্তু আমার চাচাদের আপত্তির কারণে সেই অসিয়ত পালন করা সম্ভব হয়নি। একদিকে ভালোই হয়েছে, নয়ত আলীয়া মাদ্রাসায় পড়তে হত।

তাই আমিও সামাজিক ভাবে উলামাকেরামদের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা নিয়েই বড় হয়েছি। আমার চোখে সবচেয়ে বড় আলেম ছিলেন আমাদের মসজিদের খাদেম ক্বারী আব্দুল মান্নান সাহেব। রহিমাহুমুল্লাহ। তিনি আমার মক্তবের উস্তাদ ছিলেন। আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন। আমাদের বাড়িওয়ালা চাচা, আব্দুল হাকিম মাস্টার মসজিদ ও স্কুলের জন্য জমি ওয়াকফ করে দেন। রহিমাহুমুল্লাহ। অনেকখানি জমি ছিল। আমার ধারণা পাঁচ বিঘার উপরে হবে। তাঁর মোট জমি ২০ বিঘার মত। ওটা ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্র। অনেক দামি জমি। এই দামি জমি তিনি মসজিদ ও স্কুলের জন্য দান করেছেন। কিন্তু মাদ্রাসা করেন নি। বুঝতেই পারছেন ঐ সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মাদ্রাসার ব্যাপারে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব কাজ করত। তাঁর মোট পনেরটা বাসা ছিল যা তিনি ভাড়া দিতেন। এর মধ্যে একটি বাসা তিনি ইমাম সাহেবের কোয়ার্টারের জন্য ছেড়ে দেন। ইমাম সাহেবের ছোট ছেলে হাফিজুল্লাহ ছিল আমার একই বয়সী এবং খেলার সাথী। মসজিদ এত কাছে ছিল যে ইকামত শুনে রওয়ানা দিতাম এবং তাকবীরে উলা পেতাম। এর কাছাকাছি নিকটবর্তী যে মসজিদ ছিল তাও বর্তমানে ১৫ টাকা রিকশা ভাড়া লাগে।

হাফিজুল্লাহ আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করত যে তার বাবা বড় আলেম। সেই তুলনায় ক্বারী সাহেব কিছুই না। এতে আমি খুব কষ্ট পেতাম। এবং মনে করতাম… এটাই নিয়ম… এক হুযূর আরেক হুযুরকে হিংসা করে। এভাবে একটা নেগেটিভ ধারণা নিয়ে বড় হয়েছি। আর এই ছিল আমার আলেম সম্পর্কে ধারণা। তখনও হাটহাজারী দেওবন্দ এই শব্দগুলো ভালো ভাবে বুঝতে শিখিনি।

সম্পূর্ণ স্কুল জীবন এভাবেই কেটেছে। কলেজ এবং ভার্সিটিতে এসেও এর পরিবর্তন হয় নি। কেননা মসজিদের ইমাম মুয়াজ্জিনের ইগোর দ্বন্দ্ব, রমজান মাসে দুই হাফেজ সাহেবদের পারস্পরিক রেষারেষি। বরাবর এগুলোই দেখে এসেছি। ভার্সিটিতে হলের ইমামকে দেখতাম সুযোগ পেলেই যার তার সাথে আক্ষেপ করতেন, কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম সাহেবের বেতন দ্বিগুন, সুবিধা দ্বিগুন, বাসা বড়। অথচ তার সাথে খতীব সাহেবের তেমন নাকি পার্থক্য নেই।

এক কথায় জীবনের একটা লম্বা সময় আলেমদের ব্যাপারে এই ধারণা নিয়েই পার করেছি যে ,
১. আলেম মানে ‘হুযুর’। যত দাঁড়ি টুপি ওয়ালা সব ‘হুযুর’। এদের মধ্যে কোন ক্যাটাগরি নেই। অর্থাৎ ইমাম মুয়াজ্জিন মুফতি মুহাদ্দিস সব সমান। সবই ‘হুযুর’।
২. হুযুর মানেই পারস্পরিক রেষারেষি।
৩. হুযুর মানেই দুআ মিলাদ কুলখানি চেহলাম।
৪. হুযুর মানেই দান সদকার ওয়াজ করেন।

আমার ধারণা দেশের অন্ততঃ ৭০% মানুষের আলেম সম্পর্কে ধারণা এরচেয়ে উন্নত নয়। মুফতি, শাইখুল হাদিস, দেওবন্দ এসব শব্দের সাথে এখনো তারা ভালো ভাবে পরিচিত নন। এর সাথে ২০০৫ সালের পরে কথিত ‘শায়েখ’ আব্দুর রহমানের বরকতে উপসর্গ হিসাবে যোগ হয়েছে ‘হুযুর’ মানেই ‘জঙ্গী’ হবার সমূহ সম্ভাবনা। ইদানীং তাই হুজুরদের বয়ানের একটা বড় সময় ব্যয় হয় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে। 😢

