আনসারের ব্যবচ্ছেদ, মদীনা থেকে মেওয়াত।

আনসারের ব্যবচ্ছেদ, মদীনা থেকে মেওয়াত।

লেখকঃ শামীম হামিদী।

আনসারদের নিয়তিই এমন। তাঁদের সঠিক মূল্যায়ন আল্লাহ এবং আম্বিয়াগণ ছাড়া কেউ করতে পারে না। আনসারগণ শুধু দিয়েই যান। এঁরা নিতে জানেন না। এঁদের কেউ মূল্যায়ন করে না। আনসাররা লাঞ্ছনা ছাড়া কিছু পায় না। যুগে যুগে এটাই দেখা গেছে।

Photo Editor-20180629_132254.jpg

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্য আনসারদের আগেই সতর্ক করে গিয়েছিলেন যে তোমাদের এই দুর্গতি হবে। তখন করণীয় জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা জবাব পেলেন, আমার সাথে পুনরায় মিলিত না হওয়া পর্যন্ত সবর কর।

Photo Editor-20180629_131501.jpg

মেওয়াতীদের অবস্থাও এরচেয়ে ব্যতিক্রম কিছু হয় নি। তাঁরা অবশ্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নুসরত করতে পারেন নি। কপাল খারাপ সেই যুগটাই তাঁরা পাননি। তবে সুযোগ পাওয়া মাত্র তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজের নুসরত করেছিলেন। আর কপাল এই জন্যই পুড়েছে। তাঁদের কপালে অপবাদ ছাড়া কিছু জুটেনি। এখন অভিযোগ গুরুতর। এঁরা নাকি সন্ত্রাসী। মারকাজে বড় বড় আলেমদের উপরে হামলার অভিযোগ। তাঁদের যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হয়ে আলেমগণ মারকাজ ছেড়ে ভেগেছেন।

তোরা হাল চাষ করে খেতিস তাই তো ভালো ছিলি। তোরা এই নবুয়তের কাজের নুসরাত করতে গেলি ক্যান! এবার ঠ্যালা সামলা!!

কাজ্জাবদের অভিযোগ বড় মারাত্মক। শুধু এ জামানাতেই নয়, মেওয়াতীরা নাকি সব জামানাতেই ফিৎনা করেছেন। এঁরা নাকি হজরতজী ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির জিম্মাদারী পাওয়ার সময়েও ফিৎনা করেছেন। এঁরাই নাকি মিছিল পোস্টারিং অবরোধ করে সাদ সাহেবকে কথিত ফয়সাল শূরায় ঢুকিয়েছেন। এখন অভিযোগ এঁরা মেরে কেটে কথিত আলমী শূরার বড় বড় হাস্তীদের নিজামুদ্দিন থেকে বের করে দিয়েছেন। এই অভিযোগ গুলো বাইরের কেউ নয়, এমন সাথীরাই করছে, যাদের একসময় মেওয়াতীরাও জান মাল দিয়ে নুসরত করেছেন। সাথে কিছু আওলাদে মুবাল্লিগ। আবার এমন লোকও আছে যাদের নামের সাথে ‘আলেম’ ট্যাগ আছে।

কত আশ্চর্য মিল! মদীনা এবং মেওয়াত। দুটোই বাংলা ‘ম’ এবং আরবী উর্দু ‘মীম’ দ্বারা শুরু। জাহেরের সাথে বাতেনী মিলও আছে। মদীনার আনসারদের সাথে খারাপ ব্যবহার যারা করেছে তারাও বাইরের কেউ নয় বরং আপন লোক, মুসলমানই ছিল। সাহাবাদের আওলাদগণের মধ্যে ছিল। তাঁদের সাথেও খারাপ ব্যবহার করা হত। গালাগালিও করা হত। আবার ব্যঙ্গও করা হত যে, তোরা গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নালিশ করিস।

