মাও: সাদ সাহেব এর বিরুদ্ধে দেওবন্দের ফতোয়া ও দেশী ব্রান্ড অতি উৎসাহী ওলামাদের ভূমিকা।

লেখক : শামীম হামিদী।

দেশের কয়েকজন সম্মানিত মুফতী মাওলানা সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছেন। ফতোয়ার আক্ষরিক অর্থ মতামত। যে কেউ যে কোন ব্যাপারে মতামত দেয়ার অধিকার রাখেন। সেটা যুক্তি সঙ্গত বা প্রামাণ্য দলীল ভিত্তিক হলে আরো ভালো। আমরা তাঁদের মতামত স্বাগত জানাই। তাঁদের মতামত প্রকাশের অধিকার সম্মান করি। ব্যক্তিগত ভাবেও তাঁদের প্রত্যেককে সম্মান করি। একই সাথে মনে করি উম্মতের একজন সদস্য হিসাবে আমিও আমার অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু মতামত দেয়ার অধিকার রাখি।

এসব ফতোয়া আমি পড়িনি। পড়ার প্রয়োজনও মনে করি না। এর আগেও একজন সম্মানিত মুফতি সাহেবের নামের বিলিকৃত একটি লিফলেট বিশ্লেষণ করে দেখেছিলাম কিভাবে প্রতি লাইনে লাইনে ভুল, আংশিক, বিকৃত, অতিরঞ্জন তথ্য এবং ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছিল। সমূহ সম্ভাবনা বর্তমান ফতোয়াগুলোও একই রকমের হবে। আগেও দেখেছি সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে যাঁরা বলছেন তাঁদের তথ্যের উৎস হল আব্দুল্লাহ এবং উবাই দুল্লাহ ফারুক নামে দুইজনের মিথ্যাচার, ছলচাতুরি ও বিদ্বেষপূর্ন কিছু চটি বই। বোধ করি সম্মানিত মুফতি সাহেবরা এই দুই জনের তথ্যের ভিত্তিতেই তাঁদের ফতোয়া তথা মতামত ব্যক্ত করেছেন। সেক্ষেত্রে আমি তাঁদের মাজুর মনে করি। কেননা উপরের দুইজন যে ভয়াবহ মিথ্যাচার করেছেন তাতে যে প্রকৃত সত্য জানে না তার বিভ্রান্ত হবারই কথা। এমনকি আমি নিজেও যদি না জানতাম, আমিও বিভ্রান্ত হতাম।