আমার ধারণা পরিবর্তন হতে শুরু করে মূলত তাবলীগে লাগার পর থেকে। অনেক সীরতের কিতাব পড়া হয়, অনেক আলেমদের সাথে সম্পর্ক করার সুযোগ হয়। আলহামদুলিল্লাহ।

ওলামকেরাম আম্বিয়াদের ওয়ারিশ। আলাইহুমুস সালাম। অর্থাৎ আম্বিয়াগণ যা রেখে গেছেন হুবহু তাই ধারণ করেন। যেমন পিতার ওয়ারিশ, পিতা যে সম্পদ রেখে যান তাই এরা ধারণ করে।

আম্বিয়াদের দুনিয়ার সম্পদ সদকার সমতুল্য। কেননা আম্বিয়াদের জিন্দেগী অনেক বড় সম্পদ। তাই আম্বিয়াদের উত্তরাধিকার যেমন দুনিয়াবী সম্পদ নয়, তেমনি শুধুমাত্র এলেমও নয়। বরং আম্বিয়াগণের সম্পূর্ণ জিন্দেগীই উত্তরাধিকার।

তাই এলেম হাসিল হয়েছে তাই উত্তরাধিকার সম্পদ হাসিল করে ফেলেছি, ব্যাপারটা নয়। বরং এলেম হাসিলের দ্বারা তাঁরা আম্বিয়াগণের উত্তরাধিকারী হয়ে গেছেন। এখন আম্বিয়াগণের পুরো উত্তরাধিকার তাঁদের উপরেই বর্তাবে। অর্থাৎ এখন আলেমগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পূর্ণ জিন্দেগী তাঁদের বহন করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিন্দেগী এই ছোট্ট পোস্টে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। সর্বশেষ সীরতের যে কিতাব পড়েছিলাম, আল্লামা ইদ্রিস কান্ধালভীর ‘সীরতে মুস্তাফা’ তাও তিন জিলদে ১৭০০ পৃষ্ঠার উপরে ছিল। তবে কেউ এক কথায় শুনতে চাইলে তো এটাই মাথায় আসে উম্মতের দরদ, উম্মতের ফিকির। প্রতিটি উম্মতের জন্য সমান দরদ ছিল। একজন উম্মতও যেন জাহান্নামে না যায়। সম্পূর্ণ উম্মতকে এক দৃষ্টিতে দেখা। তা সে কাফেরই হোক আর মুমিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি উম্মতের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর জন্য কি না করেছেন। নিজের কোন চিন্তাই করেন নি। সকল ধরণের শারীরিক মানসিক কষ্ট সয়েছেন। নিজের আরাম কুরবানী দিয়েছেন।

আল্লহ মাফ করেন আজ তো আমরা মনে করি বাণী পৌঁছে দিয়েছি, ব্যস! আমার দায়িত্ব শেষ। তাই যার কাছে ফতোয়া আছে তিনি ফতোয়া দিয়েই নিশ্চিত হয়ে যান, আর যার ফেসবুক আছে তিনি ফেসবুকে পোষ্ট দিয়েই মহান জিম্মাদারী আদায়ের পরম তৃপ্তি অনুভব করেন। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জিন্দেগী পেশ করে দেখিয়েছেন, দেখ আল্লাহর হুকুম কঠিন নয়। সহজ। এতেই সুখ শান্তি ইজ্জত কামিয়াবী। শুধু বাণী পৌছিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন নি। শুধু বাণী পৌঁছনো মাকসাদ হলে নবী পাঠানোর দরকার ছিল না। আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ফেরেশতা পাঠিয়েই কাজ সারতে পারতেন।

নবীরাও অনেক ধৈর্য্য, সবর এবং আখলাকের সাথে একেকজন উম্মতের কাছে নিজে হাজির হয়ে দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন। এককোন উম্মতকেও অবজ্ঞা করেন নি, উপেক্ষা করেন নি। এজন্য তাঁদের অনেক শারীরিক কষ্ট, লাঞ্ছনা, গালি, থুতু, অপমান এবং মানসিক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু কোন দিন নিরাশ হননি। দিনের পর দিন সব কিছু উপেক্ষা করে দাওয়াত দিয়ে গেছেন। এক আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রায় দুই দশকের অপেক্ষার ফসল।

কেননা নবীরা ছিলেন এই উম্মতের খায়ের খা, তথা মঙ্গলকামী। কোন কষ্টে বেজার হননি, গালি দেননি, লানত দেননি। কখনো আখলাক খারাপ করেন নি। কঠোর হননি। কারো প্রতি তাচ্ছিল্য করেন নি।

এক কথায় আম্বিয়াগণ আমাদের চোখে অপরিসীম সবর ও আখলাকের প্রতীক যাঁরা সকল কষ্ট বরদাস্ত করে নিজে উম্মতের কাছে দ্বারে দ্বারে গেছেন। কখনো হাল ছাড়েন নি।