নবুয়তের এই মহান মেহনতের ধরণ সব যুগেই মোটামুটি একই রকম ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার বড় বড় নেতাদের কাছে মেহনত করতেন, এই আশায় যে, এরা কবুল করে নিলে সাধারণ মানুষও সহজেই কবুল করবে। কিন্তু খুব অল্প মানুষই কবুল করেছিল। শেষ পর্যন্ত আনসারগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহায়তায় এগিয়ে আসল। তাঁরা খুব ধনী ছিলেন না। মাদীনার আবহাওয়া ছিল বেশ গরম। বসবাসের খুব উপযোগী ছিল না। তাঁদের নিজেদেরই থাকার ব্যবস্থা তেমন ভালো ছিল না। কিন্তু এরপরও তাঁরা জান প্রাণ উজাড় করে দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নুসরত করেছেন। যা ছিল তাই অর্ধেক অর্ধেক করে মুহাজির ভাইদের দিয়েছেন। অনাহারে, অর্ধাহারে থেকেছেন, শীতে কষ্ট করেছেন, বিভিন্ন যুদ্ধে বিপদে তাঁরাই সামনে থেকেছেন, ইয়াহুদী ও মুনাফিকদের ঠাট্টা ব্যঙ্গ বিদ্রুপের শিকার হয়েছেন। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে নুসরত ত্যাগ করেন নি। বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। সীরতের কিতাব থেকে দেখে নেয়া যেতে পারে।

কিন্তু এর বিপরীতে আনসারগণ কিছুই পাননি। খেলাফত কুরাইশদের হক। হুনাইনের যুদ্ধে গনিমতের মাল তাঁদের না দিয়ে মক্কা বিজয়ের পরে ইসলাম গ্রহণ করা নওমুসলিমদের দেয়া হয়েছে। তাঁরা শুধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেয়েই সন্তুষ্ট থেকেছেন।

ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহিও এই কাজের শুরুর দিকে বড় বড় আলেমদের কাছে যেতেন। এই কাজের নকশা বুঝাতেন। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন এই কাজের মূল জিম্মাদারী আলেমদেরই। তাঁরা এই জিম্মাদারী গ্রহণ করে নিলে খুব দ্রুত এই কাজ উম্মতের মধ্যে ছড়াবে। উম্মত খুব দ্রুত ফায়দা পাবে। কিন্তু দুঃখজনক যে, হাতে গোনা কয়েকজন বাদে তিনি তেমন সারা পান নি। ঠিক এ সময়ে আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আনসার হিসাবে মেওয়াতীদের কবুল করলেন। এখানে আমার তুলনামূলক আলোচনা উদ্দেশ্য নয়। শুধু ধারাটা বুঝানোই উদ্দেশ্য।

মদীনার আনসারদের মতোই মেওয়াতীদেরও কিছুই ছিল না। বিশেষ করে ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি যা চাচ্ছিলেন, ইলম; মেওয়াতীরা ছিল একেবারেই গন্ডমূর্খ। গরীব এবং মদীনার আনসারদের মতোই কৃষিজীবী। মেওয়াত এলাকাও মদীনার মতোই বেশ গরম। মদীনার আনসারগণ যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেয়ে খুশি হয়ে গিয়েছিল, মেওয়াতীরাও তাই। দ্বীন ও দুনিয়া অত ভাল না বুঝলেও এক মাওলানা ইলিয়াসকে বুঝেছিল। রহিমাহুমুল্লাহ। সেই থেকেই মেওয়াতীরা এই কাজের সাথে ছায়ার মত লেগে আছে। মেওয়াতীদের ছাড়া এই কাজ সংজ্ঞায়িত করাই মুশকিল। হজরতজীর মালফুজাত এবং জীবনী যারা পড়েছেন তারা জানেন মেওয়াতীদের তিনি কত ভাবে কাজে লাগিয়েছেন। এই মূর্খ মেওয়াতীরাই ছিল এই কাজের বুনিয়াদ। এঁদের জান মাল নিয়ে আল্লহর রাস্তা বের হওয়া দেখেই ক্বারী তৈয়্যব সাহেব রহিমাহুমুল্লাহ বলে ছিলেন, ইলিয়াস তুমি তো অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছ। এই মূর্খ মেওয়াতীদের দেখেই হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানুভি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছিলেন, দলীলের দরকার নেই। আমি তো দেখতেই পাচ্ছি। মেওয়াতীদের মূর্খতাই কাজে লাগিয়েছে অনেক বড় বড় আলেমদের।

