ভারতবর্ষে যুগশ্রেষ্ট কয়েকজন নির্যাতিত আকাবিরের ইতিহাস।

ভারতবর্ষে যুগশ্রেষ্ট কয়েকজন নির্যাতিত আকাবিরের ইতিহাস

লেখকঃ সৈয়দ কামরুল হাসান রাহিদ

===ইতিহাস এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে সবার স্থান হয় না। যুগ-জমানা পাল্টে দেয়া ব্যক্তিরাই সেখানে স্থান পায়। এজন্য তাদের উপর দিয়ে বিরোধীতার স্লাইকোন চলে। ধৈর্য্যের সাথে যারা এসব মোকাবিলা করে যান, তারাই একদা ইতিহাস হন। ভারত বর্ষের বিগত তিনশ বছরের প্রসিদ্ধ কয়েকজন আলেম স্বগ্রোত্রীয় অনন্যা জমহুর আলরমদের দ্বারা নির্যাতিত হওয়ার কিছু যৎসামান্য ঘটনা আজ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরব। শুনাব তারা আবেগী, হুজুহী, উগ্রবাদী ও স্বার্থপর ফেতনাবাজ শ্রেনীর আলেমদের দ্বারা কিভাবে জুলুমে স্বীকার হয়েছেন। এই জুলমবাজ নামধারী দুনিয়াদ্বার আলেমশ্রেনী ও তাদের ফেৎনা সর্বকালেই ছিল। এবং কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে। তাদের দিয়েই আল্লাহ তার প্রিয় বান্ধাদের সবর আর ইসতেকামাতের কঠিন পরিক্ষা নিয়ে থাকেন।

আমরা ইতিহাসের পাতায় সে সব ইতিহাসে কেবল পড়েছি, কিন্তু আমরা এমন দু’একজনকে এজামানায়ও এমন জুলুমে স্বীকার হতে দেখেছি। এর রাজসাক্ষি হচ্ছে আমাদের প্রজন্ম। তাঁদের জীবনী এভাবে পাঠ করবে আমাদের পরবর্তি প্রজন্ম। শুনাতে পারব পরবর্তি প্রজন্মকে এযুগের এমন দু’কজন মজলুম মনীষার কথা।

জামানার মহা-নায়করা এমনি হন। স্রোতের উল্টো, আবেগ-হুজুগী আর চিন্তার সংকীর্ণতার অনেক উর্ধ্বে উঠে তারা কাজ করেন। তাদের দূরদর্শি চিন্তা চেতনা স্পর্শ করার মতো যোগ্যতা থাকে না সমকালীন অনেকেরই। ফলে তাদের বিরোধীতা করাকেই অকাজের কাজিরা কাজ মনে করেন। তাদের আঘাত করাকে অনেক বুঝমান ব্যক্তিও এবাদত মনে করেন। বিরোধীতাকে সওয়াব ভাবেন। তাদের অনুসারীদের গলাচেপে ধরতে, কিংবা গাড় ধাক্কা দিয়ে মসজিদ থেকে তাড়িয়ে দেয়াকে পূন্যের মনে করেন।

আর তারা কোন প্রকার সমালোচনার পরোয়া না করে কাজের কাজ করে যান আপন গতিতে। গীবত, শেকায়ত, থেকে তারা মুক্ত থাকেন। এই মরুঝড় আর তুফানের ভেতর দিয়েও একদল মুখলেস আল্লাহর বন্দা এসব মজলুম আকাবিরদের সাথে থেকে তাদের অনুসরণ করে থাকে এবং ইতিহাসে স্থান করে নেন। ঠিকমত ইতিহাসটি পরবর্তি প্রজন্মের জন্য লিখে রাখেন কেউ কেউ। যুগে যুগে এমনিই হয়েছে, আর এমনিই হবে….