আমাদের চোখে আম্বিয়াদের ওয়ারিশ এমনই। এর কম কখনো কল্পনা করিনি।

আলহামদুলিল্লাহ ভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারে আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দাওয়াতের মোবারক কাজের সাথে লাগিয়ে দেন। তখন আলেমদের সাথে মিশতে শিখি। জীবনে প্রথম বারের মত পাঞ্জাবি পড়ি এবং মাদ্রাসার আঙিনায় হাঁটি। এসময় অনেক আলেমদের সুহাবত পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। এর মধ্যে একজন ছিলেন মুফতী মুনসুরুল হক সাহেব হাফিজহুমুল্লাহ। তিনি মোটামুটি তাবলীগী ঘরানায় কথা বলতেন। কিন্তু মাঝে মাঝে হালকা বাঁশ দিতেন তাও বুঝতাম। তবুও তাঁর কথা ভালো লাগতো। এর একটা কারণ ছিল প্রথম প্রথম যখন তাবলীগে লাগি তখন শিবির এবং কথিত আহলে হাদিসের বন্ধুদের নেক নজরে পড়ে যাই। অথচ এর আগে এরা আমাকে চিনতই না। মুফতি মুনসুরুল হক সাহেবের থেকে এদের ব্যাপারে অনেক সবক হাসিল করেছি। তাই আমি তাঁর কাছে ঋণী। মোটামুটি প্রতি শুক্রবারই আমতলায় তাঁর মজলিসে যেতাম।

কিন্তু তাঁর ব্যাপারেও মোহভঙ্গ হয় যখন তিনি আল্লামা আজিজুল হক সাহেবের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। আমার পুরানো দুশ্চিন্তা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে… “হুযুর মানেই পারস্পরিক রেষারেষি।” এরপর আর তাঁর মজলিসে যাওয়া হয়নি।

এরপর আমি নিজেই প্রচুর পড়াশোনা শুরু করি। বিভিন্ন ধরনের কিতাব পড়েছি। বিশেষ করে আমাদের তাবলীগের নেসাবের কিতাব গুলো। বিভিন্ন সীরতের কিতাব, কিছু তাফসীর, কিছু হাদিসের সঙ্কলন এবং কিছু মাসআলার কিতাব। ঐ সময়ে বই পড়ার একটা নেশা হয়ে গিয়েছিল। যার রুমে যে কিতাব পেতাম তাই পড়তাম। তবে এর আগেই মুফতী মুনসুরুল হক সাহেবের কল্যাণে কথিত আহলে হাদীস ফিৎনা সম্পর্কে জানা ছিল। এ সময় অনেক কিছু জানা হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। কোন মাসয়ালা দেখা দিলে তাবলীগের মাধ্যমে পরিচিত আলেমদের মুখাপেক্ষী হতাম।

এরই মাঝে এক সময় পরিচয় হল মাওলানা আবদুল মালেক সাহেবের সাথে। পেয়ে এতোই খুশি হয়েছিলাম যে মনে হয়েছিল এমন একজনকেই খুঁজছি। সে সময় আমরা আহলে হাদিস নামধারীদের বিরুদ্ধে ফাইট করতে করতে গলদঘর্ম। আমরা ভার্সিটিতে নতুন কোন ছেলের উপরে মেহনত করতে না করতেই ওরাও তার উপরে হামলে পড়ত। যে ছেলেটা নামাজ আদায় করে না, তাদের নিয়ে ওদের মাথাব্যথা নেই। কিন্তু আমরা মেহনত করে একজনকে তিনদিনে নিয়েছি, ব্যাস, ওরা হামলে পড়ত। তখন পর্যন্ত মুফতী মুনসুরুল হক সাহেবের বরকতে আহলে হাদিসদের প্রায় কাফের জানতাম।

আব্দুল মালেক সাহেবকে মূলত দুই কারণে পছন্দ করতাম। তাঁর দলীল ভিত্তিক কথা এবং গবেষণাধর্মী কর্মের কারণে এবং তাঁর মধ্যমপন্থার কারণে। বিশেষ করে কথিত আহলে হাদীসদের বিরুদ্ধে তিনি বেশ কমনীয় ছিলেন। ‘উম্মতের ঐক্য: পথ ও পন্থা’ শীর্ষক তাঁর সেমিনারটা ছিল ঐতিহাসিক। পরবর্তীতে ঐ সেমিনারের মূল প্রবন্ধ মলাটবদ্ধ ভাবেও প্রকাশ হয়েছে। প্রবন্ধটি পাঠ করে তাঁকে একজন সত্যিকারের উম্মত দরদী ওয়ারিশে আম্বিয়া মনে হয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ পরবর্তীতে তাঁর প্রতিবেশী হবার সুযোগও হয়েছিল। তাঁর মারকাজুদ দাওয়াহতে প্রতি মাসের প্রথম বুধবার প্রোগ্রাম হত। এছাড়া সেখানে অন্যান্য উস্তাদ বিশেষ করে মাওলানা ইয়াহিয়া সাহেবের সাথে বেশ আন্তরিক সম্পর্ক এবং আসা যাওয়া কায়েম হয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ। এ সময় হজরতকে খুব কাছ থেকে অবলোকন করার সুযোগ হয়। সত্যিকারের শায়েখ মনে হয়েছিল।

