নব্য আলমী শুরাদের মিথ্যাচার ও তার বিশ্লেষণ :

আব্দুল্লাহ আল ফারুক সাহেবের চটি বইয়ের ব্যাপারে বিচার বিশ্লেষণ :

ছোটবেলায় একটা কথা শুনতাম। সত্য একটিই হয়, কিন্তু মিথ্যা দশ রকমের হয়। একটি মিথ্যাকে ঢাকার জন্য আর দশটা মিথ্যা বলতে হয়।

শুরুতে দেওবন্দের ৮টি আপত্তি সহ একটা ফতোয়া ছিল। উবাইদুল্লাহ ফারুক সাহেব একে যথেষ্ঠ মনে করেননি। তিনি বাড়তি আরো কিছু অভিযোগসহ একটি চটি বই লিখেছেন। এই চটি তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসায় পাঠিয়েছেন। বইটি সংশোধন বা সতর্কতামূলক নয়। বরং বিদ্বেষমূলক। বইটির ভাষাই সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও খেপানোর ভাষা। বলাবাহুল্য বইটিতে প্রচুর মিথ্যা, আংশিক, অতিরঞ্জন এবং ভুল ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে তিনি তার উদ্দেশ্যে সফল হয়েছেন। হুজুগে বাঙালি হুজুগে মেতেছেন বৈকি! দেওবন্দের দেশ ভারতে এই হুযুগটা ঢেউ খেলেনি। কেননা সেখানে আমাদের মত হুজুগের লোক কমই আছে। সেখানকার লোকজন আমাদের মতো নয়। তাদের তাহকীকের জজবা বেশি।

এই হুজুগে আমাদের কেউ কেউ ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন। ঢাকার বাড্ডার জনৈক আব্দুল্লাহ ফারুক একের পর এক বই বের করে যাচ্ছেন। এযাবৎ ৯ টির মত বের করেছেন। তিনি দাবি করছেন ভারত থেকে জনৈক আমানতুল্লাহ, খিজির মাহমুদ প্রমুখ কয়েকজনের বই শুধু অনুবাদ করেছেন মাত্র। সত্য উদ্ঘাটনের নিয়তেই নিরপেক্ষ মন নিয়ে আল্লহর উপরে ভরসা করে ইস্তেখারা চালিয়ে গিয়ে দুই পক্ষেরই কিতাবাদী ও ডকুমেন্ট পড়ার নিয়ত করি। সেই উদ্দেশ্য সামনে রেখেই আব্দুল্লাহ ফারুক সাহেবের পেজ থেকে কয়েকটি বই নামাই। এরপর আমানতুল্লাহ সাহেবের ‘নেপথ্যের কিছু কথা’ থেকেই শুরু করি।