শাহ ওলী উল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলভী রহঃ

উপমহাদেশে সর্ব প্রথম ফার্সি ভাষায় কুরআনের তাফসীর ও অনুবাদ করেন। কোরআনকে ফার্সি করে ফেলা! কত বড় অপরাধ! এটা মেনে নিতে পারলেন না সমকালীন কিছু আবেগি মানুষ। হক্কানি আলেমদের বড় একটি অংশ। তৎকালীন উলামায়ে কেরাম এর জমহুর জামাত এই বিষয়ে একমত হয়ে গেলেন, যে শাহ সাহেব মুহার্রিফে কুরাআন। যুগের সবচেয়ে বড় নকীব ও বিদগ্ধ এই মুজাদদ্দেদ আলেমের উপর বার বার সশস্ত্র আক্রমন করা হল। অবশেষে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি কেট ফেলা হল। তাকে যারা হক মনে করে আকড়ে ছিলেন তাদেরকেও গোমরা মনে করে আঘাত করা হত। এমনকি আল্লাহর ঘর মসজিদের ভিতর তাঁর অনুসারীদের নামাজ পড়তে দেয়া হত না।

তার কোন অনুসারীকেই তখন কোন দ্বীনী কাজ করতে দেয়া হত না। কিন্ত দেহলভী রহ. যুক্তি ছিলো ভবিষ্যত প্রজন্মকে কুরআন শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করন। পরবর্তীতে তার চিন্তা চেতনা ও দর্শনই সহি বলে বিবেচিত হল। তিনি পরবর্তিতে ভারতবর্ষের সবচেয়ে অবিসংবাদিত মুসলিম নেতা।পরে তার তাফসিরকে গোটা উপমহাদেশে কোরআন চর্চার মাইল ফলক বলে ফলো করা হল।

আজ শত বছর পরে এসে ইতিহাস বলে তিনি হকের উপর প্রতিষ্টিত কালজয়ী এক মহা মনীষা হিসাবেই অমর হয়ে আছেন। আর বিরোধীরা আজ কোথায়? ইতিহাসে কি তাদের কোন অস্তিত্ব আছে?

উপমহাদেশের সকল উলামায়ে কেরামের যাবতীয় দ্বীনী, ফিকহি সিলসিলা, হাদীসের সনদ, তাযকিয়ার শাযরাহ গিয়ে একত্রিত হয়েছে শাহ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলভীর সাথে। তাকে বাদ দিয়ে উপমহাদেশে ইমলামের ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। আর ইতিহাস পাঠে এখন এসে অবাক হতে হয়, এই মহান যুগ সংস্কারক আলেমেদ্বীনের উপরেও তৎকালিন উলামায়ে কেরামদের একটি বড় অংশ ৩০বছরের অধিক সময় কুফরি ফতোয়া দিয়ে রেখেছিলেন দীর্ঘদিন। এমনকি তিনি কাফের হিসাবে তাকে হত্যা করার জন্য বারবার সবোর্চ্চ চেষ্টা করেছেন এই ফতোয়াবাজ আলেমশ্রেনী। (বিস্তারিত দেখুন, হায়াতে ওয়ালী পৃষ্টা নং ৩২১)

শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী ছিলেন, ঐব্যাক্তি -যিনি দীর্ঘ এগার বছর কাল সাধনার পরে কুরআন শরিফের প্রথম পুনাঙ্গ অনুবাদ করেছিলেন উপমহাদেশে। তখন সর্বত্র ফার্সি ভাষার প্রচলন ছিল। ফারসি ভাষায় তিনি কুরআনের তরজমা “ফতহুর রাহমান” প্রকাশের পর তৎকালিন উলামায়ে কেরাম না বুঝেই আরবী কুরআনকে ফার্সি করার অপরাধে তার উপর ভয়ংকর ‘কুফরি’ ফতোয়া আরোপ করেন। তার বিরোদ্ধে মিটিং মিছিল আর অবরোধ ও হামলা সহ এমন কোন নেক্কারজনক ঘটনা নেই যা, স্বগোত্রের আলেমদের দ্বারা তার উপর হয়নি। #আমিরুর_রওয়াত গ্রন্থে আছে, এমনকি এই ফতোয়ার কারনে তাকে তাঁর এলাকা থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষনা করে বের করে দেয়া হয়েছিল। (বিস্তারিত দেখুন, শাহ ওয়ালী উল্লাহ আউর উনকি সিয়াসি তাহরিক, মাওলানা উবায়দুল্লাহ)


