একটি সোনালী কণ্ঠস্বর, লাখো মানুষের হেদায়েতের জরিয়া।

একটি সোনালী কণ্ঠস্বর, লাখো মানুষের হেদায়েতের জরিয়া।

লেখকঃ শামীম হামিদী।
………………………………………………….
সারাংশ:
১. মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহ. এর দুআ, কিছু নস্টালজিয়া।
২. আপ কবুল কিয়া।
৩. তাঁর ইন্তেকালে মহা বিপর্যয়।
৪. অবৈধ ‘আলমী শূরা’র জন্ম। যার জন্মের ঠিকুজি আজও জানা যায়নি।
৫. কথিত ‘আলমী শূরা’র পক্ষ থেকে ধারাবাহিক ফিৎনা।
৬. আগের দুই হজরতজীর আমলের ফিৎনার খতিয়ান।
৭. তৃতীয় হজরতজীর আমলে কাজের বিস্তৃতি এবং তাঁর হেকমতের দ্বারা বিভিন্ন ফিৎনা মোকাবেলা করা।
৮. তৃতীয় হজরতজীর পরে একক আমীর মনোনয়ন করতে না পারায় কারণ।
৯. মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহ. এর একক হাতে সকল ফিৎনা সামলানো।
১০. মাওলানা সাদ সাহেব এবং যুবায়েরুল হাসান রহ. মধ্যে নজিরবিহীন সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক।
১১. তাঁর ইন্তেকালের আগে নিশ্চুপ, ইন্তেকালের পরে তাঁদের পারস্পরিক বিরোধের আষাঢ়ে গল্প।
১২. ফিৎনার ব্যাপারে আমাদের আশাবাদ।
………………………………………….……………

বলছিলাম মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির কথা। তাঁর কণ্ঠস্বর চিনেন না এমন দ্বীনদার মানুষ অন্তত বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ইজতেমার ময়দানে তাঁর স্টেজে আগমনের অপেক্ষায় এবং তাঁর কণ্ঠস্বর শুনার আগ্রহে লক্ষ লক্ষ মানুষ বসে থাকত ঘন্টার পর ঘন্টা। কি কনকনে ঠান্ডা শৈত্য প্রবাহ বা কি রোদের তাপ কোন পরোয়া নেই। অনেকে না খেয়ে, প্রসাব পায়খানার জরুরত চেপে রেখে অপেক্ষা করত। যদি মিস হয়ে যায় এই আশঙ্কায়।

তিনি দুআ শুরু করতে না করতেই লাখ লাখ মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়ত। কি আশ্চর্য কারামতি! প্রায় অর্ধকোটি মানুষ অবলীলায় নিজেদের দোষ স্বীকার করে নিত মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দরবারে। সেই জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে বনানী পর্যন্ত সব নীরব নিশ্চল হয়ে যেত। শুধু শুনা যেত হুঁ হুঁ কান্নার আওয়াজ। প্রথম দিকে তো মাইকই দেয়া হত, পরবর্তীতে বিভিন্ন এফ এম রেডিওর সৌজন্যে দূর দূরান্ত পর্যন্ত চলে যেত সেই কণ্ঠ। একবার মিম্বরের জামাতের খিদমতে ছিলাম। আমাদের টেন্ট ছিল ঠিক নদীর পাড়ে। সে এক আজীব দৃশ্য! সকাল থেকেই নদীতে শত শত নৌকা। কোথা থেকে এসেছে কে জানে। নৌকাতেও হাজার হাজার মানুষ। কি আহাজারী! একপর্যায়ে মনে হল নদীটাও বুঝি আমাদের সাথে কাঁদছে।

আহহহ… বন্ধুরা, সত্যিই খুব মিস করছি। এই কটি কথা লিখতে না লিখতেই আমার চোখ পানিতে ভরে গেল। আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁকে জান্নাতে আলা মাকাম দান করেন, তাঁর কবরকে নূর দ্বারা ভরপুর করে দেন। তিনি যখন শেষ করতেন, আয় আল্লহ, আপকি করম সে হামারী দুআকি কবুউউউল ফরমা, দিলটা প্রশান্তিতে ভরে যেত। এক অপূর্ব অনুভূতিতে আছন্ন থাকতাম অনেকক্ষন। মনে হত আমার সব দুআ কবুল হয়েছে। সব গুনাহ মাফ হয়েছে। ভাগ্যবান মনে হত। সারাটা দিনই একটা পবিত্র অনুভূতিতে কেটে যেত। সারাটা বছর এই দিনটার অপেক্ষায় থাকতাম।

তিনি দেখতে একটা ছোট খাট টিলার মত ছিলেন। কিন্তু মানুষটা ছিলেন হিমালয়ের চেয়েও বড়। তাঁর বুজুর্গী, তাকওয়া, আল্লহর প্রতি ধ্যান, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সবকিছুই ছিল হিমালয়ের চেয়েও বেশী। তিনি ছিলেন এই মহান কাজের সিপাহসালার। হিমালয়ের মতোই সকল ফিৎনা ফাসাদ একাই সামাল দিয়েছেন। সে আলোচনা না হয় একটু পরেই করছি।