সর্বযুগেই এই কাজের আমীর থেকে শুরু করে সাধারণ সাথী, সবাইকে এরা প্রাণ উজাড় করে দিয়ে ভালোবেসেছে, নুসরত করেছে। আজও এই ধারা অব্যাহত আছে। কিছুদিন আগে আমাদের এক সাথী মেওয়াত সফর করে এসে বললেন, আমি যে আল্লাহর মেহমান এই উপলব্ধিটা এসেছে মেওয়াত সফরের পরে। শুধু আল্লাহর মেহমান, এতটুকু কথার উপরে মেওয়াতীরা যে নুসরত করলো, তাতে আমারও মনে হয়েছে আমি আল্লাহর মেহমান হয়েছি বলেই এমন সম্মান পেয়েছি। তিনি বলেন এর আগে আমি ভারতের অন্যান্য অঞ্চল, বাংলাদেশ, পাকিস্তান সহ বিশ্বের বহু দেশ সফর করেছি। এমন উপলব্ধি কখনো হয়নি।

আমি ২০০৩ সালে এক জামাতের সাথে চলছিলাম। ঐ জামাতের আমীর ছিলেন হাজী রুস্তম আলী। বাগেরহাট সদরেই বাসাবাটী এলাকায় তাঁর বাসা ছিল। বাগেরহাটের সাথীরা বলতে পারবেন তিনি এখনো হায়াতে আছেন কিনা। তিনি আমার তাবলীগের উস্তাদ। তিনি তাবলীগের বহু পুরাতন সাথী। অনেক গল্প শুনিয়েছিলেন পুরানো মুরুব্বীদের। এক মুজাকারায় তিনি আমাদের তাঁর মেওয়াত সফরের কারগুজারী শুনাচ্ছিলেন। কোন মহল্লাতে জামাত ঢুকলেই ছোট ছোট শিশুরা দৌঁড়ে আসে। জামাত যে ধরতে পারবে জামাত তার। তার পরিবার মেহমানদারী করবে। অনেক অভিভাবক নাকি নিজ পরিবারের হেরে যাওয়া শিশুদের বকাও দিতেন, আরেকটু জোরে দৌঁড়াতে পারলি না? অনেকদিন কোন জামাতের মেহমানদারী করতে পারি না।

আমীর সাহেবদের জামাত ঐ এলাকায় যতদিন রুখ ছিল নিজেরা রান্না করতে পারছিলেন না। একদিনও বাজারে যেতে পারেন নি। যত জরুরত মহল্লার আনসার সাথীরাই পূরণ করে দিতেন। একদিন তাঁরা অনেক কষ্ট করে এক রকম জোর করেই মেহমানদারী বাতিল করে বাজারে যান। কিন্তু কিছুই কিনতে পারছিলেন না। কারণ তাঁরা পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন। তাই মুসলমান দোকানে গেলেও দাম দিতে পারছিলেন না, বরং হাদিয়া হিসাবে পাচ্ছিলেন। বাধ্য হয়ে এক হিন্দুর দোকানে গেলেন। কেনাকাটার পরে দোকানী খোশগল্প শুরু করলো। তোমাদের তো বাহিরের লোক মনে হচ্ছে… তোমরা কারা? যখন শুনলো যে জামাতে এসেছে বিষ্ময় প্রকাশ করলো যে, তোমরা বাজারে কেন? স্থানীয় মুসলমানরা তোমাদের দাওয়াত দেয় নি! তখন বললো, আচ্ছা আজ তাহলে তোমরা আমার মেহমান। তোমাদের থেকে দাম নিব না। অনেক চেষ্টা করেও নাকি দাম দিতে পারেন নি। ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি মেওয়াতে এমনই মেহনত করে গেছেন, আল্লহু আকবার, হিন্দুরা পর্যন্ত আল্লহ রাস্তার মেহমানদের নুসরতকারী বনে গেছে।