তিনি কিতাবের একেবারে শুরুর দিক থেকেই ভয়াবহ মিথ্যাচার শুরু করেন। তিনি দাবি করেছেন হজরতজী মাওলানা এনামুল হাসান সাহেব রহমাতুল্লাহ আলাইহি দ্বিতীয় খলিফা উমার রদিয়াল্লাহু আনহুর অনুকরণে ১০ সদস্য বিশিষ্ট ‘আলমী শূরা’ বানিয়ে গেছেন। এই একলাইনেই তিনি অনেক গুলো মিথ্যা বলেছেন, ইসলামের ইতিহাস বিকৃত করেছেন। সাহাবাদের তোহমত দিয়েছেন। উমার রদিয়াল্লাহু আনহু মোটেই ‘আলমী শূরা’ বানাননি। তিনি খেলাফতের জিম্মাদারী সাময়িক ভাবে সুহাইব রদিয়াল্লাহু আনহুর উপরে দিয়েছিলেন। এবং ছয়জনের এক জামাত বানিয়েছিলেন পরবর্তী খলীফা বাছাই করার জন্য। হজরতজী এনামুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহিও কোন ‘আলমী শূরা’ বানাননি। তিনিও পরবর্তী আমীর বানানোর জন্য দশ জনের এক জামাত বানিয়েছিলেন। এই জামাতের জিম্মাদারী ছিলো শুধুই পরবর্তী আমীর নির্বাচন আর কোন কিছু নয়। তাঁরা তিনদিন মাসোয়ারা করেও ঐক্যমতে পৌঁছতে পারেননি। তাই মিয়াজী মেহরাব সাহেবের (রহমাতুল্লাহ আলাইহি) ফয়সালায় সম্পূর্ণ নজিরবিহীন ভাবে যৌথ নেতৃত্ব তথা ফয়সাল শূরা কায়েম হয় যে তাঁরা তিনজন বারি বারি করে ফয়সাল থাকবেন। এরপর বাকি সাত জনকে কখনও কোন আলমী মাসওয়ারাতে ফয়সাল হতে দেখা যায়নি। তাই কাতেব বা লেখক সাহেবের ১০ সদস্যের ‘আলমী শূরা’র কথাটা ডাহা মিথ্যা, এবং তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত মিথ্যুক। এরপরের ইতিহাস আমরা জানি। ফয়সাল শূরা মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহি মাত্র ১৪ মাসের মাথায় ইন্তেকাল করেন। পরবর্তীতে মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহির সহযোগিতায় মাওলানা সাদ সাহেব খুবই সামান্য কিছু ব্যতিক্রমসহ অনানুষ্ঠানিক ভাবে মোটামুটি একক ফয়সাল হিসেবেই দায়িত্বশীল ছিলেন। যা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়, যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহি ইন্তেকালের পরে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে টঙ্গী ময়দানে এক আলমী মাসোয়ারায় সারা বিশ্বের জিম্মাদার সাথীরা তার মর্যাদা ফয়সাল থেকে জিম্মাদার বানান। এব্যাপারে টঙ্গী ময়দানের মাসওয়ারার খাতা চেক করে যেতে পারে। কাকরাইলের শূরা জনাব মাওলানা ফারুক সাহেব এব্যাপারে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জিম্মাদার সাথীদের নামে একটা চিঠিও ইস্যু করেন। এ ব্যাপারে সম্প্রতি ‘তাবলীগের বর্তমান সংকট এবং মাওলানা সাদ সাহেব কিছু অজানা কথা’ নামক উক্ত কিতাবে বিস্তারিত দলীল পেশ করা হয়েছে। অথবা পুরাতন সাথীদের থেকেও জেনে নেয়া যেতে পারে।

এরপর লেখক সাহেব সাদ সাহেবের ব্যাপারে তিনটি ভয়াবহ তথ্য দিলেন। বলা বাহুল্য এগুলো খোলাখুলি মিথ্যা এবং আমাদের পুরাতন আকাবিরদের ব্যাপারে ভয়ংকর তোহমত। তিনি উল্লেখ করেছেন মাওলানা সাদ সাহেব আলেম নন। তিনি সময় লাগাননি। এবং তিনি সাথে ইসলাহী সম্পর্ক কায়েম করেননি। লেখক সাদ সাহেবের নাম উল্লেখ করার সময় ‘মাওলানা’ উল্লেখ না করে ‘সাহেবজাদা’ উল্লেখ করেছেন।

“সাদ সাহেব আলেম নন এবং কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেন নি”, একথা সত্য হলে অসংখ্য বুজুর্গ আলেম ও সাথীদের কথা মিথ্যা হবে। মাওলানা ইব্রাহিম দেউলা হাফিযাহুল্লহ নিজেও উল্লেখ করেছেন তিনি সাদ সাহেব এবং তাঁর পিতার শিক্ষক। এছাড়া মাওলানা আহমাদ লাট সাহেব, মাওলানা ইয়াকুব সাহেব সহ অনেক প্রবীণ আলেম দাবি করেছেন ইব্রাহীম সাহেব সাদ সাহেবের শিক্ষক। মাওলানা ইব্রাহীম দেউলা হাফিজহুমুল্লহ বুখারী পড়ান বলেই জানতাম। লেখক কি তাঁকে মক্তবের শিক্ষক বলে দাবি করছেন! এছাড়াও মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান, ওমর পালানপুরী, হাজী সাহেব সহ অনেকের উপস্থিতিতে অসংখ্য চিঠিতে তাঁকে ‘মাওলানা’ হিসাবেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই সমস্ত বুজুর্গগণ জেনে শুনে এত বড় সত্য লুকাবেন! একজন বেআলেমকে আলেম হিসাবে চালিয়ে দিবেন!