কত মানুষ যে শুধুমাত্র তাঁর দুআর উসিলায় হেদায়েত পেয়েছে! কত মানুষ শুধু তাঁর বরকতে তাবলীগের মেহনতকে হক জানতে শিখেছে। নিজের চোখেই তো কত দেখলাম। না জানি আরো আছে। আমার পরিচিত অনেকেই আছেন শুধুমাত্র দুআয় শরীক হবার জন্য ময়দানে যেতেন। অনেকের কাছেই এই কণ্ঠস্বরটা অতি পরিচিত এবং অতি আপন হয়ে গিয়েছিল। তারা জানত না তাবলীগ কি। তারা এটাও জানত না যে এই ইজতেমা, তাবলীগের ইজতেমা। শুধুই দুআর জন্য আসত। এত মানুষের সাথে একত্রে দুআর করার সুযোগ। কবুল তো হবেই। কারো না কারো উসিলায় কবুল হবে। এমন একটা নেক ধারণা নিয়ে আসত। এক পর্যায়ে তাদের নেক ধারণার বরকতে তারা কবুল হয়ে গেছে এই মহান কাজের জন্য।

তাঁকে সব সময়ে বসা দেখেছি। কয়েকবার মাসওয়ারাতে। এছাড়া মিম্বরে ও হুইল চেয়ারে। শেষের দিকে মিম্বরে উঠতেন না। চেয়ারে বসেই আমল পুরা করতেন। যতবার দেখেছি এক অন্যরকম অনুভূতি। মনে হত গুরু গম্ভীর। আবার মনে হত হাস্যোজ্জ্বল। তাঁর ঠোঁট হাসতো না। কিন্তু মনে হত যেন পুরা চেহারাই হাসছে। তিনি ঘাড় ঘুরাতে পারতেন না। চোখ বাঁকিয়ে তাকাতেন। মনে হত যেন চোখ আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কেমন যেন আপন মনে হত। বন্ধুরা আমি জানিনা আপনাদের কারো সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিয়ারত লাভ হয়েছে কিনা। আমরা কিতাবে যেমন পড়েছি, তাঁর দিকে তাকালে মুহাব্বতও লাগতো আবার ভয়ও লাগতো। সাহাবাহ রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম তাঁকে একান্ত আপন মনে করতেন, আবার সমীহও করতেন। এমনই একটা ছাপ দেখেছি মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেবের মাঝে। রহিমাহুমুল্লাহ। সবকিছু মিলিয়ে যেন খুব আপন এবং দায়িত্বশীল অভিভাবক। চেহারায় যেমন গাম্ভীর্য ছিল তেমনি মাধুর্য্যও ছিল। গাম্ভীর্য ছিল ঠিকই কিন্তু গম্ভীর ছিলেন না। এই গাম্ভীর্য রাগী হেড মাস্টারের মত নয় বরং স্নেহশীল অভিভাবকের মত। নুরানী হাসিমুখ। যেন শান্ত সৌম্য চেহারাখানি সদা ধ্যান মগ্ন। অপরূপ নূরের ঝলকানি সদা চমক খেলে সেথায়। যে দেখেছে সে ভুলতে পারবে না। একবার নজর পড়েছে তো চোখ ফিরানো মুশকিল। তিনি খুব সামান্যই কথা বলতেন। যতক্ষন কথা বলতেন তাকিয়ে তাকিয়ে শুনতাম। কখনো ক্লান্তি আসেনি। খুব মধুর কণ্ঠে ছন্দে ছন্দে সামান্য কিছুক্ষণের বয়ান। সাদা সিধা কিছু কথা। হৃদয়ে গেঁথে যেত।

সাথে ছিল শনিবারের ‘আপ কবুল কিয়া?’ আমরা বন্ধুরা একে অপরকে এটা বলে বলে মজা করতাম। কত যুবকের স্বপ্ন ছিল যুবায়ের সাহেব তাকে বলবেন ‘আপ কবুল কিয়া’। ঐ কণ্ঠের ঐ বাক্য যে শুনেছে তার জীবন যেন ধন্য হয়ে গেছে। আজীবন গর্ব করার সম্পদ যেন পেয়ে গেছে। অনেক ভাইকে দেখি ১০-১২ বছর হয়ে গেছে এখনো গর্ব করে বলেন, আমার বিয়ে মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেব পড়িয়েছেন। রহিমাহুমুল্লাহ। হয়ত তাঁরা বুড়ো হয়ে গেলেও নাতিপুতিদের সাথে গর্ব ভরে গল্প করবেন। হিংসা হয়। মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাদের জীবনের সম্বল, গৌরবের ধন। তিনি এই ভাইদের জীবন ধন্য করে গেছেন।

