তাবলীগ বনাম বাংলাদেশের ওলামা আস-সু।

শূরা সুন্নত নয়। আমীর সুন্নত। ইসলামের ইতিহাসে কখনোই শূরা বলতে কিছু ছিল না। হযরত ওমর রদিয়াল্লহু আনহু কোন শূরা বানাননি। তিনি এক জামাত বানিয়েছিলেন পরবর্তী আমীর নিযুক্ত করার জন্য। ঐদিন গুলোতে খেলাফতের দায়িত্ব ঐ জামাতের হাতে ছিল না। ছিল সুহাইব রদিয়াল্লহু আনহুর হাতে। ইসলামে তাই ভারপ্রাপ্ত আমীরের সুযোগ আছে কিন্তু শূরার সুযোগ নেই।

হজরত জী এনামুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহি কোন আলমী শূরা বানাননি। বানিয়ে ছিলেন পরবর্তী আমীর নিযুক্ত করার জামাত, ঠিক হযরত ওমর রদিয়াল্লহু আনহুর অনুকরণে। কিন্তু দুর্ভাগ্য জনক ভাবে ওই জামাত কোন ঐক্যমতে পৌঁছতে পারেনি বলেই উম্মতের একতার স্বার্থে ফয়সাল শূরা বানানো হয়। এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। গত প্রায় বিশ বছর ধরেই এই কাজ মাওলানা সাদ সাহেবের বলতে গেলে প্রায় একক নেতৃত্বেই চলছে। তাই এখন আলমী শূরার প্রয়োজন নেই। সাদ সাহেব ইন্তেকাল করলে তখন এই ব্যাপারে মাসোয়ারা হতে পারে, কিন্তু সেটা অবশ্যই হতে হবে নিজামুদ্দিনে, যেমনটা আগের তিনবার হয়েছিল। তখনই বলা যাবে যে পূর্ববর্তী আকাবিরদের অনুসরণে কাজ চলছে। এই মাসোয়ারা নিজামুদ্দিন বাদে অন্য কোথাও হলে বলতে হবে পূর্ববর্তী আকাবিরদের থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে, যেমনটা বর্তমান আলমী শুরারা করেছেন।

এখানে লক্ষণীয় হজরত জী এনামুল হাসান যে জামাত বানিয়ে ছিলেন সেটা না বানালেও পারতেন কেননা সেখানে ওমর পালানপুরী, সাঈদ আহমাদ খান সহ নিজামুদ্দিনের পুরাতন সব মুরুব্বীরা ছিলেন। যাঁদের কোন একজনকে জিম্মাদার বানালে কেউ এশকাল করত না। এরপরও তিনি জামাত বানিয়েছেন। অবাক করার ব্যাপার হল প্রায় অসামঞ্জস্য ভাবে মাওলানা সাদ সাহেবকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। মাওলানা সাদ সব তখন একেবারেই নবীন। অল্প করেক বছর আগে পড়াশুনা শেষ করে সাল দিয়েছেন। তাঁর কাছাকাছি ছিলেন মাওলানা জুবায়েরুল হাসান সাব। তিনিও তাঁর চেয়ে এক যুগ বড় ছিলেন। বাকিরা সকলেই ছিলেন অনেক পুরাতন এবং জিম্মাদার সাথী। তাঁরা সকলেই আমীর হবার যোগ্য ছিলেন। বেমানান বলতে মাওলানা সাদ। এত নবীন হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে রাখা হয়েছিল। মজার ব্যাপার হল আজ যাঁরা নিজেদের সাদ সাহেব এবং তাঁর বাবার উস্তাদ দাবি করছেন তাঁরা কেউ সেই জামাতে ছিলেন না। কারণ হজরত জী তাঁদের জিম্মাদার হবার ব্যাপারে যোগ্য মনেই করেন নি। এতেই বুঝা যায় আসলে হজরত জী এনামুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহি এর মানসা কি ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনিই ফয়সাল হন এবং তা এই কচি বয়সেই। মাওলানা ইজহারুল হাসান সাব যদিও জিম্মাদার এবং ভারী সাথী ছিলেন কিন্তু মাওলানা যাকারিয়া রহমাতুল্লাহ আলাইহি এর এক চিঠিতে জানা যায় তিনি ছিলেন মূলতঃ মাওলানা সাদ সাহেবের অভিভাবক হিসেবে তাঁকে জিম্মাদারী শিক্ষা দেয়ার জন্য। কিছুদিন আগে যাকারিয়া রহমাতুল্লাহ আলাইহি এর শেষ জীবিত খলীফা চিঠির ব্যাপারটি নিশ্চিৎ করেছেন। অর্থাৎ যাকারিয়া রহমাতুল্লাহ আলাইহির মানসাও ছিল মাওলানা সাদ। আল্লাহর কি শান মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহি ২ বছরের মাথায় ইন্তেকাল করেন। এরপর মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেবও প্রায় নিষ্ক্রিয় ছিলেন। কারণ তিনি খুব ভালোভাবেই আকাবিরদের মানসা জানতেন। এবং তিনি তাঁর এই প্রায় নিষ্ক্রিয়তার দ্বারা মাওলানা সাদকে আমীর হিসাবে রায় দিয়েছেন। জুবায়ের সাহেব ফয়সাল হিসাবে জীবিত থাকলেও মাওলানা সাদ সাহেবই কার্যত একক ভাবে জিম্মাদারী আদায় করতেন।