এমন আরো একটা কারগুজারী শুনেছিলাম,২০০৬ সালের ইজতেমার আগে। আমি এক জামাতে ছিলাম। আমরা ছিলাম তিন জন বাঙালী, দুই জন সাউথ আফ্রিকান এবং চার জন ফিলিপিনো। আমীর সাহেব ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার। ডারবান মারকাজের শূরা। তিনি কারগুজারী শুনালেন, তিনি একদফা মেওয়াত সফর করছিলেন। সেখানে ইজতেমা হচ্ছিল। তাঁরা নগদ উসূল করে ময়দানে তাশরীফ আনলেন। খুবই উৎসাহ উদ্দীপনাপূর্ণ পরিবেশ। এস্তেকবালের ব্যপক এন্তেজাম। কি দেশী, কি বিদেশী সবাইকেই সমান তালে এস্তেকবাল করা হচ্ছিল। ঠান্ডা পানি, সফট ড্রিংকস, তরমুজ, বরফ মিশানো শরবত কত আয়োজন!

এর মধ্যে ছোট্ট একটা মেয়ে, ৮-১০ বছর বয়স হবে, এক হাতে একটা এলুমিনিয়ামের জগ, আরেক হাতে এলুমিনিয়ামের গ্লাস নিয়ে পানি বিক্রি করছে। জগ এবং গ্লাস দুটোই পুরানো এবং দাগ যুক্ত। আমীর সাহেব বলেন, অনেককে আমরা নগদ উসুল করে নিয়ে এসেছিলাম। সবাইকে ঠিক ঠিক জায়গায় পৌঁছাতে বেশ সময় লেগে যাচ্ছিল। আমি অনেকক্ষন যাবৎ লক্ষ করছিলাম যখনই নতুন কোন জামাত আসে, মেয়েটি দৌড় দিয়ে তাদের কাছে যায়। কিন্তু কেউ তার পানি নেয় না। আমি অবাক হচ্ছিলাম, মেয়েটি এখানে কিভাবে পানি বিক্রি করবে? এখানে ফ্রি ফ্রি ঠান্ডা বরফ দেয়া পানীয় পাওয়া যাচ্ছে। কোল্ড ড্রিঙ্কস পাওয়া যাচ্ছে। কে তার এই ময়লা জগের পানি খাবে?

আমীর সাহেব বললেন, আমার একটু মায়া হল। আমি মেয়েটিকে ডাকলাম। ওর হাত থেকে গ্লাসটা নিলাম। রোদের তাপে ততক্ষণে ওর পানি গরম হয়ে গিয়েছিল। এমন গ্লাসে পানি পানে আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। চোখ বুঝে পুরোটা এক নিঃশ্বাসে পান করে ফেললাম। পরে আরেক গ্লাস নিলাম। এটাও একই ভাবে পান করে ফেললাম। এরপর পুরো জগটাই নিলাম। পুরো জগের পানি মাথায় ঢাললাম। মেয়েটাকে জগ গ্লাস ফিরিয়ে দিয়ে একশ রুপির একটি নোট দিলাম। মেয়েটা দুই হাত এবং মাথা নাড়ছে। মুখে কিছু একটা বলছে। আমি ভাবলাম হয়ত মেয়েটি বলছে যে, তার কাছে খুচরা নেই। আপনি হাত নেড়ে নেড়ে বুঝাতে চাইলাম সবটাই নাও। খুচরা ফেরত দিতে হবে না। ব্যর্থ হয়ে অবশেষে একজন মুতারজিম (অনুবাদক) নিলাম।

মেয়েটি বলছে সে পানি বিক্রি করতে আসেনি। তার বাবা স্থানীয় তাবলীগের সাথী ছিলেন। কিছুদিন হয় মারা গেছেন। ভাইবোনের মধ্যে এই মেয়েটিই সবার বড়। বিধবা মায়ের ধারণা তার স্বামী বেঁচে থাকলে তিনিও এই ইজতেমাতে শরীক হতেন, আগত মেহমানদের খিদমত করতেন। তাই স্বামীর পক্ষ থেকে মেয়েকে পাঠিয়েছেন। সদ্য বিধবা গরীব এই মহিলা কি দিয়ে নুসরত করবেন! আল্লহর মেহমানদের তাই শুধু পানিই পেশ করেছেন।

