নিযামুদ্দীন মার্কাজের অন্দরমহল-২

লেখকঃ সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ।

আজ আমি আপনাদের নিযামুদ্দীন মার্কাযের ইতিহাসে প্রথম বিদ্রোহের ঘটনা এবং এর কারন ও মার্কাজ থেকে বের হয়ে যাওয়া বুজুর্গদের সর্বশেষ পরিনতির কিয়াদাংশ আপনাদের সামনে তুলে ধরব ইনশাল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা নবীওয়ালা তার এই মোবারক মেহনতকে দুনিয়াতে দু’বারা জিন্দা করার জন্য এই নিযামুদ্দীনের মার্কাজকে কবুল করেছেন। সারা দুনিয়ার কোনায় কোনায় এই মার্কাজের দ্বীন প্রতিষ্ঠার কুরবানী আল্লাহ পাকই নিজ কুদরতদ্বারা নিয়েছেন। হাজার হাজার আল্লাহর মকবুল ওলী, আর লক্ষ কোটি জান্দাদিল মুবাল্লীগদের মোজাহাদা আর চোঁখের পানি রয়েছে এই বাংলাওয়ালী মার্কাজকে ঘিরে।

একবার মসজিদ কাজ চলছিল, বড় হযরতজী ইলিয়াছ রহঃ এসে বললেন, এদিকে এভাবে কর, এদিকে জানালা দাও, এদিকে আরবের জামাত থাকবে, এদিকে আমেরিকার জামাতের সাথীরা, এদিকে ইউরোপ এশিয়ার জামাত, এদিকে রাশিয়ার জামাত। এভাবে বলতে থাকলেন, হযরত মাযাজী মেহরাব রহঃ সাথে ছিলেন, হযরতজীর সাথে ছিলেন, তিনি মনে মনে বললেন, দাওয়াতের কাজ করতে করতে হযরতজীর মাথায় সমস্যা হল কি না? এখনো দিল্লী শহরে কাজ উঠাতে পারি নাই। আর তিনি বলছেন সারা পৃথিবীর কথা। মুখ খুলে বললেন, হযরতজী, এখনোতো ভারতেই কাজ বুঝানো যাচ্ছে না। সারা পৃথিবীর জামাত কিভাবে আসবে। বড় হযরতজী বললেন, তোমাদের জামানাতেই সারা পৃথিবীর মানুষ এখানে আসবে। এভাবে এই কাজের জন্য এই স্থানকে আল্লাহ কবুল করেছেন।

আরেকদিন, নিযামুদ্দীন মার্কাজে প্রচণ্ড অভাব দেখা দিল। কয়েকদিন ধরে খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই। সাথীরা পেরেশান। হযরতজী রহঃ নামাজে দাড়ালেন। সেজদাতে দীর্ঘ সময় কাটালেন। এর ভেতরই দিল্লী শহরের এক বড় ব্যবসায়ী গাড়ি ভরে খাবার নিয়ে এলেন। হযরতজী সেজদা থেকে উঠে বললেন, ইনশাল্লাহ আর কখনো এই মার্কাজে খাবারের অভাব হবে না। সারা দুনিয়ার মেহমানদের মেহমানদারী করানো হবে নিযামুদ্দীনের মার্কাজ থেকে।

হ্যা, প্রিয় দুস্থ বুজুর্গ হযরতজী রহঃ এই দুটি কথার প্রতিফলন পরবর্তিতে গোটা দুনিয়া আজ পর্যন্ত প্রতক্ষ্য করেছে। তিনি আল্লাহর কাছ থেকে এই কাজকে কবুল করিয়ে নিয়েছিলেন। তেমনিভাবে তার রাব্বে করিমের দরবার থেকে কবুল করিয়ে নিয়েছিলেন, এই কাজের সূতিকাগার বা মূল কেন্দ্র নিযামুদ্দীনের মার্কাজকে।