হুজ্জাতুল ইসলাম ক্বাসিম নানুতবী রহঃ

দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ক্বাসিম নানুতবী রহ.। একবার লাখনৌর ‘পুরকাজী’ নামক অঞ্চলে ছিলেন। তখন সেখানে শিয়াদের মহররমের আনুষ্ঠানিকতা চলছে। শিয়ারা কি এবং তাদের হারাম কাণ্ডকারখানা সম্পর্কে সবাই অবগত আছেন। তো তাদের একটি প্রতিনিধি দল নানুতবী রহ. এর কাছে এসে দাওয়াত দিলো তাদের তাযিয়া মিছিল ও মাতম অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। তিনি দাওয়াত কবুল করলেন। সেখানে গিয়ে বক্তব্যও রাখলেন। তাঁর সেই বক্তব্য পরবর্তীতে অনেকের হেদায়াতের পথ খুলে দিলেও, তখন কিন্তু পুরো ভারতবর্ষে জুড়ে তার সমালোচনা ও নিন্দার তুলকালাম ঘটে গেল। মানাযির আহসান গিলানী রহ. এর ভাষায় খালবালি মাচ গায়ি। তিনি শিয়া হয়ে গেছেন বলে মিছিল মিটিং পর্যন্ত হয়ে গেল। তাকে সমালোচনায় ক্ষত-বিক্ষত করা হল। তবে নানুতবী রহ. তা থোড়াই পাত্তা দিয়েছেন, কিন্তু শেষে নিজের মানুষদের প্রশান্তির জন্য সেই দৃঢ় উত্তর শুনিয়ে দেন “শক্তিসম্পন্ন সাধক বিষ খেয়েও হজম করতে পারে বিষের কোন প্রতিক্রিয়া তাঁর দেহে প্রকাশ পায় না। যার পাকস্থলী দুর্বল সে তো সামান্য তৈল ব্যঞ্জনেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। (শিয়াদের তাযিয়া মঞ্চে)যদি হালুয়া গ্রহণ করে থাকি তাদের মঞ্চে সত্যকথাও তো পৌঁছে দিয়েছি”।
মানাযির আহসান গিলানী রহ. এর ভাষায় খালবালি মাচ গায়ি [সাওয়ানেহে কাসেমী ২/৬৮, মাকতাবায়ে দারুল উলূম]

শেষ হয়নি, ফতোয়া, সমালোচনায় ক্ষত-বিক্ষত। তবে নানুতবী রহ. তা থোড়াই পাত্তা দিয়েছেন, কিন্তু শেষে নিজের মানুষদের প্রশান্তির জন্য সেই দৃঢ় উত্তর শুনিয়ে দেন “শক্তিসম্পন্ন সাধক বিষ খেয়েও হজম করতে পারে বিষের কোন প্রতিক্রিয়া তাঁর দেহে প্রকাশ পায় না। যার পাকস্থলী দুর্বল সে তো সামান্য তৈল ব্যঞ্জনেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। (শিয়াদের তাযিয়া মঞ্চে)যদি হালুয়া গ্রহণ করে থাকি তাদের মঞ্চে সত্যকথাও তো পৌঁছে দিয়েছি”। [সাওয়ানেহে কাসেমী ২/৬৮, টীকায় কারী তৈয়্যব রহ. লিখেন, গ্রহণ করেছেন জানা যায় কিন্তু খেয়েছেন বলে কোন তথ্য নেই। বিস্তারিত দেখুন মুফতী ফয়যুল্লাহ আমান কাসেমী কৃত হৃদয়ের আঙিনায় নববী দাওয়াত, মাসিক পাথেয় জুলাই ও অগাস্ট ‘১৫]

আজ সমালোচক বিরোধীরা কোথায়? আর নানুথবী রহ. ইতিহাসে কোথায় সবারই জানা।


শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহঃ

শাযখুলহিন্দের নেতৃত্বে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন শুরু হল ভারতবর্ষে। সুদূর আফ্রিকা থেকে ডেকে আনলেন হিন্দু নেতা করমচাঁদ গান্ধিকে। মুসলমানদের চাঁদার টাকা খরচ করে সারা ভারতে করমচাদ গান্ধিকে হাইলাইট করলেন হিন্দুদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে। শায়খুল হিন্দ তাকে মহাত্মা গান্ধি” উপাধি দিলেন। শুধু কি তাই! শায়খুল হিন্দ সরাসরি হিন্দুদের নেতৃত্বাধীন কংগেসে যোগ দান করলেন। শায়খুল হিন্দ তখন ১৯১৫সালের ২৯ অক্টোবর ভারতের অস্থায়ী ছায়া সরকার গঠন করলেন, সে সরকারে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট বানালেন রাজা মহেন্দ্র প্রতাপকে।