বলতে বলতে আমীর সাহেবের দু চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল। তিনি বলেন, অনেক চেষ্টা করেও মেয়েটাকে টাকাটা দিয়ে পারিনি। বলেছি, হাদিয়া হিসাবে নাও। মেয়েটার একটাই কথা, আল্লাহর রাস্তায় বিনিময় নেয়ার নিয়ম নেই। বিনিময় তো আল্লাহ দিবেন।

আমীর সাব খুব আবেগের সাথে বলে বসেন, বিশ্বাস কর! এই মেয়েটা আমার তাবলীগের উস্তাদ। আমি পুরো সফরে যা হাসিল করেছি তারচেয়ে অনেক বেশি হাসিল করেছি এই মেয়েটার থেকে। আল্লহু আকবার। এতটুকুন মেয়ে! এই কথা কোথা থেকে শিখলো? আল্লাহর রাস্তার মেহমানদের খেদমতের জন্য তার কি প্রচেষ্টা, কি আকুতি! দৌঁড়ে দৌঁড়ে একেকটা জামাতের কাছে যেত যদি তার খেদমতের দ্বারা কেউ একটু উপকৃত হয় এই আশায়।

বন্ধুরা এভাবেই মেওয়াতের পুরুষ মহিলা এমনকি বাচ্চারাও এই মেহনতের নুসরত করে এসেছে যুগের পর যুগ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আমি জানিনা, হয়তোবা এখন এতো উচ্ছ্বাস নেই। কিন্তু এরপরও মেওয়াত এখনো, এই এত বছর পরেও স্পেশাল। অনেকের কাছে মেওয়াতের অনেক কারগুজারী শুনেছি। মেওয়াতে গেলে নাকি মনে হয় নিজের আপন ভুবনে এসেছি। মেওয়াত সফরের দ্বারা নবুয়তের এই মহান মেহনতের একজন কর্মী হিসাবে যে পরিমাণ আত্মবিশ্বাস হাসিল হয়, তা আর কোন ভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়। হাজী আব্দুল ওয়াহাব দামাত বারকাতুহুম বার বার মেওয়াতের ফাজায়েলে বলতেন এবং মেওয়াত সফরের তারগিব দিতেন। বলতেন মেওয়াতের পথে প্রান্তরে এই মেহনতের নূর ছড়িয়ে আছে।

কিছুক্ষণ আগেই বলছিলাম, কিছুদিন আগে আমাদের মালয়শিয়া থেকে এক জামাত মেওয়াত সফর করে এসে কারগুজারী শুনালো, সেখানে সব সময়েই মেহমানদারী হয়েছে। সাধারণত মেহমানদারীর আইটেম খুব আহামরি কিছু হত না। কিন্তু আমাদের জন্য ওদের ব্যাকুলতা দেখেই ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে আমরা তাদের বিশেষ মেহমান। পারলে সবকিছু দিয়ে দেয় আমাদের। তারা কারগুজারীতে আরো বলেছেন, আমরা যে কদর পেয়েছি কোন দেশের রাষ্ট্রীয় মেহমানও এতো কদর পায় কিনা সন্দেহ।

আমি জানিনা বন্ধুরা আপনারা কারা কারা মেওয়াত সফর করেছেন। আমি একাধিক জামাতের কাছে শুনেছি মেওয়াত সফরের পরে যে পূর্ণতা অনুভব হয়, তাতে মনে হয়, এতদিন আল্লহর রাস্তায় সফরই করিনি।

কিন্তু এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জান প্রাণ উজাড় করে দিয়ে এই মহান মেহনতের আমীর থেকে সাধারণ সাথী সবার নুসরত করে মেওয়াতীরা কি পেয়েছে???
কিছুই না।

বন্ধুরা আগেই বলেছিলাম নিয়তি বলেন বা বৈশিষ্ট্য বলেন, আনসারীরা কিছুই পায় না। মেওয়াতীরাও কিছুই পায়নি। বাহবাও জুটেনি এদের কপালে। এরা কখনও আমীরও হয়নি। আলেম হলেও এদের কপালে ‘মাওলানা’ উপাধিও জোটে না। এদের দৌঁড় ‘মিয়াজী’ পর্যন্তই।