এই মকবুল মার্কাজকে ফেৎনার এটেমবোমা দিয়ে কেউ উড়িয়ে দিতে পারবে না ইনশাল্লাহ। ইতিহাস তাই বলে। বারবার এটাই প্রমানিত হয়েছে। নিযামুদ্দীন থেকে মেহনতকারী মুরুব্বীদের বিদ্রোহী ও বিচ্যুতি, নতুন কোন ঘটনা নয়। এর আগে এর চেয়ে বড় বড় ধাক্কা এসেছে। বড়বড় বিদ্রোহ আর গন্ডগুল হয়েছে। ফেৎনার স্লাইকোন বয়ে গেছে। মার্কাজ মার্কাজের স্থানে আপন গতিতেই আছে, যারা শেকড় থেকে, মূল হতে বিচ্যুত হয়েছেন, তারা হারিয়ে গেছেন। যারা ফেৎনার গুটি হয়েছেন, তারা কাজ থেকে বিচ্যুতি হয়েছেন। এমন কি কেউ কেউ দ্বীন থেকে পথ হারিয়েছেন।

আগেই বলেছিলাম, নিযামুদ্দীনের মার্কাজে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ চালু হওয়ার পর যিনি হযরতজী মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াস নাওয়ারল্লাহু মারকাদাহুর পাশে এসে দাড়িযেছিলেন এলেম ও হেকমতের বিশাল ভান্ডার নিয়ে তিনি হলেন, ইলিয়িস রহ প্রথম খলিফা ও প্রধান সহচর মাওলানা এহতেশামুল হাসান কান্ধালবী!

আরব বিশ্বে দাওয়াতের কাজের সূচনা তাঁর মাধ্যমেই। এমনকী বাদশা আব্দুল আজিজ বিন সউদের যে চিঠি এসেছিল দুই হয়রতের নামে সে চিঠির উপর প্রথম এহতেশামুল হাসানের নাম পরে মাওলানা ইলিয়াস রহ এর নাম লিখা ছিল। ফাজায়েলে আমলের পেছনে একটি পুস্তাকা সংযুক্ত আছে, “পুস্তিকা ওয়াহেদে এলাজ”। যা প্রতিদিন তাবলীগের সাথীদের উসুলি কিতাব হিসাবে ঘরে, মসজিদে, সফরে পাঠ করা হয়ে থাকে। এই কিতাবটি মাওলানা এহতাশামুল হাসান এর লেখা। তাবলীগের ছয় নাম্বারের লেখকও তিনি। কোন কোন মাসায়েখ বলতেন মাওলানা এনামুল হাসান, দেহলভী হযরতের আত্মার অনুবাদক। দেশে বিদেশের বড়বড় জোড় আর ইজতেমাতে আকর্ষনীয় বয়ান ও তাশকীল করতেন। আকাবিরগন তাকে বলতেন ‘কাতেবে ইলিয়াস রহ”। কেউ কেউ বলতেন তরজুমানে হযরতজী।

নিযামুদ্দীন মার্কাজে এই ঘরের বাতি থেকেই প্রথম আগুন লাগে। নিযামুদ্দীন মার্কাজে প্রথম আমিরের দোষ চর্চা এই মাওলানা এহতেশামুল হাসানই চালু করেন। নিযামুদ্দীন মার্কাজে প্রথম বিদ্রোহ তিনিই স্বদলবলে করেন। নিযামুদ্দীন মার্কাজে তিনিই সর্ব প্রথম বের হয়ে তাবলীগের বিরোদ্ধে কিতাব লিখেন। তার শেষ পরিণিতি কী হয়েছিল তা দীর্ঘ ইতিহাস। নবিজীর কাতেবে ওহীর মতোই কাতেবে ইলিয়াস রহ খ্যাত এই মাওলানার পরের ঘটনাগুলো অনেক ব্যাথা আর কান্নার করুণ কাহিনী। (বিস্তারিত পড়ুন, তাবলীগ জামাত আওর মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী” গ্রন্থে।