একই সাথে তাঁদের প্রদত্ত মতামতের আরেকটি ভিত্তি হল দেওবন্দের একটি ফতোয়া। দেওবন্দে মাওলানা সাদ সাহেবের অসংখ্য বয়ানের কাটপিস পাঠানো হয়। সেই কাটপিসগুলো থেকে মাত্র আটটি বিষয়ে আপত্তি করা যায় বলে দেওবন্দ মনে করেছেন। বাকি গুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। এরপরও ‘দেওবন্দ’ নামকে সামনে রেখে ঐ প্রত্যাখ্যাত অভিযোগগুলোও বাজারে চালানো হচ্ছে, নতুন নতুন অভিযোগ ঢালা হচ্ছে। দেওবন্দের ঐ ফতোয়াতে অত্যন্ত সম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এবং সংশোধনের ভাষা ব্যবহার করেছেন যাতে পরিষ্কার হয়ে উঠে যে এই ফতোয়া নিতান্তই সংশোধন বা ইসলাহমূলক। পরবর্তীতে দেওবন্দের আচরণও শান্ত এবং সম্মানজনক। কোথাও তাঁকে গোমরাহ, বাতিলের দালাল, আমীর হিসাবে ইতায়াতের অযোগ্য বলা হয়নি। কোথাও তাঁর বিরুদ্ধে কোন উস্কানি দেয়া হয়নি। তাঁকে কোথাও বাধা দেয়া হয়নি, বয়কট করা হয়নি, ঢুকতে না দেয়ার শপথ করা হয়নি, তাঁর অনুসারীদেরও বাতিল বলা হয়নি। এমনকি আমরা ভারতীয় বিভিন্ন আলেমের মুখে শুনেছি এসব নিয়ে আলোচনাও নেই। সাধারণ মানুষ জানেও না। বরং তাঁকে রুজু করতে বলা হয়েছে। এবং তিনি দেওবন্দের শর্ত মেনে রুজু করেছেন। এবং দেওবন্দের আপত্তিকৃত আট বিষয়ে কখনোই কোন কথা বলেন নি। পরবর্তীতে দেওবন্দ আরেকটি অজাহাত নামা প্রকাশ করে যেখানে রুজু কবুল করেছেন বলেই লিখেছেন। এখানে সম্পূর্ণ আট পয়েন্ট উল্লেখ না করে আংশিক করেছেন। এরপর সম্পূর্ণ নতুন কিছু প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন যা মূল ফতোয়াতে ছিল না। এই অংশে রুজুর জন্য বাড়তি কোন শর্ত উল্লেখ করেননি। দেওবন্দ যদি রুজু কবুল নাই করতেন তাহলে দেওবন্দ এখানে রুজুর নতুন শর্ত উল্লেখ করতেন। বরং এই অংশটুকু নিগরানী মূলক নির্দেশনা, সস্নেহ উপদেশ এবং ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক হবার আহ্বান। হতে পারে দেওবন্দ এখনই তাড়াহুড়া করতে চাচ্ছেন না। আরো কিছুদিন নিগরানী ও পর্যবেক্ষণ করবেন। যেখানে দেওবন্দ তাড়াহুড়ো করছেন না, সেখানে আমাদের মুফতী সাহেবদের এত তাড়া কিসের? নাকি তাঁরা আঁচ পাচ্ছেন যে কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করার পরে দেওবন্দ খুব শীঘ্রই রুজু নিঃশর্ত কবুল করার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিবেন, এজন্যই তাড়াহুড়া করছেন।

এই মুফতি সাহেবদের কয়েকজনকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি। আমার জানামতে তাঁরা জীবনে কখনো সাদ সাহেবের একটি বয়ানও পুরোপুরি শুনেন নি। কোন বয়ান না শুনে, শুধু অন্যের শোনা কথার উপরে ফতোয়া বা মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের প্রদত্ত মতামতের কারণে যত মানুষ বিভ্রান্ত হবে এবং যত ফিৎনা হবে এর দায় তাঁদের উপরেই পড়বে।

এরপর আমি কয়েকটি ব্যাপার উল্লেখ করতে চাই। আমি জানি এই কথাগুলো উলামা কেরামদের পছন্দ হবে না। উলামা কেরামদের মুহিব্বীন হিসাবে কথাগুলো আমার নিজেরও পছন্দ নয়। তবুও উল্লেখ করছি যাতে সমস্যা প্রকাশ হয়। সমস্যা প্রকাশ হলেই সমাধানের রাস্তা বেড়িয়ে আছে। সমস্যা নেই নেই করে এড়িয়ে গেলে সমস্যা বেড়েই চলে। এক পর্যায়ে সমাধানের অযোগ্য হয়ে যায়।

বাংলাদেশে এলেমের কোন স্বীকৃত কেন্দ্র তথা মাদারে ইলমী নেই। ভারত তথা উপমহাদেশের মাদারে ইলমী দেওবন্দ। দারুল উলুম করাচি পাকিস্তানে মোটামুটি ভাবে ইলমের মারকাজ হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে। ম্যানচেস্টার মাদ্রাসা পুরা ইউরোপের ইলমের মারকাজ। তাঁরা কোন সমস্যায় পড়লে দেওবন্দের দিকে রুজু হন। এমন ভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, সিরিয়া, সউদী সর্বত্রই মোটামুটি ভাবে কেন্দ্রীয় ইলমী মারকাজ আছে। আমাদের দেশে এমন নেই। হাটহাজারী পুরাতন নাকি জামিয়া ইউনুসিয়া পুরাতন এটা নিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উলামাদের মধ্যে মতানৈক্য। পটিয়া হাটহাজারীকে নিজের মুরুব্বী হিসাবে স্বীকার করতে রাজি নয়। হাতিয়া মাদ্রাসার দাবি ইলমের মূল উদ্দেশ্য সুন্নত জিন্দা হওয়া। হাটহাজারী সুন্নতের এহতেমামের ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক নয়। ঢাকার মাদ্রাসা গুলোরই একই অবস্থা। সবাই নিজেকেই বড় মনে করে। এজন্য এদেশে নিরঙ্কুশ কোন ইলমে মাদারী গড়ে উঠেনি। তাই কোন মাদ্রাসার ফতোয়াকে জাতীয় ফতোয়া বলারও উপায় নেই। বরং আঞ্চলিক কোন মাদ্রাসার ফতোয়া। তাই উলামা কেরামদের কাছে আমার সবিনয় অনুরোধ এদেশে একটি ইলমে মাদারী স্থাপনে আপনারা একমত হউন।