হ্যাঁ, একটা জিনিস এদের জুটেছে।
তা হল অপবাদ।
মিথ্যা অপবাদ।
এরা নাকি সন্ত্রাসী।

মাওলানা সাদ সাহেবের হুকুমে পুরা নিজামুদ্দিন মারকাজে এরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে। আনসারদের এমনই কপাল। এদের বিরুদ্ধে এমন অপবাদ নতুন নয়। মদীনার আনসারদের কপালেও জুটেছিল সমসাময়িক খলিফা তথা বাদশাহদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অপবাদ।

বাস্তব কথা হল, নিজামুদ্দিন মারকাজে কোন সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেনি। যাঁরা নিজামুদ্দিন থেকে চলে গিয়েছেন তাঁরা কখনো এই অভিযোগ করেন নি। তাঁদের বারবার জিজ্ঞাসা করলেও ইতিবাচক উত্তর দেননি। সর্বশেষ কিছুদিন আগে ওয়াসিফ ভাই কথিত আলমী শূরার বরাবর খোলা চিঠিতে পরিষ্কার ভাষায় এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন। সেই চিঠির উত্তর আজ পর্যন্ত মিলে নি। কারণ খুবই স্পষ্ট, এমন কোন ঘটনা ঘটেই নি।

সত্য কথা হল, মদীনায় যেমন কিছু মুনাফিক ছিল তেমনি মেওয়াতেও সামান্য কিছু আছে। এমন আশ্চর্য মিল! দ্বীনের মেহনত, নুসরত বুঝি এমনই হয়। পুরাই খাপে খাপ মিলে যায়। এমনই এক মুনাফিকগোত্রীয় ছিল ইয়াসিন মেওয়াতী। সাদ সাহেবের খাদেম পর্যন্ত ছিল।

সাদ সাহেবের পরম বন্ধু, সুহৃদ, সহযোগী, নির্ভরযোগ্য ছায়া ছিলেন মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি এই মহান মেহনতের অন্যতম জিম্মাদার; খুবই আলা দরজার বুযুর্গ এবং আহলে কাশফ। এই মেহনতের শত্রুরা যতই মরাকান্না করুক, আসল কথা হল তিনি সাদ সাহেবকে তাঁর পূর্বসূরিদের মতোই যোগ্য অভিভাবকদের মত আগলে আগলে রেখেছিলেন সারাটা জীবন। তাইতো তিনি বেঁচে থাকতে কেউ একটা টু শব্দ পর্যন্ত করার সাহস পায়নি। এর একটা বড় প্রমাণ হল, তিনি যতদিন হায়াতে ছিলেন তখন কেউ এই কথিত আলমী শূরার দাবি উঠায় নি। এখন যে অভিযোগের সয়লাব বইছে এর ছিটেফোঁটাও তখন দেখা যায় নি। কারণ ওরা খুব ভালোভাবেই জানত, তিনি মাওলানা সাদ সাহেব তথা এই মহান মেহনতের অতন্দ্র প্রহরী। হিমালয় সম দেয়াল। এই পর্বত ডিঙিয়ে সাদ সাহেবকে স্পর্শ করা যাবে না। এজন্যই ওরা অপেক্ষা করছিল তাঁর মৃত্যুর জন্য। তিনি ইন্তেকাল করতে না করতেই ওরা সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মরণ কামড় বসানোর জন্য। দেরি করেনি। অথচ তিনি হায়াতে থাকতে এরা এমন ভাবে চুপ করেছিল যে এদের অস্তিত্বই টের পাওয়া যায় নি।