কিন্তু সম্প্রতি তাঁর একটি বক্তব্যে রীতিমতো তাজ্জব হয়েছি। তাঁর চিরাচরিত মধ্যমপন্থা এবং গবেষণার কোন ছাপ খুঁজে পাইনি। মাওলানা সাদ সাহেবের ব্যাপারে বেশ কঠিন কিছু কথা বলেছেন যা দেওবন্দও বলেন নি। বরং দেওবন্দের আকাবিরদের সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁরা চমকে উঠেছেন এবং অস্বীকার করেছেন। মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব আরো কিছু কথা বলেছেন যা অভিজ্ঞতার খেলাপ। যেমন তিনি নিজামুদ্দিনের পূর্ববর্তী আকাবিরদের সাথে বর্তমান তরতীবের পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন। আমি তাঁকে এত দিন ধরে এত কাছ থেকে দেখেছি যা অনেকেই দেখেন নি। আমার জানা মতে তিনি কখনোই তাবলীগে সময় দেননি। একঘন্টার জন্যও নয়। তাই বর্তমান তরতীব কি? আগের তরতীব কি ছিল? এবং কি কি পার্থক্য হয়েছে? এ গুলো তাঁর জানার কথা নয়। আরো উল্লেখ্য তিনি তাঁর বক্তব্যের কোন ব্যাখ্যা এবং সূত্র কিছুই উল্লেখ করেন নি। তাই প্রচুর প্রশ্ন রয়ে গেছে।

এভাবে ফতোয়া স্টাইলে বক্তব্যের মাকসাদও বুঝতে পরলাম না। এর দ্বারা উম্মতের কি ফায়দা হবে? বা তিনিই কি মেসেজ পৌঁছাতে চান? বর্তমানে একটা অস্থিরতা চলছে। বিভিন্ন ইস্যুতে উম্মত দুইভাগ হয়ে গেছে। উম্মতের ঐক্য ধরে রাখা যে কোন মূল্যে জরুরি। এই দায়িত্ব প্রধানত আম্বিয়াগণের ওয়ারিশদের। এখানে অবহেলার সুযোগ নেই। শুধুমাত্র ফতোয়া দিয়ে দায়িত্ব শেষ এমন মনতৃপ্তির অবকাশ নেই। ফিৎনা ফ্যাসাদের জামানায় উম্মতের ঐক্য ধরে রাখাই মূল চ্যালেঞ্জ। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর খিলাফতের জামানায় বিবাদমান দুই পক্ষের সাহাবা কেরামদের দিনের বেলা পরস্পর লড়াই করলেও রাতের বেলায় ঐক্যের চেষ্টা করেছেন। সে জামানায় সাহাবাহ কেরামগণই ছিলেন উলামা তথা ওয়ারিশে আম্বিয়া। আজ এই দায়িত্ব উলামাদেরই নিতে হবে। তাঁদের থেকে আওয়াম হিসাবে বিভেদ বা গালাগালি কামনা করি না, বরং হামদরদীর সাথে এই ফিৎনা থেকে মুক্তি চাই।

আমি ছোট মানুষ, বড় আকারে আমি দেখতে পারবো না। আমি যদি আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বর্ণনা করি…
আগেই বলেছি, আমি উলামা কেরাম চিনতাম না। আলেম শব্দটির সাথেও আমার পরিচয় ছিল না। আমরা জানতাম ‘হুযুর’। মুফতি মুহাদ্দিস দেওবন্দ এসব শব্দ আমাদের ডিকশনারিতে ছিল না। ‘হুযুর’ হতে আলাদা কোন মেহনত করা লাগে বলেও জানতাম না। জানতাম টুপি পড়লেই হুযুর হওয়া যায়। ছোট বেলা যখন টুপি পড়ে মক্তবে যেতাম তখনই অনেকে ‘হুযুর’ ডাকত। টুপি পড়ে কেউ মিথ্যা কথা বললে আমরা তাঁকে বলতাম আপনি হুযুর হয়ে মিথ্যা কথা বলেন? তবে এতটুকু বুঝতাম হুযুর মানে শ্ৰদ্ধার বস্তু। আজ এই ফতোয়ার প্রেক্ষিতে কেউ কেউ মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসুদ সাহেবকে চামচিকা বলছে। এর দ্বারা আমরা আওয়ামরা কি শিক্ষা পাবো? ‘হুযুর’রা একটু মতে অমিল হলেই একজন আরেক জনকে জনসম্মুখে উলঙ্গ করতেও ছাড়েন না। মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবকে বলা হচ্ছে আদিগন্ত বিস্তৃত সূর্য। কিন্তু এই সূর্য আমরা এতদিন দেখিনি।

কে দেখিয়েছে জানেন? এই মেহনত। তাবলীগের মেহনত। আরো বিশেষ করে বলতে গেলে এই মেহনতের সাথে জড়িত সাথীগণ। এদের মধ্যে মাওলানা সাদ সাহেব বিশেষ একজন। মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের ভাষ্যমতে তিনি আহলে সুন্নতওয়াল জামাতের থেকে খারিজ হয়ে গিয়েছেন।