আরেকটি বেদনাদায়ক ব্যাপার হল এদেশের উলামা কেরাম বা মাদ্রাসা গুলোর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। বিদেশের কোন ফতোয়া অথবা সম্পূর্ণ নতুন কোন বিষয়ে ফতোয়া দেওবন্দে যায়, না হয় দক্ষিণ আফ্রিকাতে যায় অথবা আল আজহারে যায়। এই নিয়ে আমাদের উলামা কেরামদের কোন মাথা ব্যাথাও নেই। বরং আমাদের ফতোয়াও দেওবন্দে পাঠানো হয়। আমি দেখেছি ইউরোপে ম্যানচেস্টার মাদ্রাসা এবং ম্যানচেস্টার মাদ্রাসার ফারেগিনদের যেই গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে আমাদের দেশের মাদ্রাসা ও আলেমদের সেই গ্রহণযোগ্যতা নেই। মালয়শিয়াতে আমাদের দেশি অনেক আলেম এমন কি মুফতিও কাজ করেন। আমাদের দেশী লোকজনও দেখেছি তাঁদের থেকে মাসয়ালা না নিয়ে ভারতীয় বা পাকিস্তানি আলেমদের থেকে মাসয়ালা নেন। এমনকি বাংলাদেশে থেকেও অনেককে দেখেছি ভারতে ফোন করে মাসয়ালা নেন। বাংলাদেশ থেকে প্রচুর ছাত্র তরুণ আলেম ভারত পাকিস্তান যান ফজিলত হাসিল করতে। কিন্তু বাংলাদেশে কয়জন আসে? কিছু আসে বৈকি। তবে খুবই কম। বার্মা থেকে আগে কিছু আসতো। আর যারা আসে বেশির ভাগই বাংলাদেশী বংশদ্ভূত। এক কথায় যা বিদেশি আসে তা উল্লেখ করার মত নয়।

এমনকি সূলুকের লাইনেও বাংলাদেশের অবস্থান আরো করুন। এদেশের বড় বড় শায়েখরাও দেখেছি বিদেশী কম বয়স্ক শায়েখদের হাতে বায়আত হন। ভারত পাকিস্তান দক্ষিণ আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের কোন শায়েখের বায়আত। আমাদের দেশের শায়েখদের বিদেশী মুরিদান কয়জন আছে?

তবে আলহামদুলিল্লাহ, তাবলীগের মেহনতের বরকতে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ইলমী ও সূলুক অঙ্গনে ভূমিকা রাখবে।

এর বিপরীতে তাবলীগের মেহনত একটি আলমী মেহনত। একটি আলমী মেহনতের বিপরীতে আঞ্চলিক কোন মাদ্রাসার ফতোয়া শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয় বরং হাস্যকর এবং অনধিকার চর্চা। ঠিক একারণেই এই ফতোয়া গুলো তাঁদের ব্যক্তিগত মতামত বলেই মনে করি। এসব ফতোয়া যারা এই মেহনতের সাথে জড়িত নন তাদের মধ্যে কিছু প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু যারা এই মেহনতের সাথে কার্যকরী ভাবে জড়িত তারা এর দ্বারা মোটেই প্রভাবিত হবে না। আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ সাদ সাহেবের বয়ান শুনে আসছি। যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, আমরা কখনো সেগুলোর আঁচও পাইনি। যেমন আম্বিয়াদের শানে বেয়াদবি, বা সুন্নতের অস্বীকার, আকাবিরদের অপমান ইত্যাদি। মজমার অবস্থার উপরে এক বিষয়ের উপর জোর দিয়ে কোন একটা কথা মুখ ফস্কে বের হয়ে যাওয়া আর গোস্তখী এক নয়। সাদ সাহেব যা বলেছেন তা একেবারে শূন্যের উপরে বলেন নি। কোন কোন তাফসীরের কিতাবে এমন পাওয়া যাচ্ছে। তবে দেওবন্দ মনে করেছে উম্মতের মাঝে এসব বোকা সমীচিন নয়। তাই দেওবন্দের পরামর্শ মোতাবেক মুখ ফস্কে বের হয়ে যাওয়া এই কথা গুলো থেকে তিনি ইতিমধ্যেই রুজু করেছেন। এরপরও এগুলো পুঁজি বানানো সমীচিন হচ্ছে না বলেই আমরা মনে করি।