এ আরেক কথা। ইনশাআল্লাহ এ ব্যাপারে আরেকটা পোস্ট দেয়ার নিয়ত রাখি। তিনি এই মুনাফিকী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ইয়াসিনকে চিনে ফেলেন। তিনিই নির্দেশ দেন ইয়াসিনকে সরিয়ে দিতে। তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন ইয়াসিন আর আশে পাশে ঘেঁষার সাহস পায়নি। তাঁর ইন্তেকালের পর আরেক দফা হামলা চালায়। বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে এসে মারকাজে হামলা চালিয়ে সাদ সাহেবকে বন্দী ও মারকাজ দখল করার পরিকল্পনা ছিল ওদের। কিন্তু এই মেহনতের মহান আনসার মেওয়াতীদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সাচ্চা আনসার হিসাবেই কবুল করেছেন। কিছু মেওয়াতী নজমের সাথী ওদের কয়েকজনকে দেখেই চিনতে পারেন যে এরা ইয়াসিনের লোক। তাই অন্যান্য তরতিবের সাথী এবং সাধারণ মুসুল্লিদের সহযোগীতায় এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেন। উল্লেখ্য নিজামুদ্দিনে সব সময়েই মেওয়াত থেকে প্রচুর সাথী বিভিন্ন নজমের তরতিবে কাজ করেন। মেওয়াতীরা কোন কারণে দিল্লীতে আসলে নিজামুদ্দিনেও এসে ঘুরে যায়। এছাড়া আল্লাহর রাস্তায় সফর করার উদ্দেশ্যে প্রায় প্রতিদিনই মেওয়াত থেকে জামাত আসে। তাছাড়া ঐদিন খবর পেয়েও প্রচুর মেওয়াতী সাথীরা চলে আসেন। নিজামুদ্দিন থেকে মেওয়াত খুব বেশী দূরে নয়।

এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলে আলমী শূরার সমর্থকগণ একে একে মারকাজ ছেড়ে চলে যান। এটাই হয়ত ছিল ওদের মারকাজ দখলের চূড়ান্ত অভিযান। ব্যর্থ হবার পরে হয়ত বুঝে যায় যে মারকাজ দখল করা যাবে না। এবং এভাবে চাপ দিয়ে মাওলানা সাদ সাহেবকে ‘আলমী শূরা’ মেনে নিতে বাধ্য করা যাবে না। হতাশ হয়ে আলাদা মেহনত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁরা বের হয়ে যান। এরপর বিভিন্ন সময়ে তাঁরা চিঠি দিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। কিন্তু মেওয়াতীদের দ্বারা কথিত নিগৃহীত হবার অভিযোগ কেউ করেন নি।

একই ভাবে মেওয়াতীদের চাপে মাওলানা সাদ সাহেবকে ১৯৯৫ সালে তিন জিম্মাদারের একজন বানানো হয় বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে, এটা একদিকে যেমন মিথ্যা অন্যদিকে আমাদের আকাবিরদের বিরুদ্ধে এক ভয়ঙ্কর তোহমত। আমাদের আকাবিরগণ সকলেই খুবই আমানতদার ছিলেন। কোন চাপে পড়ে খিয়ানত করার মানুষ তাঁরা নন। নবুয়তের এই মহান মেহনতে খেয়ানত করার চেয়ে শাহাদাতের পেয়ালা পান করা তাঁদের জন্য অনেক সহজ ছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে এবং মহান আনসার মেওয়াতীদের বিরুদ্ধে আজ যারা ঐ সময়ে খেয়ানতের অভিযোগ উঠাচ্ছে তাদের অনেকের তখন জন্মই হয়নি।

বর্তমানে অস্থিরতার কারণে ঐ সময়ের প্রত্যক্ষদর্শীরা আজ অনেকেই মুখ খুলছেন। যাঁদের সাথে এই মেহনতের কোন স্বার্থ জড়িত নেই। যেমন কিছুদিন আগে আমরা শেইখ আব্দুল ওয়াহিদ মালিক মাদানী দামাত বারকাতুহুম এর চিঠি এবং মাওলানা ইউসুফ মুত্বলা দামাত বারকাতুহুম এর বক্তব্য পেয়েছি। কোথাও মেওয়াতীদের উল্লেখ নেই। তাহলে কি তাঁরা সবাই সত্য গোপন করেছেন? নাউযুবিল্লাহ। এমন কল্পনা করাও তাঁদের বিরুদ্ধে অপবাদের সামিল।