আমার বাবা খুবই অল্প বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। আমার বয়স পাঁচও হয়নি তখন। তাঁর অসিয়তমত আলেম বানাতে পারেন নি, তাই আমার মা সবসময় শর্মিন্দা থাকতেন। ভীত থাকতেন, অমঙ্গলের আশঙ্কা করতেন। তাই সব সময় ‘হুযুর’দের সম্মান করেছি। তাঁদের সাথে মিশেছি। তাঁদের অনেকের সামনেই আমার জীবন নষ্ট হয়েছে। কাফের মুশরিকদের তরীকায় বড় হয়েছি, পোশাক আশাক পড়েছি, স্কুলে গিয়েছি। কিন্তু ‘হুযুর’রা কেউ আমাকে কখনো দাওয়াত দেননি। আল্লাহর কথা বলেন নি। শুধু দাওয়াত দেয়ার জন্য কেউ কখনো আমার কাছে আসেন নি। কেউ বলেন নি যে বেটা ভুলের উপরে আছ। কেউ আমাকে আল্লহর পরিচয় দেননি। তাঁরা আম্বিয়াদের ওয়ারিশ।

কোন আম্বিয়া কি পারতেন আমাকে উপেক্ষা করতে? আমি কি এই উম্মতের কেউ না? হ্যাঁ অনেকেই আমার কাছে এসেছেন বিভিন্ন তাকাজা নিয়ে। মূলত সবই অর্থনৈতিক তাকাজা। কোন মাদ্রাসার সমস্যা, বা কোন ছাত্রের বা উস্তাদের সমস্যা ইত্যাদি। এর বাইরে কখনো কখনো মোবাইল বা কম্পিউটার ঠিক করার তাকাজায় এসেছেন। কিন্তু আখেরাতের তাকাজা নিয়ে, শুধু আল্লাহর বড়ত্বের দাওয়াত নিয়ে কোন ‘হুযুর’ কখনো আসেন নি। দুনিয়াবী জরুরতে আসা যায় আখেরাতের তাকাজায় কখনো আসা যায় না? হ্যাঁ এসেছিল, কারা? আওয়ামরা। এ গল্প হয়ত পরের দিকে আসবে ইনশাআল্লাহ।

দাওয়াতের কাজে লাগার পরই আমি আলেম সমাজ সম্পর্কে জানতে পারি। দেওবন্দের ইতিহাস গুরুত্ব অবদান তখনই আমাদের সামনে আসে।

কোন লেখা আসছে না। সমন্বয় করতে পারছি না। অনেক কিছু বলতে চাই কিন্তু লিখতে ইচ্ছা করছে না। কি লিখবো? কে পড়বে? কে বুঝবে? আব্দুল মালেক সাহেব সম্পর্কে এক আকাশ সম বিশাল ধারণা পোষণ করতাম। ভেবে ছিলাম ওয়ারিশে আম্বিয়া বলতে আমি যা বুঝি তার একটা নমুনা বাংলাদেশে পেয়ে গিয়েছি। তাঁর এহেন মধ্যমপন্থা বিরোধী এবং তাহকীক বিরোধী ফতোয়ায় এতটাই আঘাত পেয়েছি যে মাথা কাজ করছে না। দুটো গল্প বলে শেষ করি। হয়ত আমার আবেগ কিছুটা হলেও প্রকাশিত হবে এই দুই গল্পে।

আমাদের ছাত্র জীবনে ইজতেমাতে আলাদাভাবে ছাত্রদের বয়ান হত। ইজতেমার পরেও হযরতগণ কিছুদিন থাকতেন। সময় সুযোগ করে আরো দুই একটা প্রোগ্রাম হত। এমনই একটা প্রোগ্রাম হচ্ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। প্রফেসর আব্দুল আলীম সাহেব দামাত বারকাতুহুম বয়ান করছিলেন। তিনি একটি ঘটনা বলেন।

এক মহিলা ফ্রান্সে এক ফাইভ স্টার হোটেলে কাজ করতেন। কাজটা তেমন সুবিধের নয়। রুম পরিচারিকা। কাগজে কলমে পরিচারিকা হলেও বাস্তবে আরো কিছু কাজ এদের থাকত। গেস্টকে খুশি রাখা, সব ধরনের আনন্দ দেয়া। এজন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করা। সারারাত মেহমানের সাথেই থাকা, যদি কোন দরকার পড়ে যেমন কিছু পান করানো, চা কফি বানিয়ে দেয়া, জুতা খুলে দেয়া, টাই খুলে দেয়া অথবা স্যুট পড়িয়ে দেয়া। ইত্যাদি। গেস্ট চাইলে আরো কিছু… এক কথায় ফাহেসা মহিলা।

এই জাতীয় হোটেলে যারা গেস্ট হন তাদের সাধারণত তাদের পরিভাষায় বৈধ সঙ্গিনী থাকে। তাই এজাতীয় ফাহেসা মহিলাদের কাছে সাধারণত স্বাভাবিক কোন যৌন আচরণ করার প্রয়োজন পড়ে না। বিকৃত আচরণ যেগুলো বৈধ সঙ্গিনীর সাথে করা যায় না সেগুলোই এদের সাথে করা হয়। তাই এই চাকুরী গুলো কোন আকর্ষণীয় চাকুরি নয়। বাধ্য না হলে কেউ এগুলো করে না।