তখন মুসলমাদের অতি আবেগী একটা দল শায়খুল হিন্দকে হিন্দুদের দালাল এবং মুসলমানদের অর্থ তসরুফ কারী ঘোষণা করেছিলো। পরবর্তীতে এটাই প্রমানিত হয়েছে শায়খুল হিন্দের চেতনার ফসলই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা। খোদ দেওবন্দ থেকে শায়খুল হিন্দের বিপ্লবী কর্মকান্ডের উপর যখন আপত্তি তোলে একের পর এক বিরোধীতা করা হল তখন, হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. এক বিবৃতিতে বলেন, আমার জিহাদী ও সিয়াসি কর্মকান্ড যারা মাদরাসার ভিতর বসে বুঝতে সক্ষম হচ্ছেন না, তাদের উচিত দরস তাদরিস তথা তালিমে মশগুল থাকা। তারা রাজনীতি নিয়ে কথা বলা সমুচিত নয়, বরং অন্যায়। যেহেতু তারা সিয়াসি ময়দানে নেই এবং সে সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতাও নেই। তারা সিয়াসি বিষয়ে কথা বললে, বিশৃংখলা বাড়বে বৈ কমবে না।
(বিস্তারিত দেখুন, শায়খুল হিন্দ আওর উনকা সিয়াসি তাহরিক)


মাওলানা উবায়দুল্লাহ সান্ধি রহঃ

মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি ছিলেন, যুগ সংস্কারক। তার অধিকাংশ চিন্তার সাথে খোদ দেওবন্দী আলেমদের একাংশ একমত্র হতে পারেননি কখনও। কুফরি ফতোয়াতে শিকার হয়েছিলেন শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান রহ.সহ তাঁর অসংখ্য ছাত্র ও শিষ্য। তাদেরই একজন মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি। বৃট্রিশ বিরোধি বিখ্যাত রেশমি রুমাল আন্দোলনের অন্যতম মহানায়ক তিনি। উবায়দুল্লাহ সিন্ধির উপর তৎকালিন দেওবন্দি একদল আলেম তার কিছু সমকালিন চিন্তাধারা নিয়ে ব্যাপকভাবে “কুফরি ফতোয়া” প্রদান করেন। এবিষয়ে ইতিহাস গবেষক নুর উদদীন আহমদ সিন্ধির জীবনীতে লিখেছেন, “মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি দেওবন্দে শিক্ষালাভ করেছিলেন বটে,কিন্তু তিনি দেওবন্দের বাহ্যিক রূপ, রং এবং আকৃতি-প্রকৃতির প্রতি অনুরক্ত ছিলেন না। শাহ ওয়ালী উল্লাহ যে চিন্তাধারা দ্বারা দেওবন্দের বিশিষ্ট নেতাগন অনুপ্রাণিত ছিলেন, তিনি সে আর্দশ ও দর্শনের মর্মমূলে পৌছে ছিলেন। শায়খুল হিন্দও তাঁর এরূপ যোগ্য শিষ্যের কাছে দেওবন্দ প্রতুষ্ঠানের অন্তর্নিহিত বৈপ্লবিক লক্ষের বিষয়ে খুলে বলেছিলেন। মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি ইসলামকে যে বিশ্ব মেজাজ ও দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, খোদ দেওবন্দের উলামাদের একাংশের তা মনঃপূত ছিল না। এজন্য তাঁরা মাওলানা সিন্ধির উপর কাফেরি ফতোয়া একের পর এক আরোপ করতে থাকেন। (বিস্তারিত দেখুন, শাহ ওয়ালী উল্লাহ ও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা, ভূমিকা, মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী)