কিছু কিছু মানুষ থাকেন যাঁদের সাথে আত্মীয়তা নেই, তেমন চেনাজানা নেই, খুব একটা দেখা সাক্ষাৎও হয় না। তবুও এঁরা মানুষের এত আপন হয়! নিভৃতে চোখের পানিতে বুক ভাসায় এঁদের জন্য। অনেক সময় ব্যক্তি নিজেও জানে না এতটা আবেগ এতটা ভালোবাসা জমা থাকে তাঁদের জন্য। বন্ধুরা জানিনা, এই নিভৃতচারী, লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা মানুষটার জন্য কেন চোখ ছলছল করছে। কয়বারই আর দেখেছি তাঁকে? জীবনে একবারও কথা হয় নি। কিন্তু চোখের পানি যে বাঁধ মানছে না। এতোটুক লেখার মাঝেই দু দু বার চোখের পানি ফেললাম। ফিৎনাবাজদের অবশ্যই ধন্যবাদ। ওদের ফিৎনা না হলে কোনদিন কলম ধরা হত না। আর জানাও হত না যে আমার এমন একজন ভালোবাসার মানুষ ছিলেন। হৃদয়ের কোনে এতটা ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছিলাম তাঁর জন্য। হে আল্লহ! আপনি তাঁকে দুনিয়া এবং আখেরাতে আপনার শান মোতাবেক সম্মানিত করুন।

তিনি আমাদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে অভিভাবকহীন করে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন। তিনি তাঁর মাকামে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু উম্মত তাঁর প্রয়োজনীয়তা আজো অনুভব করছে। কিছু মানুষ থাকেনই এমন হায়াতে থাকতে তাঁদের চেনা যায় না। মওতের পরে মানুষ তাঁদের চিনতে পারে। যেমন ইমাম যাইনুল আবিদিন রহিমাহুমুল্লাহ। তাঁর ইন্তেকালের পরে বুঝা গেছে প্রায় ১০০ এর উপরে পরিবার তাঁর দানের উপর নির্ভরশীল ছিল। আজ বুঝা যাচ্ছে দাওয়াতের এই মহান মেহনত মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির উপরে কতটা নির্ভরশীল ছিল।

২০১৪ সালের ইজতেমার রেশ তখনও হৃদয়ে বিলীন হয়ে যায়নি, এমনই এক মুহূর্তে দুঃসংবাদটি পেলাম। উম্মতের মহান অভিভাবক মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি আর নেই। শুনে চমকে উঠেছি ঠিকই। কিন্তু যত বড় দুঃসংবাদ মনে করেছিলাম, এটা আসলে তত বড় দুঃসংবাদ ছিল না। বরং ছিল তার চেয়ে অনেক বড় দুঃসংবাদ। এটা ছিল উম্মতের জন্য এক মহা বিপর্যয়, মহা বিপদ।

২০১৪ সালটা ভালো ভাবেই কেটেছে আলহামদুলিল্লাহ। ২০১৫ সালের পাকিস্তান ইজতেমার পরে শুনা গেল যে কে বা কারা ‘আলমী শূরা’ গঠন করেছে। অথচ কে গঠন করল, কোথায় গঠন করলো, কখন গঠন করল, কোন মাসোয়ারায় করল তার কোন হদিস আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাদের মাসোয়ারার পর্চাটাও আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারে নি। ঐ সময় বাংলাদেশের সাথীগণ পাকিস্তান ইজতেমায় ছিলেন। হাজী সাহেব এবং মাওলানা সাদ সাহেবও ছিলেন। দামাত বারকাতুহুম। তাঁদের কারো গোচরে এটা হয় নি। মাওলানা তারিক জামিল সাহেব জানান তিনি চিঠি নিয়ে যান মূহতারাম হাজী সাহেবের কাছে। গিয়ে বলেন, সব সাথীরা এর উপরে একমত হয়েছেন। এরপর হাজী সাহেব একশ এক বার ইস্তেখারার দুআ পড়ে সাইন করেন। বুঝাই যাচ্ছে হাজী সাহেব দামাত বারকাতুহুম তাদের কথিত এই শূরা বানানোর মজলিসে ছিলেন না। বরং তিনি ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেন নি। স্বাভাবিক ভাবে নিলে এতবার ইস্তিখারা করতেন না। পরে তিনি মাওলানা সাদ সাহেবের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠান। মাওলানা সাদ সাহেব হাজী সাহেবকে এই চিঠির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, তিনি কোন শূরা তৈরি করেন নি। বলাবাহুল্য এমন মাসোয়ারা ছাড়া বায়বীয় চিঠি কবুল করার কোন কারণ নেই।

পরবর্তীতে ক্বারী যুবায়ের সাহেব হাফিজহুমুল্লাহ সহ বাংলাদেশের সাথীরাও এই মাসোয়ারা বিহীন এই ‘আলমী শূরা’ প্রত্যাখ্যান করেন। বাংলাদেশের সাথীরা পাকিস্তানের সাথীদের সামনেই হাজী সাহেবকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে হাজী সাহেব আবারো প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে তিনি কোন শূরা বানান নি। বিস্তারিত জানতে ২০১৭ টঙ্গী ইজতেমার আগে পাকিস্তানে পাঠানো ওয়াসিফ ভাইয়ের চিঠি দেখা যেতে পারে।