একদিন এক মুসলিম নওজোয়ান ঐ মহিলার গেস্ট হলেন। তিনি ফ্রান্সে এক ইউনিভার্সিটিতে কোন সেমিনারে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন। তাঁকে ইউনিভার্সিটিই এই হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। যথারীতি মহিলা হাজির।

আপনি কে?
– আমি অমুক। আমি আপনাকে হোটেলের পক্ষ থেকে এই এই সেবা দিব।

দুঃখিত আমার দরকার নেই। আপনি চলে যান।
– স্যার, স্যার, দয়া করে এই কাজটি করবেন না। আপনি আমাকে ফেরত পাঠিয়ে দিলে হোটেল কর্তৃপক্ষ মনে করবে আমি আপনাকে খুশি করতে পারি নি তাই আপনি আমাকে বের করে দিয়েছেন। অথবা আমার আকর্ষণ শেষ হয়ে গেছে, তাই গেস্টরা আর আমাকে পছন্দ করে না। স্যার আপনি আমাকে বের করে দিলে আমার চাকুরী চলে যাবে। খুব অসুবিধায় পড়ে যাব। আমার দুটি সন্তান আছে। ওদের বাবা আমাকে ছেড়ে অন্য মেয়ের সাথে চলে গেছে। চাকুরী চলে গেলে আমার বাচ্চা দুটি মরে যাবে স্যার। প্লিজ…

সেই মুসলিম যুবক কিছুক্ষণ ভাবলেন। রুমটা বেশ বড়। রুমের টয়লেটও দেখলেন বেশ বড় এবং পরিপাটি। তিনি একটি চাদর নিয়ে টয়লেটে চলে গেলেন। ঐ মহিলাকে বললেন আপনার টয়লেট পেলে অন্য কোথাও যেয়েন। আর এই সময়ে আমার ফজরের নামাজ। এর আগেই আপনি রুম খালি করে দিবেন। অতঃপর তিনি সারারাত টয়লেটেই কাটান।

এরপর ঐ মহিলা মুসলমান হয়ে যান। তিনি একজন খাঁটি ফ্রেঞ্চ। শিল্প সাহিত্য ভাস্কর্য এসবের মাহাত্ম জেনেই বড় হয়েছেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ নিয়েই বড় হয়েছেন। কোনদিন কোন মুসলমানকে ভালো নজরে দেখেন নি। কেননা তিনি ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছেন ইসলাম ধর্ম শিল্প সংস্কৃতি বিরোধী একটি অসভ্য বর্বর ধর্ম। মুসলমানরা অসভ্য বর্বর। এরা সভ্যতার শত্রু। এদের কাছে শিল্প ভাস্কর্যের কোন মূল্য নেই। বরং এরা ভাস্কর্য ধ্বংস করে। সঙ্গীত ললিত কলা চিত্র শিল্প এদের ধর্মে ১০০% নিষিদ্ধ। মহিলারা ঘরের বাইরে এসে দেশ ও জাতি গঠনে ভূমিকা রাখুক এটা মুসলমানরা পছন্দ করে না। তিনি অনেক মুসলমানের সাথে কথা বলেও নাকি এর সত্যতা পেয়েছেন। অর্থাৎ ছোটবেলা থেকেই তিনি মুসলমানদের প্ৰতি তীব্র বিদ্বেষ এবং ঘৃণা নিয়েই বড় হন। তিনি এটাই জানতেন যে মুসলমানগণ অসভ্য বর্বর। শুধু তাই নয়। এরা সভ্যতার শত্রু। আধুনিক সমাজে বাস করেও এরা প্রাচীন যুগের মত জীবন যাপন করতে চায়। এবং সকলকে সেই প্রাচীন যুগের জীবন যাপনে বাধ্য করতে চায়।

অনেক মুসলমান নাকি তাকে ইসলামের মহত্ত্ব বুঝানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু এসব কথা তার কান দিয়েও কখনো ঢুকেনি। বরং ইসলাম সম্পর্কে পজিটিভ কিছু বললেও নাকি তিনি হাসতেন।

এমন কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী মহিলাই ইসলাম কবুল করলেন!
কোন ফতোয়ার জোরে?
একটি ছোট্ট ঘটনা।
যিনি ঘটিয়েছেন তিনিও এত কিছু চিন্তা করে ঘটাননি।
তিনি তো শুধু নিজেকে একটি সম্ভাব্য গুনাহ থেকে পরহেয করার জন্য চেষ্টা করেছেন।
তিনি ভাবতেও পারেন নি, তার এই ছোট্ট আমলটি একজনের হৃদয়ে যুগ যুগ ধরে জমে থাকা কুফরী ও বিদ্বেষ মুহূর্তের মধ্যে চুরমার করে দিবে।