মাওলানা আবুল কালাম আযাদ

ভারতবর্ষে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ও পরবর্তিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে আলেমদের ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্টার রাজনৈতিক দল তখন কাজ করছে। কিন্তু মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তখন হিন্দুদের একমাত্র রাজনৈতিক দল “ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ” একটানা ২২ বছরের কেন্দ্রীয় সভাপতি। দুরদর্শি চিন্তা চেতনা ভাবনা সমকালীন অনেক মুসলিম নেতাই মেনে নিতে পারেন নি। কিন্তু ৪৭সালে গান্ধিকে নিয়ে মুসলিম গনহত্যা বন্ধে তার ঐতিহাসিক অবদান কে অস্বীকার করতে পারে? যা
সমকালিন মানুষ হুজুগে বুঝতে পারে নাই। তাকে হিন্দু মদপ্যি সহ নানান অপবাদে জর্জরিত করা হয়েছিল। ফলে তিনি বহু আক্রমনে স্বীকার হয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষি যাকে হিন্দু বলে ফতোয়া দেয়া হয়েছিল, ভারতীয় জাতিয় কংগ্রেসের সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ঠিকই আজ মুসলমানদের কাছেই ইতিহাসের মহানায়ক। স্বর্ণালী অক্ষরে তার নাম ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে। যাদেরকেই একসময় দালাল,দালাল বলে চিৎকার করা হয়েছিল তারাই আজ ইতিহাসে জাতির মহান কাণ্ডারি
হিসাবে অমর হয়ে আছেন।


শায়খুল ইসলাম সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী রহঃ

কুতবে আলম সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. ছিলেন অখন্ড ভারতের পক্ষে। জিন্নাহের ধোকাবাজি ইসলামি রাষ্টের ঘোর বিরোধী। বলেছিলেন সবাই পাকিস্তানে চলে গেলেও আমি এই ভারতেই থাকব। ৭৩ লাখ মুসলিম তখন পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। মদনী রহ. সে ঘোষনা না দিলে ভারত হত একক হিন্দু রাষ্ট। মদনী রহ. কে তখন আক্রমন করা হয়েছিল কংগ্রেসের দালাল বলে। মাদানী রহ. এর কট্টর বিরোধীদাতাকারিদের একজন, মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমিনী। তিনি মৃত্যুর আগে প্রায়ই বলতেন, মুজক জিন্নাহ ধোকা দিয়া, সিয়াসী সমজা ওহ মাদানীনে সমজনা”।

৪৭সালে হিন্দুস্তান জুড়ে হযরত মাদানী রহ.কে কাফের ফতওয়া প্রদানের হিড়িক পড়ে যায়। ফতোয়াগুলো কোন ইংরেজ দালাল দেয় নি। যারা দিয়েছিলেন। তারাও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনের স্রষ্টারা মনে করতেন, হযরত মাদানী ইসলামি রাষ্ট তথা খেলাফতের বিরোধী। ব্যাস তিনি কুফরের মাঝে আছেন। স্রোতের সাথে ভেসে তার আজীবনের ভক্ত এক আল্লামাও কাফের ফতওয়া প্রদান করে রীতিমত হযরত মাদানী রহ. এর বিরোদ্ধে একটি দালিলিক কিতাব লিখে ফেলেন। অগত্যা হযরত শায়খুল ইসলাম মাদানী (রহ) নিজের অবস্তান পরিষ্কার করে ”মুত্তাহিদায়ে কাওমিয়্যাত আওর ইসলাম ”’ নামে একটি কিতাব রচনা।


হযরতজী মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াস রহঃ

দিল্লী শাহী মসজিদে এমন অবস্থা হয়েছিল, এক ওয়াক্তে একক মসলকের একেক ইমাম নামাজ পড়াতেন। একাধিক জামাত হত হর ওয়াক্তে। এক আলেমের অনুসারী আরেক ইমামের পেছনে নামাজ পড়তেন না। একেক আহলে হক ইমামের অনুসারীরা একেক ধরনের টুপি, পান্জাবী, পাগরী পড়তেন। উম্মতের পোশাক পর্যন্ত ভাগ হয়ে গিয়েছিল। আলেম আর আওয়ামের মাঝে জুযন জুযন দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এমন এক কঠিন পরিস্তিতে হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহ মেওয়াতের মূর্খ আওয়ামদের নিয়ে যখন দাওয়াত ও তাবলীগের মোবারক মেহনত আরম্ব হল। তখন বড়বড় আলেমদের এই কাজ বুঝে আসে নি। চারদিক থেকে শুরু হল বিরোধীতার তুফান। হযরতজীর বিরুদ্ধে লিফলেট, পেষ্টার এমন কিছু নেই যা করা হয় নি।