তিন ফয়সালের হেকমত তো এটাই ছিল যে বারি বারি করে একেক জন ফয়সাল হবেন। কিন্তু ফয়সাল এই তিন জনের একজনই হবেন। অন্য কেউ নয়। এরপর যখন তিনজন থেকে দুইজন হলেন তখনও দুইজনই ফয়সাল, অন্য কেউ নয়। এখন একজন আছেন। তিনিই ফয়সাল। নতুন কোন জিম্মাদার বা ফয়সাল না, শূরা হলে তাঁর ফয়সালাতেই হতে হবে এবং সেটা নিজামুদ্দিনে। কিন্তু এই আলমী শূরার ফয়সালাতে মাওলানা সাদ ছিলেন না। বরং ভারত পাকিস্তানের কিছু সাথী নিজেরা কিছু ফয়সালা করে সাদ সাহেবের কাছে পেশ করেছেন। এখন মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য ফেতনা করছেন, ফতোয়া নাটক করছেন।

তাই বর্তমান আলমী শূরা সুন্নত সম্মত নয়, উসূল সম্মত নয় এবং আকাবিরদের দেখানো পথেও নয় তাঁদের মানসা মতোও নয়। বরং এটা পুরাই ফিৎনা। আজ পাকিস্তান থেকে কিছু লোক এসে বললো, আমরা আলমী শূরা। কাল যে আরব বা আফ্রিকা থেকে কেউ নতুন আলমী শূরা দাবি করবে না তার কি গ্যারান্টি আছে!

উল্লেখ্য মাওলানা সাদ নিজেকে আমীর হিসাবে ঘোষণা করেন নি, যেমনটা ফেতনাবাজ ও বিদআতী আলমী শূরাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। বরং ২০১৭ সালে টঙ্গী এস্তেমাতে শতাধিক দেশের জিম্মাদার সাথীদের উপস্থিতিতে তাঁকে জিম্মাদার হিসাবে ফয়সালা করা হয়েছে। তখন কোন রায় এর বিরুদ্ধে আসেনি। এই ব্যাপারে একটাও চিঠিও মাওলানা ফারুক সাহেবের দস্তখত সহ সকল দেশের জিম্মাদার হজরত গনের কাছে পাঠানো হয়েছে। মাসোয়ারা হয়ে গেছে, তখন রায় দেয়ার সুযোগ ছিল। এখন আর নতুন করে রায় দেয়ার সুযোগ নেই। এখন যা হচ্ছে তা বিদ্রোহ। পুরাপুরি ফিৎনা।

বর্তমান সময়ে হজরত মাওঃ সাদ কান্দালভী দাঃ বাঃ সাহেব কে নিয়ে আমাদের দেশের স্বনামধন্য কিছু সংখ্যক উলামা এক কঠিন রোগে আক্রান্ত। নিঃসন্দেহে হজরত মৌলানা সাদ কান্দালভী দাঃ বাঃ কে আল্লাহ সুবহানাহু তালা আলমী মার্কেজের আলমী জিম্মাদার বানিয়েছেন এটা কিছু সংখকের সহ্য হচ্চে না।

আল্লাহর রাসূল(সঃ), খোলাফায়ে রাশেদীনদের সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামদের তরিকাকে বিভেদ থেকে বাঁচার মানদন্ড বলেছেন। অথচ তাদের মাঝেও মতপার্থক্য হয়েছে, কিন্তু এ কারণে বিভেদ হয়নি এবং প্রীতি ও সম্পৃতিও নষ্ট হয়নি। তাদের দীল অভিন্ন ছিল।

ঐ ইখতিলাফ তাদের ইজতিয়ামি জিন্দেগীতে কোন প্রকারের অশান্তি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেনি। দলিল ও ইজতিহাদভিত্তিক মতপার্থক্য বিভেদ বিচ্ছিন্নতা নয়। কিন্তু যদি কেউ ইখতিলাফ কে বিভেদের কারণ বানায় তাহলে সেটা তার অজ্ঞতা যা সংশোধন করা ফরজ।