মহিলা নিজেই বলেন যেই মুহূর্তে আমার গেস্ট বাথরুমে চলে গেলেন, তৎক্ষণাৎ আমার মনে হয়েছে এতকাল ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যত কিছু শুনেছি তা প্রতিটি মিথ্যা। একটি বর্ণও সত্য নয়। বরং ইসলামই মানব জাতিকে সভ্যতা এবং মানবতা শিখিয়েছে।

মহিলা এর পরের ঘটনাবলী শুনান যে, যখন তিনি যখন ইসলাম কবুলের কথা প্রকাশ করেন তখন তার পরিবার আত্মীয় স্বজন অনেকেই বিষ্ময় প্রকাশ করেন। কেননা তিনি সকলের মধ্যে অধিক ইসলাম বিদ্বেষী ছিলেন। তার পরিচিত অনেকেই তাকে আগের কথা গুলো বলে বুঝানোর চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন আগে এসব কথা আমি এত দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতাম যে, সারা দুনিয়ার সকল মুসলমানও যদি এসে আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করত, তাও আমি বুঝতাম না। কিন্তু এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমার অন্তরে ইসলাম এত মজবুত করে দেন যে, এখন সারা দুনিয়ার সকল মানুষও যদি এসে আমাকে ইসলামের বিরুদ্ধে বুঝায়, তাদের একটা কথাও আমার কান দিয়ে ঢুকবে না।

দাওয়াত শুধু কথা পৌঁছনোর নাম নয়। বরং দাওয়াত নিজের জিন্দেগীতে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জিন্দেগী পৌঁছনোর নাম। এজন্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নবী পাঠিয়েছেন। নবীরা কষ্ট করে নিজের জিন্দেগীতে বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে গিয়েছেন যে ইসলাম এমন। শুধু কথা পৌঁছনো দাওয়াতের মাকসাদ হলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ফেরেশতা বা কিতাব পাঠিয়েই দায়িত্ব সারতে পারতেন।

মাওলানা সাদ সাহেব একথাটিই বুঝাতে চেয়েছিলেন, শুধু কথা পৌঁছানোই দাওয়াত নয়। বরং দাওয়াতী জিন্দেগীই আসল। দাঈ দাওয়াত ওয়ালা সিফাত ও আমল নিয়ে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাজির হবেন এটাই আসল দাওয়াত। এটাই নবীদের দাওয়াতের প্ৰধান বৈশিষ্ট্য ছিল। এক নাম না জানা শায়েখ শুধু এক আমলের দ্বারা এক কট্টর ইসলাম বিদ্বেষীর কাছে দাওয়াত পৌঁছে দিলেন যা শত দাঈও পারত না।

কথা/ওয়াজ তো কতই হচ্ছে। প্রতি শুক্রবার জুমার আগে ওয়াজ হয়। কতটুকু ফায়দা হয় এটা গবেষণা সাপেক্ষ। কিন্তু অভিজ্ঞতা হচ্ছে এক বয়ানে যদি একজনও যদি নিজেদের জিন্দেগী পাল্টানোর নিয়ত করে নেন তাহলে ৫২ সপ্তাহে ৫২ জন। দশ বছরে ৫২০ জন। তাহলে মসজিদ ফজরের ওয়াক্ত লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবার কথা। কিন্তু কোন মহল্লাতে এমন দেখা যায় নি। আমার অভিজ্ঞতা আমি যতগুলো মহল্লা দেখেছি একজনও এতগুলো বয়ান শুনে জিন্দেগী পরিবর্তনের নিয়ত করেন নি।

ফতোয়া দিয়ে কি হাসিল হবে? কান দিয়ে ঢুকবে। মানুষের অন্তর বলতে কিছু নাই? আবেগ বলতে কিছু নেই? অন্তরে কে ঢুকাবে? কথা তো কানে নয়, অন্তরে পৌঁছাতে হয়। আজ আলেমদের সম্মানের দাবি করা হয়। সম্মান তো আগে অন্তরে বসাতে হবে। বহুবার শুনেছি আগে দিল দাও এরপর দিল নাও। বহুবার শুনেছি দাড়ি তো আগে অন্তরে গজাবে।

আমার দাওয়াতের কাজে লাগার জন্য তো কতবার দিল দিতে হয়েছে, এর খবর কে নিয়েছে। ছোট বেলা বাবা মারা যাওয়ায় মা আমাদের খুব আগলে আগলে রাখতেন। বাইরে খুব বেশি যেতে দিতেন না। কোথায় কোন গাড়ির তলে পড়ি না কোন বিপদ হয়। হাজারো আশঙ্কা। তাই আমার খেলার সাথী ছিল আমার বোনরা। বড়জোর পাড়ার উঠানেই অন্যান্য ছেলেদের সাথে খেলতাম। তাই ছোট বেলা থেকেই ছিলাম অন্তর্মুখী। ভার্সিটিতে তাই বিকাল বেলা হয় কম্পিউটারে গেম খেলতাম বা গান শুনতাম। তাবলীগের ভাইয়েরা আসতেন। বিশেষ করে ওমর ফারুক ভাইয়ের কথা খুব মনে পড়ে। আসতেন, গল্প করে চলে যেতেন। তেমন দ্বীনী আলোচনা হত না। কোন দাওয়াতও দিতেন না। আমিও খুশি হতাম বিকাল বেলা এমন একজন সঙ্গী পেয়ে। তিনি শুরুতে গানের গল্পই করতেন। পরে আস্তে আস্তে অন্য গল্প। তখন বুঝতাম না, এখন বুঝি এগুলো ছিল দিল দেয়ার টেকনিক। সন্ধ্যার দিকে আমাকে মসজিদে নিয়ে যেতেন। কখনো গল্প করতে ক্যান্টিনে। কখনো অন্য রুমে। অর্থাৎ গাশত করতে, জানতাম না, এটাকেই গাশত বলে। এভাবে যে কখন আমি তাদের সাথী হয়ে গেছি টের পাইনি।