হযরতজী মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াস রহ.যখন দাওয়াত ও তাবলীগের এই মোবারক মেহনত শুরু করেন তখন এই কাজের উপর নানান অভিযোগ আর এশকালাত এসেছিল শুরু থেকেই বড়বড় শায়খুল মাশায়েখদের পক্ষ থেকে। আহলে হক উলামায়ে কেরাম ও কাছের মানুষদের কাছ থেকেই তিনি সবচেয়ে বেশি বাধা গ্রস্থ হয়েছিলেন। তার এক আত্মীয় মাওলানাতো এই কাজের বিরোধীতা করতে গিয়ে তাকে ঘর থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন,ঘোমরাহ মৌলবী বলে। বড় বড় এলমি মারকাজ থেকে আওয়ামদের নিয়ে এই দাওয়াতের মেহনত শুরু করার বিরোধীতা করে শহরে বড়বড় পোষ্টার লাগিয়ে ফতোয়া প্রকাশ করা হচ্ছিল।

হযরতজীর উপর যখন ফতোয়ার তুফান চলছিল ভারতজুরে, তখন বড় হযরতজী চুপ ছিলেন, কিন্তু হাকীমুল ইসলাম ক্বারি তাইয়্যেব রহ.তখন এসবের জবাব দিয়ে লিখলেন, তাবলীগী মেহনত কিয়া জরুরী হ্যায়, শায়খুল হাদীস জাকারিয়া রহ. “জামাতে তাবলীগরপার এতরাজকে জওয়াবাত, আল্লামা মঞ্জুর নোমানী রহ “তাবলীগ পর এশকালাত কি জওবাত” মালুফুজাতে হযরতজী। মুফতি হাবিবুর রহমান রহ.তাবলীগ জামাত আওর উসকা নাকিদিন”। মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ “ফতোয়ায়ে মাহমুদীয়া” আফ্রিকা আওর খেদমতে তাবলীগ” খুতুবাত ও হাকীকতে তাবলীগ। নুর মোহাম্মদ কাদের তিউনুসবীর “তাবলীগ জামাত আওর মাশায়েখে আরব”। এহতেশামুল হাসান এর সাওয়ানাহে হযরতজী দেহলভীসহ অসংখ্য পুস্তিকা আমাদের অনেক আকাবিরগন লিখে জবাব দিয়েছিলেন। কিন্তু হযরতজী ঠিকই নিরব ছিলেন। ফলে আশ্চর্য এক আমল সব ফেৎনার তুফানকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল কয়েক বছরের ভিতরেই।

(বিস্তারিত দেখুন, আপবিতী, শায়খুল হাদীস জাকারিয়া রহ., তাবলীগ জামাত আওর মুফতি মাজমুদ রহ গ্রন্থে)


আল্লামা ইকবাল

আমাদের আকাবিরদের মাঝে যিনি স্বগোত্রের আলেমদের দ্বারা এতই বিশ্বাস, চেতনা ও আক্বিদা লালন করার পরেও সবচেয়ে বেশি নির্যাতন আর ফতোয়ার রোশানলে বারবার পড়েছেন তিনি আল্লামা ইকবাল। আল্লামা ইকবাল ছিলেন, দুরদর্শী চিন্তা ও উম্মাহর কল্যান এবং জাগরনের এক ধারক বাহক। তার কবিতা, লেখনি, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ও বক্তৃতা ছিল উম্মাহর জাগরনের হাতিয়ার। আর উম্মাহকে বিনিষ্টকারি স্বার্থপর শ্রেণীর বিরুদ্ধে সোচ্চার। ফলে তার ললাটের স্থায়ী লিখন ছিল উলামাদের বিরোধীতা। তার উপর নানান কারনেই এতোবেশি ফতোয়া হয়েছে, তার জীবনী গ্রন্থাকার লিখেছেন, এসব দিয়ে হাজার পৃষ্টার গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব হত। বিশেষ করে আল্লামা ইকবালের, শিকওয়া কাব্য গ্রন্থ প্রকাশের পর ভারতবর্শজুড়ে তার উপর কুফরি ফতোয়া ও কাফের বলার হিরিক পড়ে যায়। তখন তিনি বলেছিলেন, আমি যদি কাফের হই তোমরা কেউ আর মুসলিম নও। তারপর দীর্ঘ অপেক্ষার পর, “জওয়াবে শিকওয়া” লিখে তিনি তার উপর আরোপিত অভিযোগের জবাব দিয়েছিলেন।