পরবর্তীতে এক সপ্তাহ পরে অল ইন্ডিয়া জোড়ে মাওলানা আহমাদ লাট সাহেব এবং ভাই ফারুক সাহেবও কয়েকবার জোর দিয়ে বলেন যে কোন শূরা বানানো হয় নি। শুধু প্রস্তাব করা হয়েছিল মাত্র। তাই একথা সন্দেহাতীত ‘আলমী শূরা’ কেউ বানায় নি। যে ব্যাপারে কোন মাসোয়ারাও হয় নি। কোন বৈধ প্রক্রিয়ায় ‘আলমী শূরা’ হয় নি। বরং এটা উৎপাদন হয়েছে হয়েছে কোন একটা কম্পিউটার বা ল্যাপটপে, মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে। এরা ‘স্বঘোষিত শূরা’। নেতৃত্ব লোভী। কেউ নিজে থেকে কোন জিম্মাদারী চাইলে না দেয়া এটাই শরীয়তের বিধান।

এরপরে এই ইস্যুতে সিরিজ ফিৎনা হয়েছে। প্রথম দিকে মাওলানা সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে নিজে নিজেকে আমীর ঘোষণা করার অপবাদ দেয়া হয়েছে। অথচ মাওলানা ইব্রাহীম সাহেব এবং মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবরাই মাসোয়ারা করে তাঁকে ২০১৫ সালেই আমীর মেনে নেন। এসব অভিযোগ সাধারণ সাথীদের কাছে পাত্তা না পাওয়ায় পরবর্তীতে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দ্বারা মারকাজ দখলের পায়তারা করে। এতেও ব্যর্থ হয়ে পরবর্তীতে মাওলানা সাদ সাহেবের বিভিন্ন বয়ান থেকে কাটপিস সংগ্রহ করে দেওবন্দ থেকে তড়িঘড়ি করে ফতোয়া বের করার চেষ্টা করা হয়। (এটা নতুন কিছু নয়। এভাবে বিভিন্ন কিতাবের খন্ডিত অংশ নিয়ে বেরেলভীরা মাওলানা আব্দুর রশিদ গাঙ্গুহী এবং মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহমতুল্লাহি আলাইহুমার বিরুদ্ধে হারামাইন শরীফ থেকে ফতোয়া এনেছিল।) এভাবে উপমহাদেশের দ্বীনের খিদমতের দুই ধারার দুই প্রধান মারকাজকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। (এ ব্যাপারে লন্ডনের মুফতী মেহবুব সাহেবের কয়েকটি ওপেন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।) এর সাথে এদের ধারাবাহিক অপপ্রচার তো রয়েছেই। বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে একাধিক পোস্ট দেয়া হয়েছে। সামনেও হবে ইনশাআল্লাহ। কথা হল, এত যে ফিৎনা হল, সবই মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের পরে। তিনি বেঁচে থাকতে কেউ টু শব্দ করার সাহসও পায়নি।

কিন্তু কেন? কেন এই আলমী শূরার নামে ফিৎনা। গত প্রায় দুই দশক ধরে মাওলানা সাদ সাহেব বলতে গেলে একাই নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এতদিন কেন ফিৎনা হয়নি? এর উত্তর খুঁজতে হলে অনেক পিছনে যেতে হবে। কেননা এই মোবারক মেহনতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আজকের নয়। বরং বহু পুরানো। আর এতদিন এই ফিৎনা চেপে রাখাই মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহির কৃতিত্ব এবং বুজুর্গী। একই সাথে কারামতিও। তিনি তাঁর কারামতের দ্বারাই এই ফিৎনাবাজদের দাবিয়ে রেখেছিলেন।

দাওয়াতের কাজ যেদিন পরিচিতি লাভ করেছে সেদিন থেকেই বাতিলের চোখ পড়েছে এর উপরে। কিন্তু মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির মহান ব্যক্তিত্বের কাছে খুব একটা পাত্তা পায়নি। কিন্তু তারা সব সময়েই শকুনির চোখ রেখেছে। ভিতরের লোকদেরই ব্যবহার করতে চেয়েছে। তাই তাঁর ইন্তেকালের পরে যখন মাওলানা ইউসুফ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই মহান কাজের জিম্মাদারী গ্রহণ করেন তখনই কিছু লোক এই দায়িত্ব গ্রহণ পছন্দ করতে পারে নি। তারা শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে তিরস্কার করে যে আপনি নিজামুদ্দিনকে পাঞ্জাবের পীর সাহেবদের মসনদ বানিয়ে ফেলেছেন। [ সূত্র ১ ] আরেক দফা ভারত ভাগের সময়েও মারকাজ পরিবর্তন করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

পরবর্তীতে ধারাবাহিক ভাবে মাওলানা ইউসুফ রহমাতুল্লাহি আলাইহির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়েছে, বিভিন্ন কিতাবাদী লিখে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে। তাঁর মৃত্যুও স্বাভাবিক মৃত্যু হয় নি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলেই ব্যাপক ভাবে বিশ্বাস করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র তরুণ বয়সেই অস্বাভাবিক ভাবে ইন্তেকাল করেন। বিস্তারিত মাওলানা ইউসুফ মুত্বলা দামাত বারকাতুহুম এর বয়ানে রয়েছে। [ সূত্র ১ ]