আমাদের দেশের কতিপয় রাজনৈতিক আলেম কথায় কথায় মিথ্যাচার, গীবত ও শেকায়েত করে চলেছেন। তাদের সীমাহীন মিথ্যাচার ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ ও তার ফতোয়াকে কেন্দ্র করে। অথচ দেওবন্দ তার ফতোয়ায় স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, তাবলীগ জামাতের ভিতরকার বিষয়ে তাদের কোন কিছু বলার নেই। এমনকি সারা ভারত জুড়ে নিযামুদ্দিনের হযরতগন একের পর এক এস্তেমা, জোড় সহ তাবলীগের নিয়মিত রুটিন মাফিক আমল করে গেলেও কোথাও শোনা যায়নি দেওবন্দ কোন টু শব্দ করেছে। কোথাও মারকাজ দখলের চেষ্টা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। দেওবন্দের কোন আলেম ওয়ার্ল্ড আমীরকে নিয়ে সামান্যতম কটু বাক্য ব্যাবহার করেছেন শোনা যায়নি। খোদ ভারতেই তাবলীগের ভিতরকার বিষয় নিয়ে যেখানে দেওবন্দের মাথা ব্যাথা নেই, সেখানে বাংলাদেশের কতিপয় ওলামা নামধারী দুই পা ওয়ালা জানোয়ার দেওবন্দের নাম বিক্রি করে যারা পেটপূজায় লিপ্ত, এদের হুংকার ও গর্জনে বাংলার বাতাস আজ দূষিত প্রায়। অবৈধ জাকাত ফিতরা খাওয়া অবৈধ মানষিকতার লোকজনের মাথা থেকে কখনো সঠিক আচারন ও সঠিক কাজ করা সম্ভব নয়।

মওলানা সাদ সাহেব দাঃবাঃ বলেছেন, “পারিশ্রমিক নিয়ে দীন শেখানো দীন বিক্রির নামান্তর। কোর’আনে কারীম শিখিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণকারীর আগে ব্যভিচারীরা জান্নাতে যাবে।”

কোনো মাদ্রাসার লোকেরা এই ফতোয়া মেনে নেবে না সেটাই তো স্বাভাবিক। কারণ ওয়াজ করে, কোরা’আন খতম দিয়ে, নামাজ পড়িয়ে অর্থ গ্রহণ করাটাই তো তাদের পেশা। ধর্মের উপর আঘাত সহ্য করা যায় কিন্তু জীবিকার উপর আঘাত? কখনো নয়!

আমার ধারণা, ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহ আর রসুলের বক্তব্য মাদ্রাসাওয়ালাদের তুলনায় অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। আল্লাহ কী বলেছেন এ বিষয়ে?

আল্লাহ বলেন, যারা আমার নাজিলকৃত আয়াত গোপন করে, তার বিনিময়ে পার্থিব মূল্য হাসিল করে তারা তাদের পেটে আগুন ছাড়া কিছুই পুরে না। (সুরা বাকারা ১৭৪)

আল্লাহর রসুল বলেন, ‘তোমরা কোরআন পড়ো এবং তার ওপর আমল করো। আর তাতে সীমালংঘন করো না, তার ব্যাপারে শৈথিল্য করো না, তার বিনিময় খেয়ো না এবং তাকে নিয়ে রিয়া করো না।’ -হজরত আবদুর রহমান ইবনে শিবল (রা.) হতে মুসনাদে আহমাদ: ১৫৫৬৮, সুনানে বায়হাকি: ২৬২৪, মুজামে তাবরানি আওসাত: ২৫৭৪।

তেমনি অপর হাদিসে এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, হজরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি জনৈক পাঠকারীর নিকট দিয়ে অতিক্রম করলেন- যে কোরআন পড়ছিলো। অতঃপর সে (মানুষের নিকট) চাইলো। তখন তিনি ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়লেন। অতঃপর তাকে বললেন, আমি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি কোরআন পড়ে, তার উচিত আল্লাহর কাছে তার বিনিময় চাওয়া। বস্তুত এমন কিছু দল আসবে যারা কোরআন পড়বে; যার বিনিময় মানুষের নিকট চাবে (তাদের একাজ অবাঞ্ছিত)।’ –জামে তিরমিজি: ২৯১৭, মুসনাদে আহমাদ: ১৯৯৫৮।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘অচিরেই মানুষের ওপর এমন কাল আসবে; যে সময় কোরআন শোনানোর বিনিময় চাওয়া হবে। সুতরাং যখন তোমাদের কাছে তারা চাইবে, তখন তোমরা তাদেরকে দেবে না।’ –আত তাওজিহ লি-শরহিল জামিইস সহিহ: ১৭৪ পৃ.

যারাই ধর্মব্যবসার গোমর ফাঁক করে দেবে মাদ্রাসাওয়ালারা তাদের বিরুদ্ধেই গর্জে উঠবে।

Advertisements

Leave a Reply