পরবর্তিতে দারুল উলুম দেওবন্দকে জড়িয়ে, উলামাদের নাম ব্যবহার করে মাওলানা এহতেশামুল হাসান এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করারর চেষ্টা করেন, যার ফলে এই ফেৎনা দমনে, ফকীহুল মিল্লাত মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ কলম ধরতে বাধ্য হন। এবিষয়ে কিতাব লিখে জবাব দেন, শায়খুল হাদীস জাকারিয়া রহ. । মাওলানা এহতেশামুল হাসান পরে, দেওবন্দকে ব্যবহার করে ফেৎনা তৈরির ভয়াবহ চেষ্টা করেন। দেওবন্দের মুহতামিম সাহেবের নাম ব্যবহার করে, “তাবলীগ জাতি ধ্বংসের কারন” নামে একটি পুস্তিকাও তিনি প্রকাশ করেন।

হযরতজীর ইন্তেকালের পর দ্বীতিয় হযরতজী মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ রহ. কে আমীর বানানো হল এবং দ্বীতিয় হযরতজীর হাতে যখন সবাই বাইয়াত গ্রহন করলেন। তখন এই কম বয়েসের যুবক আমীরের এতেয়াতকে মেনে নিতে পারলেন না, মাওলানা এহতেশামুল হাসান রহ ও তার অনুসারী মার্কাজের কতিপয় মুকীম। তারা নানান অযুহাত আর অভিযোগ এনে মার্কাজ ত্যাগ করেন। তখন মাওলানা এহতেশামুল হাসান রহ ব্যাপকভাবে উলামাদের মাঝে গাশত করে এই কথা প্রচার করতে থাকেন, যে হযরতজী যে নেহেজের উপর তাবলীগের কাজ শুরু করেছিলেন, সেই ধারা ও নেহেজের উপর এখন মাওলানা ইউসুফের তাবলীগ নেই। তিনি কিছু উলামাদের নিয়ে “সহী নেহেজে তাবলীগ!” নামে প্রথমে বিকল্প কাজ করার চেষ্টা করেন।

পরে সুবিধা করতে না পেরে, মাহরুম হয়ে, মওদুদীর প্রতিষ্টিত “জামাতে ইসলামী” সংগঠনে তাবলীগের মহান মুরুব্বি (যাকে তরজুমানে হযরতজী বলা হত) মাওলানা এহতেশামুল কান্ধালবী হাসান যোগ দান করেন। পরবর্তিতে এত বড় হাস্তি যিনি তাবলীগের উসুলী কিতাব লিখেছেন, যা আজো গোটা দুনিয়াতে পাঠ হয়, তিনিই জামাতে ইসলামীর সংবিধান বা গঠনতন্ত্র প্রণায়ন করেন। ইন্নালিল্লাহ…

মাওলানা এহতেশামুল হাসান ফেৎনার জবাব দিতে গিয়ে শায়খুল হাদীস রহ. দীর্ঘ আলোচনা করেছেন এর চুম্বকাংশ নিম্নে তুলে ধরলাম,

অনেক বড় লেখার সার সংক্ষেপ তুলে দেয়া হল। যা আপনি শায়খুল হাদীস রহ লেখা “জামাতে তাবলীগ পার এতেরাজাতকে জওয়াবাত” গ্রন্থে বিস্তারিত দেখতে পারেন। শায়খুল হাদীস রহ এহতেশামুল হাসান রহ এর আপত্তি এখনকার তাবলীগ জামাত হযরতজী ইলিয়াস রহ. এর ধারার ওপর নেই, তাই এখন তা ভুলে পরিণত হয়েছে এর জবাবে লিখেছেন,