মাওলানা ইউসুফ রহমাতুল্লাহি আলাইহির পরে তাঁর নিকট আত্মীয় মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি জিম্মাদারী গ্রহণ করেন। তখনও সেই বিশেষ মহল শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে সেই কথা গুলোই বলেন যা মাওলানা ইউসুফ রহমাতুল্লাহি আলাইহির দায়িত্ব গ্রহণ করার পর বলা হয়েছিল। অর্থাৎ তাঁকেও স্বাভাবিক ভাবে নেয়া হয়নি। [ সূত্র ১ ]

মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন খুবই বুযুর্গ। আহলে কাশফ, দূরদর্শী এবং হেকমতওয়ালা। তাঁর সময়েও বহুমুখী ফিৎনা হয়। কিন্তু তিনি হেকমতের দ্বারা সকল ফিৎনাই ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন। তাঁর দূরদর্শীতার একটি নমুনা হল, বর্তমানে যারা ফিৎনা করছেন তাদের কাউকে তিনি তাঁর পরবর্তী আমীর বানানোর জামাতে রাখেন নি। তাঁর সময়েই সারা বিশ্বব্যাপী এই কাজ বিস্তার লাভ করে।

পূর্ববর্তী এই তিন হযরতজীর সময়ে তিন স্তরে কাজ বিস্তৃত হয়। মাওলানা ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রচেষ্টা ছিল আলেমরা যেন বেশির থেকে বেশি এই কাজ কবুল করে নেন। আমরা ইতিমধ্যেই এক পোস্টে আলোচনা করেছি। [ সূত্র ২ ] অন্যদিকে মাওলানা ইউসুফ রহমতুল্লাহি আলাইহির মূল মেহনত ছিল আরব ভূমিতে। এক সময়ে আরবদের দ্বারাই সারা দুনিয়াতে দ্বীন ছড়িয়েছে। তারা এই মেহনত কবুল করে নিলে সারা দুনিয়ায় আবারো দ্বীন চমকাবে। পক্ষান্তরে মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহির জামানায় সারা দুনিয়াতে এই কাজ বিস্তার লাভ করে। তাঁর ব্যাপারে শুনেছি, ১৯৬৯ সালে মানুষের চাঁদে পদার্পনের প্রেক্ষিতে কিছু সাথী তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন যে চাঁদে যাওয়া কি সম্ভব? তিনি উত্তর করেন, এটা আমাদের ফিকিরের বিষয় নয়। আমাকে তো বল, ওখানে কি মানুষ আছে? যদি থাকে তাহলে আমি সেখানেও জামাত পাঠাবো।

ঐ সময় দুনিয়াদারদের উপরে প্রচুর মেহনত হয়। অনেক দুনিয়াদার আলহামদুলিল্লাহ কাজেও লেগেছেন। যেমন বড় বড় ব্যবসায়ী, আলীগড় সহ বিভিন্ন ভার্সিটির অধ্যাপকগণ, বিভিন্ন সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা প্রমুখ। মূলতঃ এঁরাই দেশ বিদেশে সফর করতেন এবং অন্যান্য বিভিন্ন খিদমতের আঞ্জাম দিতেন। তাই বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের প্রভাব বাড়তে থাকে। সকলের ইখলাসের স্তর এক রকম হবে না এটাই স্বাভাবিক। অনেকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রভাব রাখার চেষ্টা করত। এছাড়া হজরতজী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁদের মধ্যে ফিকির এবং জযবা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় শূরা করে দেন।

পরবর্তীতে যখন এঁদের প্রভাব আরো বাড়তে থাকে তখন তিনি বিভিন্ন হেকমতের আশ্রয় নেন। প্রথমত হজরতজী তাঁদের হাতে রাখতেন, তাঁদের মনক্ষুণ্ণ করতেন না। যেসব ক্ষেত্রে তাঁদের আবদার রাখা যেত, রাখতেন। তবে তিনি ইমারতের চেয়ে মাসোয়ারাকে শক্তিশালী করেন, যাতে যেকোন অনৈতিক চাপ মাসোয়ারার দোহাই দিয়ে এড়ানো যায়। তাঁর মাসোয়ারাতে পরামর্শ দাতা হিসাবে থাকতেন মিয়াজী মেহরাব সাহেব, মাওলানা উমার পালানপুরী সাহেব, মাওলানা ইজহারুল হাসান সাহেবের মত দক্ষ দাঈ এবং আলেমগণ। রহিমাহুমুল্লাহ। জটিল বিষয় গুলো তিনি তাঁদের উপরেই ছেড়ে দিতেন। ফলে মাসওয়ারার দোহাই দিয়ে অনেক কিছু এড়ানো যেত। আবার তিনি আগের দুই হজরতজীর মত মুখপাত্রের ভূমিকাও পালন করেন নি। বরং তাঁর জামানায় মূল বক্তা ছিলেন মাওলানা উমার পালানপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি। এভাবে তিনি সব পক্ষকে খুশি রেখে সুচারু ভাবে জিম্মাদারী আদায় করে আসছিলেন।