মাওলানা জামাল উদ্দীন আফগানী

জামাল উদ্দীন আফগানী ছিলেন যুগ সংস্কারক এক মহান আলেমেদ্বীন। ভারত উপমহাদেশ পেরিয়ে এই আফগান আলরমেদ্বীন আরব বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। স্প্যান ইসলাম, নামে তিনি একটি যুগান্তকারী আন্দোলনের প্রবর্ক্তা। জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন ভারতবর্ষ ও মিসরে। লিখেছেন ,অনেক গ্রন্থ। তারমধ্যে মাকালাতে জামাল উদ্দিন ও আসারে জামালুদ্দিন বিখ্যাত। তিনি তার এক বয়ানে বলেছিলেন, খোদ নবীরাও যখন চেষ্টা -সাধনা ক্ষেত্রে শৈথিল্য প্রদর্শন করেন, তখন তাদেরও পিছিয়ে পড়তে হয়েছে। এর পরেই অন্ত্যন্ত নৈপুণ্যের সাথে উক্ত বক্তৃতাকে বিভিন্নভাবে বিকৃতি করে তার ভিত্তিতে আফগানীকে কাফির বলে ফতোয়া দেওয়া হয়।

যখন, ঐ ফতোয়া সম্পর্কে আফগানী অবহিত করা হয় তখন তিনি বলেন, তাঁরা আমাকে কাফির বলে ফতোয়া দিচ্ছে এবং আমিও তাদের উপর সেই ফতোয়াই চড়াচ্ছি। ইবনে সীনা রহ.এর উপর যখন কুফরি ফতোয়া দেয়া হয়েছিল তখন, তিনি কবিতা আবৃত্তি করে বলতেন, বর্তমান যুগে শুধু আমি আর আমার অনুসারীরাই মুসলমান, তা ছাড়া আর কোন মুসলমানের অস্তিত্ব নেই। আফগানী বলতেন আমারও এই জবাব। (বিস্তারিত দেকুন সাইয়্যিদ জামাল উদ্দিন আফগানীর রচনাবলী, মুহাম্মডআব্দুল কুদ্দুস কাসেম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)


ফেদায়ে মিল্লাত সৈয়দ আসআদ মাদানী

ফিদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী রহ. কাহিনী। যুদ্ধ চলছে কারগিলে। ভারত সৈন্যদের সাথে মুসলমানদের। ফিদায়ে মিল্লাত -রসদ পাঠালেন হিন্দু সৈন্যদের জন্য। সফরে চলে গেলেন এক-মাসের জন্য। সমালোচনা ঝড় উঠলো উলামায়ে কেরামের মাঝে। একি করলেন তিনি ? সবাই রাগে ফুঁসতে লাগলেন। তার বিরোদ্ধে কেউ কেউ ফতোয়া দিয়ে দিলেন। এদিকে মুসলিম সৈন্যদের হাতে প্রচন্ড মার খেলো হিন্দু সৈনারা। পার্লামেন্টে প্রস্তাব উঠলো গনহারে মুসলিম নিধনের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাঁধ সাধলেন। বললেন, মুসলিম নেতা আসআদ মাদানী আমাদের সৈন্যরদেরর জন্য রসদ পাঠালেন। এর পরও কোন যুক্তিতে আমরা মুসলিম নিধন করবো? এক মাস পর ফিরে এলেন ফিদায়ে মিল্লাত। সাঈদ আহমদ পালনপুরী দা.বা. বললেন “হযরত ! সিয়াসাত আপ হি কে লিয়ে হেঁ“। এরকম অসংখ্য নির্যাতন আর জুলুমে বারবার স্বীকার হতে হয়েছিল হযরত ফেদায়ে মিল্লাত রহ কে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যখন আল্লামা আসাদ মাদানী সরাসরি অবস্থান নেন, তখন পাকিস্তানের আলেমদের এক জামাত মুসলিম রাষ্ট ভাঙ্গার অভিযোগ ও হিন্দুদের দালাল বলে সরাসরি কাফের ফতোয়া দেয়া হয়। দৈনিক সংগ্রামে তাদের বিবৃতি ছাপা হয়।