“আরেকটি বোকা ও মূর্খের মতো অভিযোগ শুনা যায়, এখনকার তাবলীগ জামাত হযরতজী ইলিয়াস রহ. এর ধারার ওপর নেই, তাই এখন তা ভুলে পরিণত হয়েছে। এখন এই কাজে সময় দিয়ে কোন উপকার আসে না”। ‘এ সমালোচকদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা- বর্তমান দারুল উলুম দেওবন্দ কি সেই ধারার উপর টিকে আছে, যা হযরত নানুতাবি আর মাওলানা ইয়াকুব রহ. এর যুগে ছিলো? এখানকার জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ কি সেই অবস্থায় টিকে আছে, যা হযরত শায়খুল হিন্দ ও হযরত কেফায়তুল্লাহ রহ. সাহেবের যুগে ছিল?

রাসুল সা. এর প্রসিদ্ধ হাদিস “খাইরুল কুরুন” আমার যুগই সবচেয়ে সেরা যুগ, তারপর পরের যুগ,তারপর পরের যুগ। সেই সোনালী তিন যুগ থেকে সময় যত দুরে যাচ্ছে ইসলামের সেই সৌন্দর্যরূপ ও শান্তি ততোই কমে যাচ্ছে। তাই বলে কি গোটা ইমলামকে ভুল বলে দিতে হবে বা ছেড়ে দিতে হবে? এটাতো শয়তানের একটি ধোকা হবে।

তিনি আরো লিখেছেন, দু’একজন ছাড়া মাদরাসা বিদ্ধেষীদের সবাই স্বার্থপর। মাদরাসা কতৃপক্ষের উপর অভিযোগ আমারো আছে। কিন্তু মাদরাসা বিদ্ধেষীদের অভিযোগ, যে নিয়ম ও প্রদ্ধতিতে সেটা মারত্নক ভুল। তারা বরং ভুল ধরার নামে মাদরাসার শেকড় উপরে ফেলার ও এই প্রতিষ্টানে হস্তক্ষেপ করে একে নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করে থাকে। আমার অভিযোগ মাদরাসা পরিচালনার নিয়মের উপর আর বিদ্ধেষীদের বিরোধ হল তারা কোন বিষয়ে সঠিক তথ্য না খোঁজেই সমালোচনা, বিরোধ ও অপপ্রচার শুরে করে দিয়ে হাঙ্গামা বাধাতে চায়। এদের দুষমনি কিন্তু মূলত মাদরাসাচালকদের সাথে নয় বরং মাদরাসার সাথে। তাদের বিরোধীতার ধরনে সেটাই প্রমান করে থাকে। শত্রুতার ও তো সীমা থাকা চাই।”

শায়খুল হাদীস রহ দীর্ঘ আলোচনার পর আরো লিখেছেন, একথা মনে রাখতে হবে,এ বড় আলোচনার দিয়ে আমার একথা মোটেও উদ্দেশ্য নয়, আমি তাবলীগওয়ালাদের নির্ভুল বলছি বা তাদের ভুলগুলোকে দেখছি না আর তাদের অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করছি। এর আগে আমি নানান অনুচ্ছেদে আমি একথা বেশ কয়েকবার বলে এসেছি, কোন দল বা প্রতিষ্ঠানই ভুলের ওপরে নয়।

এবড় আলোচনা দিয়ে আমার উদ্দেশ্য হলো, এসমালোচনা দিয়ে যদি সত্যি সংশোধনই নিয়ত হয়ে থাকে তাহলে সমালোচনা সংশোধনের নিয়মে হওয়া চাই। সে নিয়ম প্রদ্ধতি ও ত্বরিকায় করা চাই। নতুবা নিজেরই ক্ষতি হবে। আর আল্লাহ তার দ্বীনের কাজকে তিনিই তার কুদরতদ্বারা হেফাজত করবেন।

আগামী পর্বে পড়ুন, “নিযামুদ্দীন মার্কাজের প্রথম বিদ্রোহীদের শেষ পরিনিতি”।

Advertisements

Leave a Reply