তবে তাঁর সময়ে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের একটা প্রভাব বলয় সৃষ্টি হয় যারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলত। তাঁরা নিজেদের হযরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছের লোক মনে করতেন। পরবর্তীতে হযরতজীর ইন্তেকালের পরে পরবর্তী জিম্মাদার মনোনীত করার মাসওয়ারাতেও এই মহলটি সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার প্রয়াস পায়। তাঁরা মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহির পক্ষে জোড়ালো রায় দেয়। মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহির সাথে তাঁদের সম্পর্ক ছিল। এমনকি অনেক সময় তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সিদ্ধান্তও তাঁরা প্রভাবিত করত। এ কারণে শূরাগণ তাঁর পক্ষে ফয়সালা করা মুনাসিব মনে করেন নি। বিস্তারিত মাওলানা আব্দুল ওয়াহিদ মালিক মাদানী দামাত বারকাতুহুম এর চিঠি। [ সূত্র ৩ ] অন্যদিকে মাওলানা সাদ সাহেবের পক্ষে অধিকাংশ রায় থাকলেও মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহির পক্ষে ঐ বিশেষ মহলের জোড়ালো সমর্থনের কারণে এত অল্প বয়সে মাওলানা সাদ সাহেবের উপরেও জিম্মাদারী অর্পণ মুনাসিব মনে করেন নি, কেননা সম্ভাব্য বিদ্রোহের আশঙ্কা ছিল। (আল্লহ রহম করেন, আজ এতো বছর পরে সেই আশঙ্কা বাস্তব রূপ নিয়েছে।) পরবর্তীতে তিনদিন মাসোয়ারা করেও কোন সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় তিনজনের উপরে জিম্মাদারী অর্পণ করা হয়। এতে শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম নাখোশ হলেও অন্য আরেকটি বিশেষ মহল খুশি হয়ে বলে যে আমরা পাঞ্জাবের পীর সাহেবদের মসনদ ছিনিয়ে নিয়েছি। [ সূত্র ১ ]

মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহি স্বপরিবারে নিজামুদ্দিনেই থাকতেন। সে সুবাদে মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহিও ছিলেন নিজামুদ্দিনের বাসিন্দা। তাঁর জীবদ্দশায় যা যা হয়েছে সবকিছু সম্পর্কেই অবগত ছিলেন। তিনি ১৯৭০-৭১ সালের দিকে মাজাহেরুল উলূম থেকে ফারেগ হন। যে কারণে শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহমতুল্লাহির সাথেও তাঁর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহমতুল্লাহিও তাঁকে খুব মুহাব্বত করবেন। তিনি তাঁর পিতার সাথে বেশ তরুণ বয়স থেকেই মারকাজে সময় দিয়ে আসছিলেন। তাই তিনি সকল পরিস্থিতি এবং আকাবিরগণের অবস্থান এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের নির্দেশনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

এর আগে আমরা এক পোস্টে দেখেছি শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহমতুল্লাহির পক্ষ থেকে মাওলানা ইনআমুল হাসান এবং মাওলানা ইজহারুল হাসান রহিমাহুমুল্লাহ এর প্রতি নির্দেশনা ছিল মাওলানা সাদ সাহেবের এমন তরবীয়ত যাতে পরবর্তীতে তিনি এই কাজের জিম্মাদারী আদায়ের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহিও মাওলানা সাদ সাহেবকে তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে ঠিক করে রেখে ছিলেন। [ সূত্র ১, ৪ ]

ওদিকে মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহির মুহিব্বিনগণ পরবর্তী জিম্মাদার হিসাবে যে তাঁর পুত্র মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেবকে চাচ্ছেন এটাও তাঁরা অবহিত ছিলেন। শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি ১৯৮১ সালের হজের সফরে মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহিকে সাথে সাথে রাখেন। এক পর্যায়ে খিলাফত দান করেন। মূলতঃ এর পর থেকেই তাঁর হাবভাবের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তিনি লম্বা সময় যিকির ও দুআয় মগ্ন থাকতেন। মূলতঃ মাওলানা সাদ সাহেবের উপর জিম্মাদারী অর্পণের নিমিত্তেই তিনি মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেবের মেহনতের রুখ ঘুরিয়ে দেন। [ সূত্র ৪ ]

তাই প্রথমদিন থেকেই মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। সম্ভাব্য বিভিন্ন ফিৎনা থেকেও সতর্ক ছিলেন। মূলতঃ মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের পর থেকেই তিনি সচেতন হয়ে যান। তিনি আরো বেশি চুপচাপ, গম্ভীর এবং ভারভারিক্কি হয়ে যান। সাধারণত কোন কথা বলতেন না। কেউ প্রশ্ন করলে খুবই অল্প কথায় জবাব দিতেন। যেন ইনআমুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহির নিসবত তাঁর উপরে অর্পিত হয়েছে। [ সূত্র ৩ ] মূলত সে হিসাবেই আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁকে তাঁর পিতার মতোই হিকমতের পাহাড় বানিয়ে ছিলেন। হেকমতের দ্বারাই তিনি সব ফিৎনা এক হাতে সামাল দেন।