ইতিহাস অামাদের যে চমকপ্রদ তথ্যটি দিচ্ছে তা হলো, মানুষ এসব ফতোয়াবাজদের মনে রাখেনি। কিন্তু ফতোয়ার শিকার ব্যক্তিগণের নাম ইতিহাসের পাতায় জ্বল জ্বল করছে। শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী রহ. মাওলানা কাসেম নানুতাবি রহ. মাওলানা স্যায়িদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি রহ. অাল্লামা ইকবাল রহ. মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, মাওলানা জামাল উদ্দিন আফহানী রহসহ অসংখ্য যুগের নকীবদের উপর উপমহাদেশে সময়ে সময়ে ভয়ংকর কুফরি ফতোয়া আরোপিত হয়েছে। তাদের উপর কে বা কোন কোন প্রতিক্রিয়াশীল ওলামা ফতোয়া দিয়েছে সেটি অাজ অার কেউ মনে রাখেনি।

আরেক ভাবে বললে, যাদের নামই ইতিহাসে পরবর্তীতে সোনালী কালিতে লেখা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই এই পরিবেশ মোকাবেলা করেছিলেন। হুজুগী ফতোয়া আর নানান সমালোচনার কঠিন পাহাড় অতিক্রম করে তারা অমর হয়েছেন। ইমাম বুখারী রহ. তো শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্ তাআলার কাছে যাওয়ার আর্জী পেশ করেছেন। মিশকাতের শরাহ মিরকাতুল মাফাতিহের মাকতাবায়ে রশীদিয়া সংস্করনে ইমাম বুখারীর জীবনী দেয়া আছে। সংক্ষেপে এতো সুন্দর আলোচনা আর দেখিনি। পড়ে দেখুন, চোখ দিয়ে অঝোর ধারার কান্না বের হবে।

এভাবেই যুগে যুগে এসবই ঘটেছে। এবং ঘটবে। ফতোয়াবাজরা হারিয়ে যাবেন যুগের অন্তলোকে। আর চিন্তাশীল যুগশেষ্ট মনীষা গন যাদের বিরোধীধীতা করা হয়েছিল, নানান বাহানা আর ঘায়েল করার ফতোয়া নামক হাতিয়ার ব্যবহার করে, তারাই ইতিহাসে অমর হয়ে রবেন যুগ যুগান্তরে। আকাবিরদের ইজ্জত হননের নষ্ট খেলায় মেতে উঠেছিল স্বগোত্রের লোকজন তারাই একদিন ঘৃনীত হয়ছে ইতিহাসের কাটগড়ায়। আর যারা স্রোতের সাইক্লোন মোকাবিলায় পাহারসম ধৈর্য্য নিয়ে তাদের আনুগত্য করে গেছেন শত আক্রমনের মোকাবিলায় তাদেরকেই আজ শ্রদ্ধা করা হয়, শ্রদ্ধা করবে আগামি পৃথিবী

কুতবে আলম শায়খুল ইসলাম মাওলানা সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর উপর দীর্ঘ সময় আলেমদের একটি বড় জামাতের পক্ষ থেকে এমন কঠিন নির্যাতন ও সমালোচনা গেছে যে, যা পাঠ করলে গা শিউরে উঠে। হযরত মাদানী রহ.কে পুড়িয়ে মারার জন্য মুসলীম লীগের কর্মিরা ট্রেনে তার কামরায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। আল্লাহর কুদরতে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। রাস্তায় একদল পাকিস্তানপন্থি আলেম শাইখুল ইসলাম মাদানী রহ. এর পাগড়ী টেনে খুলে সেই সময়েই যখন তাঁর গায়ে হাত তোলা হচ্ছিল, তখন তাঁর খাদেম আঘাতগুলো নিজের গায়ে নিচ্ছিলেন। তাঁকে রক্ষা করতে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করছিলেন। ঘটনাটি প্রায় প্রতিটি জীবনীতেই আলোচনায় এসেছে।

এখন আপনার সিদ্ধান্ত আপনার হাতে, নিজেকে ইতিহাসের পাতায় কোনদলে দেখতে চান? যুগে যুগে ফতোয়া প্রদানকারে আকাবিরদের ঘায়েল কারার হীন চেষ্টাকারীদের দলে? যখন কুরআন হাদিসের অসংখ্য দলীল আর কিতাব লিখে একজন না- সীহুন আমীন কে আঘাত করা হচ্ছিল, পাগড়ী টেনে নেয়াদের দলে , না তাঁর রক্ষাকারীদের দলে?
সিদ্ধান্ত আপনার…

সিদ্ধান্ত আপনার হাতে...

Advertisements

Leave a Reply