মুফতি হজরতদের অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকলে স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু আপনারা যদি মনে করেন যে আপনাদের কথায় প্রভাবিত হয়ে আমরা সাদ সাহেবের বিরুদ্ধাচারণ করবো, তাহলে সেটা ভুল।

এসব ফতোয়া নিছক লা ইয়ানী বলেই মনে করি। লা ইয়ানী কথাবার্তা ও কাজকর্ম থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে হাদীসও প্রচুর তরগীব দেয়া হয়েছে। এব্যাপারে মুন্তাখাব হাদীসে একটি চ্যাপ্টারই কায়েম করা হয়েছে। একবার তৎকালীন তরুণ মুফতি ত্বকী উসমানী বেদাতিদের বিরুদ্ধে একটা পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন। তাঁর পিতা মুফতী শফী রহমাতুল্লাহ আলাইহি পড়ে বলেন যে এটা আবর্জনা হয়েছে, ডাস্টবিনে ফেলে দাও। এর দ্বারা হকপন্থীরা খুশি হবে কিন্তু বাতিল তার আকিদা থেকে হবে না বরং তারা কষ্টই পাবে, এবং আরো জেদী হয়ে যাবে। সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে ফতোয়ার দ্বারা কিছু লোকের মনোরঞ্জন ও চিত্তবিনোদন হবে ঠিকই কিন্তু সমাধানের কোন রাস্তা বের হবে না। বরং উম্মতের ফাটল আরো দীর্ঘ হবে। আমরা মনে করি উলামা কেরাম আলমী ফেতনাবাজদের ফাঁদে পা দিয়ে সাদ সাহেবের পিছনে লাগা ঠিক হবে না। বরং এই ব্যাপারে দেওবন্দ পর্যন্ত থাকাই সমীচীন মনে করি। সাদ সাহেবের ব্যাপারে যে কোন কথা বা পদক্ষেপ এর ভাষা এবং নিয়ত দেওবন্দের মতোই সংশোধনমূলক হওয়া চাই। বিদ্বেষ বা রাগ প্রকাশ দ্বারা কারো ইসলাহ সম্ভব হবে বলে মনে করি না। এর দ্বারা শুধু তিক্ততাই ছড়ায়। উলামা কেরাম মাদ্রাসায় মেহনত করেন, আমরা আমাদের বাচ্চা কাচ্চা ছোট ছোট ভাই বোনদের তাঁদের হাতে ছেড়ে দিয়েই নিশ্চিন্ত। উলামা কেরাম তাদের ইলমের পাশপাশি দ্বীনের দাঈ হিসাবে গড়ে তুলে এই কাজের তত্ত্বাবধায়ন করতে পারেন। এভাবে উলামা কেরামদের ইলমী ময়দানে মেহনতের দ্বারা উম্মতের অনেক বেশি ফায়দা হচ্ছে। আমরাও উলামাদের খিদমত করার দেয়ার ইলমী ময়দানে অবদান রাখব। এর বাইরে সাইয়্যেদ মাদানী, সাইয়্যেদ নদভী, শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহিমাহুমুল্লহদের মত দুআ, পরামর্শ, ইনফারাদি তাশকিল, জামাতের ইনফারাদি নুসরাতের মত উলামা কেরাম এই কাজের মদদ ও তত্ত্বাবধায়ন করতে পারেন।

 

 

Advertisements

Leave a Reply