তিন জনকে জিম্মাদারী দেয়া হলেও মাওলানা ইজহারুল হাসান এবং মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহিমাহুমুল্লাহ মূলতঃ নিজেদের গুটিয়ে রাখতেন। সিদ্ধান্ত মোটামুটি মাওলানা সাদ সাহেবই নিতেন। তাঁরা দুইজন ঐসব সিদ্ধান্ত সানন্দে গ্রহণ করে নিতেন।

নিজামুদ্দিনে কখনো পীর মুরীদির বায়আত ছিল না। কেননা মাওলানা ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজেই বেশ বুযুর্গ শায়েখ ছিলেন। কিন্তু তিনি এই কাজের মধ্যেই উম্মতের এস্তেমায়ী ইসলাহ দেখতেন। এমনকি বড় বড় শায়েখদেরও এই কাজে সময় দেয়ার অনুরোধ করতেন। [ সূত্র ২ ] পরবর্তীতে মাওলানা ইউসুফ রহমাতুল্লাহি আলাইহির সময় জিম্মাদারী নিয়ে কিছু ফিৎনা হলে নিজামুদ্দিনে ইমারতের বায়আত চালু হয়। কিন্তু তিনজনের উপরে জিম্মাদারি অর্পণের পরে সাথীরা নিজ নিজ মূহব্বাতের মানুষের হাতে বায়আত হতে পারেন, যাতে পরবর্তীতে বিশৃঙ্খলা হতে পারে, সাথীদের মধ্যে দলাদলি হতে পারে। এমন আশঙ্কায় বায়আত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপরও অনেকেই অনেক ভাবে চেষ্টা করেছে। যেমন ড. খালিদ নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি মাওলানা যুবায়ের সাহেবের কাছে বায়আত হতে যান। কিন্তু তিনি অস্বীকার করেন। রহিমাহুমুল্লাহ।

এভাবেই বিভিন্ন জন বিভিন্ন ভাবে ফিৎনা করতে চেয়ে। কিন্তু তিনি সব হজম করে ফেলতেন। কখনো মাসোয়ারার দোহাই দিয়ে, কখনো পূর্ববর্তী আকাবিরদের দোহাই দিয়ে কখনো বা মাওলানা সাদ সাহেবের দোহাই দিয়ে সকল চাপ এবং ফিৎনা উপেক্ষা করতেন। কিছুই মাওলানা সাদ সাহেবে পর্যন্ত যেতে দিতেন না। এভাবেই তিনি যোগ্য অভিভাবকের মত মাওলানা সাদ সাহেবকে আগলে আগলে রাখতেন। নিশ্ছিদ্র হিমালয় হয়ে সকল ফিৎনা থেকে হেফাজত করতেন। কোন ফিৎনাই মাওলানা সাদ সাহেবকে স্পর্শ করতে পারে নি।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। অমনি ফিৎনাকারীরা হামলে পড়েছে। কত রকমের অভিযোগ। অভিযোগের পাহাড় নিয়ে সর্বশক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। অথচ তিনি বেঁচে থাকতে একটা শব্দও শুনা যায় নি। ২০১৫ সালের পর কত শত বই প্রকাশ হয়েছে। অথচ তিনি হায়াতে থাকতে একটা পাতাও নয়। কেন? ২০১৫ থেকে এমন কি পরিবর্তন হল? পরিবর্তন একটাই উম্মতের মহান পাহারাদার আজ আর উম্মতের মধ্যে নেই। ওরা আগেই রেডি ছিল। শুধু এতদিন এই হিমালয় ডিঙাতে পারেনি।

অতি উৎসাহী কাজ্জাবগণ কেউ কেউ তাঁদের দুজনের মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্বের আষাঢ়ে গল্পও ফেঁদে বসেছে। এই গল্পগুলো তিনি ইন্তেকালের পরে কেন? এখন আগুন দেখা যাচ্ছে, তখন ধোঁয়া তো অন্তত দেখা যেত?

আমরা যারা তাঁদের দুজনকে একত্রে দেখেছি কোন দিন এক পাখির দুটি ডানা ছাড়া কিছু মনে হয়নি। একে অপরের সহযোগী ও পরম সুহৃদ হিসাবেই দেখেছি, সমান তালে চলেছেন। কোনদিন তাল কাটতে দেখিনি। এমন জুটি আর সম্ভব কিনা জানি না। সামান্য মনোমালিন্যের আলামত তো দূরের কথা, কখনো আমাদের কল্পনাতেও আসেনি।