বিশেষ করে আব্দুল ওয়াহিদ মাদানী দামাত বারকাতুহুম খুবই পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সেই কয়দিনের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সেখানে শোকের পরিবেশ ছিল। আন্দোলনের পরিবেশ ছিল না। তিনি প্রথম দিন হাজির হতে পারেন নি। তিনি পৌঁছেছেন জানাযা হয়ে যাওয়ার পরে, রাতের বেলা। তিনি নিজের চোখে দেখা এবং অন্যান্য বুজুর্গদের থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে সম্পূর্ণ ঘটনা জেনেছেন। এ ব্যাপারে তিনি নিজেই বলেন যে, একক ভাবে কারো থেকে পুরা ঘটনা পুরাপুরি জানা যায় না। তাই তিনি এত লোকের থেকে জিজ্ঞেস করে জেনেছেন। আফসোস আজ কাজ্জাবের দল কিছুটা এক দুই জনের থেকে শুনে আরো কিছু রঙ মিশিয়ে প্রচার করে বেড়াচ্ছে। কিছু সরলপ্রাণ সাথী এতে ধোঁকাও খাচ্ছেন। আল্লাহ হেফাজত করুন।

আব্দুল ওয়াহিদ মাদানী এতই পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছেন যে, মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির মই বেয়ে নামার ঘটনাও বাদ যায় নি। অথচ এই সাধারণ ঘটনাটি অন্য কোন বর্ণনায় আসেনি। তিনি কতটা আমানাতদারীর সাথে সম্পূর্ণ ঘটনা লিখতে চেয়েছেন। অথচ সেখানে মেওয়াতীদের কোন উল্লেখই নেই। কারণ খুবই স্বাভাবিক, এসব ঘটনা বাস্তবে ঘটেনি। বরং এগুলোর উৎপাদন হয়েছে কাজ্জাবদের মস্তিষ্কে। এসব কাল্পনিক ঘটনার উৎপাদন এবং প্রচার প্রসারের সাথে যারা জড়িত, তারা খোলাফায়ে রাশেদার পরের জামানার আনসারদের উৎপীড়নকারীদেরই উত্তরসূরী।

এই মহান মেহনতের দ্বারাই সারা দুনিয়াতে দ্বীন ছড়িয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই কাজের নুসরাতের জন্য আনসারদের ব্যবহার করেছেন। তাই যারা এই মেহনতের শত্রু ছিল, আনসারগণও তাদের শত্রু ছিলেন। এক সময় এই কাজ উম্মতের মধ্য হতে হারিয়ে যায়। আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির দ্বারা এই কাজ আবারো জিন্দা করেছেন। সেই থেকেই ইসলামের শত্রুরা বারবার ছোবল হেনেছে এই মেহনত মিটিয়ে দেয়ার জন্য। আমরা আগেও বিভিন্ন পোস্টে এটা দেখেছি। মেওয়াতেও আনসারগণ ওদের শত্রু হবে… এতে অবাক হবার কি আছে? দুঃখ একটাই তাগুত সব সময় মুসলমানদেরই ব্যবহার করেছে ইসলামের ভিত্তি ধ্বংস করার কাজে।

বন্ধুদের কাছে অনুরোধ একটাই।

বৈশিষ্ট্য গুলো মিলিয়ে রাখুন, এদের চিনে রাখুন। তাগুত চেনার চিরন্তন আলামত, এরা আনসারদের শত্রু হয়।

Advertisements

One thought on “আনসারের ব্যবচ্ছেদ, মদীনা থেকে মেওয়াত।

  1. عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ حَفِظْتُ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم دَعْ مَا يَرِيْبُكَ إِلَى مَا لاَ يَرِيْبُكَ فَإِنَّ الصِّدْقَ طُمَأْنِينَةٌ وَالْكَذِبَ رِيْبَةٌ.

    হাসান ইবনু আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

    তিনি বলেন, আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে অবগত হয়েছি, তিনি বলেছেন, ‘তুমি সন্দেহযুক্ত কথা ও কর্ম ছেড়ে যাতে সন্দেহ নেই সে দিকে ফিরে যাও। নিশ্চয়ই সত্য প্রশান্তির নাম এবং মিথ্যা সন্দেহ ও অশান্তির নাম’ (তিরমিযী, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব হা/৪১৮২)।

Leave a Reply