টার্ম ফাইনালের পরে বললেন, ভাইয়া চল, তিনদিন আমাদের সাথে। এরপর বাড়ি যেও।
–– না ভাইয়া এখন যাবো না। পরে যাবো। অনেকদিন যাই না।
–আচ্ছা ঠিক আছে, এখন বাড়ি যাও। কিন্তু এরপর কিন্তু অবশ্যই যাবে। নাইলে বুঝব তুমি কোন কারণে আমার উপরে রাগ করেছ।

পরের বার অনেক চেষ্টা করেছি পিছলিয়ে যেতে। ভাইয়া বললেন, জাস্ট বারো ঘন্টার জন্য চল। যদি ভালো না লাগে চলে এসো। আমি নিজে তোমাকে পৌঁছে দেব।

এই চুক্তিতে গেলাম। কিন্তু একবার গেলে কি আসা যায়? ভাইয়েরা মশারি টানিয়ে দিচ্ছেন, গোসলের পানি এনে দিচ্ছেন, ফজরে উঠার পর বিছানা গুছিয়ে দিচ্ছেন।
এমন সম্মান জীবনে কখনো পাইনি। আমি কি এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলাম যে, আমাকে দ্বীনের উপরে উঠানোর জন্য ভাইয়েরা এমন প্রাণান্ত প্রচেষ্টা করলেন! কোন আলেম তো কখনো করেন নি। বন্ধু হাফিজুল্লাহর বাবা আমাদের ইমাম সাহেব মাঝে মাঝে বকা দিতেন, কিন্তু আদর করে কেউ কখনো বলেন নি। আজ ফতোয়া দিয়ে কি সেই সোনালী স্মৃতিগুলো ভুলিয়ে দেয়া যাবে?

আরেকটি ঘটনা। তখনো তাবলীগে পুরোপুরি জোড়া শুরু করি নি। সেই তিনদিন লাগিয়ে আসার পরের ঘটনা। দাড়ি রাখা শুরু করেছি। দাড়ি সম্পর্কে আমাদের এলাকাতে এক ধরনের কুসংস্কার চালু আছে। তা হল দাড়ি রাখবে হুযুর বা বয়স্করা। বয়স না হলে দাড়ি রাখা যায় না। দাড়ি রাখলেই আপনি সবার কাছে এই প্রশ্ন শুনবেন, এত অল্প বয়সে দাড়ি রেখেছ কেন?

আমার দাড়ি রাখা এবং তাবলীগে সময় দেয়া নিয়ে আমার বড় ভাইয়েরা কি ভয় পেয়েছিলেন, আল্লাহই ভালো বলতে পারবেন। হয়ত ভেবে ছিলেন, পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে শুধু তাবলীগে তাবলীগে ঘুরে বেড়াব। তারা এক সন্ধ্যায় এসে জোর করে দাড়ি কাটিয়ে দেন। রাতে রুমে ফিরতে খুব লজ্জা পাচ্ছিলাম।

আমার দৃষ্টিতে ওটাই ছিল আমার তাবলীগের জীবনে সবচেয়ে সঙ্কটময় মুহুর্ত। একটু উনিশ বি

Advertisements

One thought on “একজন আত্মস্বীকৃত আওয়ামের মনোদর্পনে আম্বিয়া, ওয়ারিশে আম্বিয়া এবং একটি ফতোয়ার ইতিবৃত্ত।

  1. Apnar lekha podhe valo laglo. kintu Amader kaaje toh Ulema r vul dhora na. Unader ke aaro Muhabbat er nojore dekha. Amader Hazratjee ki mukh nei, Tini keno chup achen. E kaaj e harar modhey jeet ache. Haji Ab Sahab jokhon Moulana Zakariya (RA) ke mulakhat er jonno. Bhagyo krome Nizamuddin e namaz er pore bayan cholchilo. Ek budo Manus(Hazratjee Ilyas RA) bayan korchen. “Bhai chor vi mera, sarbi vi mera, …” uni vablen e kon bakti jini sobai ke nijer bolchen.. e kotha asar kore gelo emon Nizamuddin theke gelen. tai bhai boli ei Alim ra ki amader noi…

    Huzaifa (India)

Leave a Reply