যুবায়ের সাহেব কথা খুব কমই বলতেন। রহিমাহুমুল্লাহ। কোন রায় দিতেন না বললেই চলে। কিন্তু কোন রায় দিলে সেটাই ফয়সালা হয়ে যেত। আমরা বরাবরই মাওলানা সাদ সাহেবকেই ফয়সাল দেখেছি। সাথীরা বিভিন্ন রায় দিত, একেবারে শেষে এসে তিনি হাজী সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। হাজী সাহেব যখন বলতেন ঠিক হে, তখন ফয়সালা হত। হাজী সাহেব হাজির থাকতে এর আগ পর্যন্ত কখনো ফয়সালা দিতেন না। মাওলানা সাদ সাহেব এভাবেই হাজী সাহেবকে মুরুব্বীর মত সম্মান করতেন। হাফিজহুমুল্লাহ। আজ হাজী সাহেবের সাথে বেয়াদবির তোহমত দেয়া হচ্ছে। আস্তাগফিরুল্লাহ।

মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতে গেলে রায় দিতেনই না। জিজ্ঞাসা করা হলে রায় দিতেন। কিন্তু যে রায় দিতেন প্রায় বিনা বাক্য ব্যয়ে সেটাই ফয়সালা হত। আমি প্রায় দশটির মত মাসোয়ারা দেখেছি। কোনদিন ব্যতিক্রম দেখিনি। মাসোয়ারাতে সবসময় সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ দেখেছি। একবার মনে আছে ২০০৪ বা ০৫ হবে কাকরাইলে মাসোয়ারা হচ্ছিল। পরের ইজতেমার তারিখ নিয়ে। সাথীরা একমত হতে পারছিল না। কেননা শীত এবং ফসল কাটা এই দুই মজবুরি নিয়ে আলোচনা। তখন যুবায়েরুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহির রায় চাওয়া হয়। যেহেতু তিনিও একজন জিম্মাদার, তাই ওটাই ফয়সালা হয়ে যায়। ২০০৮ সালের শুক্রবার বাদ মাগরিব দুআর ফয়সালাও তিনিই করেন। মাওলানা সাদ সাহেব এভাবেই তাঁকে সম্মান করেছেন। এবং তিনিও মাওলানা সাদ সাহেবকে এভাবেই সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের সম্পর্ক ছিল যেন ফুল আর প্রজাপতির মত। যেন একজন আরেকজনের সৌন্দর্যই শুধু বৃদ্ধি করেছেন।আমরা যারা বাইরে থেকে দেখতাম আমাদের এতই ভালো লাগত যে শুধু দেখতেই ইচ্ছা করত। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কও যে দেখার জিনিস, তাঁদের দুজনকে না দেখলে আমি কোনদিন বুঝতাম না।

দুনিয়াতে সবচেয়ে মধুর সম্পর্ক মা এবং সন্তানের সম্পর্ক। এখানেও মাঝে মাঝে যে মনোমালিন্য হয় না তা নয়। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক একত্রে মেহনত করেছেন, মাঝে কিছু উনিশ বিশ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এগুলো সর্বসাধারণের সামনে আনাই তো একটা খেয়ানত। এর সাথে এরই কিছু রঙ মিশিয়ে বিরাট ঝগড়ার আষাঢ়ে গল্প এবং কল্প কাহিনী শুনানো উম্মতকে ধোঁকা দেয়ারই নামান্তর। সত্য কথা এটাই তিনি তাঁর পূর্ববর্তী আকাবিরদের মানসা জানতেন। সেভাবেই তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে মাওলানা সাদ সাহেবকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে এসেছেন। এবং সকল ফিৎনা নিজে হজম করে মাওলানা সাদ সাহেবকে নেতৃত্ব দানের জন্য নির্ভার ও চিন্তামুক্ত রেখেছেন। যোগ্য অভিভাবকের মত আগলে আগলে রেখেছিলেন।

তিনি আজ নেই, এটাকে যদি ফিৎনাবাজরা সুযোগ মনে করে তাহলে ভুল করবে। তিনি নেই তো কি হয়েছে? তাঁর দুআ তো রয়েছে। তিনি দীর্ঘ দেড় দশক ধরে যে দুআ করে গেছেন সেগুলো কি ব্যর্থ হতে পারে? জীবিত যুবায়েরুল হাসানের চেয়ে মৃত যুবায়েরুল হাসানকে ওরা আরো শক্তিশালী পাবে ইনশাআল্লাহ। এবং ওরা পরাজিত হবেই।

রহিমাহুমুল্লাহ।

[ সূত্র ১ ] : বিভিন্ন যুগের ফিৎনার বিবরণ। মাওলানা ইউসুফ মুত্বলা দামাত বারকাতুহুম।
https://www.facebook.com/groups/dawatermimborjamat/permalink/223772981682366/

[ সূত্র ২ ] : ইলিয়াস রহ. এর তাবলীগের দ্বারা কি চাইতেন
https://www.facebook.com/groups/dawatermimborjamat/permalink/233237790735885/

[ সূত্র ৩ ] : আব্দুল ওয়াহিদ মাদানী দামাত বারকাতুহুম এর চিঠি।
https://www.facebook.com/groups/dawatermimborjamat/permalink/204386370287694/

[ সূত্র ৪ ] : শূরা ও ইমারতের ব্যাপারে মুফতি মেহবুব সাহেবের আলোচনা।
https://m.facebook.com/groups/166781497381515?view=permalink&id=229700311089633

Advertisements

Leave a Reply