মাওলানা সাদ সাহেব একজন ইয়াতীম ছিলেন। খুবই অল্প বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। মাওলানা এনামুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহি তাঁর নিকট আত্মীয় ছিলেন। বলতে গেছেন তিনি ছিলেন নিজামুদ্দিনে সাদ সাহেবের একক অভিভাবক। অভিভাবক হিসাবে সাদ সাহেবের সহীহ তালীম তরবীয়ত তাঁর উপরে শরয়ী জিম্মাদারী ছিল। লেখক সাহেব কি দাবি করছেন যে হজরতজী জেনে শুনে একজন ইয়াতীমের হক নষ্ট করেছেন! লেখক সাহেব শুধু মিথ্যার দোকান খুলে বসেছেন তাই নয়, পুরাতন ও বর্তমান সকল বুজুর্গদের নামে অপবাদেরও দোকান খুলে বসেছেন।

তিনি দাবি করেছেন মাওলানা সাদ কোন সময় লাগাননি। এমনকি শূরা হবার পরেও নয়। এটাও ডাহা মিথ্যা কথা। মাওলানা সাদ নিজামুদ্দিন মারকাজের মাদ্রাসা ফারেগ হবার পরপরই সাল লাগান। হজরতজী মাওলানা এনামুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহি একজন যোগ্য অভিভাবকের মতোই তাঁর তালিমের পাশাপাশি খুরুজের তরতিব করেছেন। তিনি নিজেই তাশকিল, তারতিব এবং তরবীয়তের কাজ জিম্মাদারীর সাথে আদায় করেছেন। ২০১৭ সালে আগষ্ট মাসে মাওলানা শামীম সাহেব মালয়শিয়া সফর করেন। এস্তেমায়ি মজলিসে তিনি পূর্ববর্তী আকাবিরদের বিভিন্ন কওল ও দলিলের দ্বারা নিজামুদ্দিনের গুরুত্ব এবং এতায়েতের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় জিম্মাদার সাথীদের সাথে এক ইনফারাদি আলোচনায় সাদ সাহেবের সাল লাগানোর কিছু কারগুজরি শুনান। সাদ সাহেবের সাথে আরো যাঁরা সফর করেছেন এমন কয়েকজন ছিলেন ওই জামাতে। তাঁরাও এর সাক্ষ্য দিয়েছেন। এতজন পুরানো সাথীর বিপরীতে এই একজন প্রায় অপরিচিত লেখকের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।

সাদ সাহেব মুফতি জয়নুল আবেদীন রহমাতুল্লাহ আলাইহির ইজাজত প্রাপ্ত। তিনি দুই সূত্রে ইলিয়াস রহমাতুল্লাহ আলাইহির সিলসিলার ইজাজত প্রাপ্ত। সেই হিসাবে মাওলানা সাদ ইলিয়াস রহমাতুল্লাহ আলাইহির সিলসিলার ইজাজত প্রাপ্ত। একই সাথে তিনি মাওলানা ইফতেখারুল হাসান সাহেবের ইজাজত প্রাপ্ত। তিনি রায়পুরী সিলসিলার ইজাজত প্রাপ্ত। ইফতেখারুল হাসান সাহেব দামাত বারকাতুহুম এখনো হায়াতে আছেন। লেখক সাহেব প্রয়োজন মনে করলে তাহকীক করে নিতে পারেন। অবশ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ফিৎনা ছাড়ানোর উদ্দেশ্য থাকলে ভিন্ন কথা।

এরপর লেখক আরও মিথ্যা বলেছেন যে, তিনি উল্লেখ করেছেন তার কথিত দশজনের আলমী শূরা নিজামুদ্দিনের জন্য পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট শূরা বানিয়েছেন। এটা পুরোপুরি মিথ্যা।

এরপর লেখক সাহেব শুরু করেছেন কল্পকাহিনী যা রূপকথার মতোই চমকপ্রদ। তিনি দাবি করেছেন মেওয়াতীদের হাঙ্গামার কারণেই এত অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও হজরতজী এনামুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহি মাওলানা সাদ সাহেবকে শূরাতে নিতে বাধ্য হয়েছেন। সাদ সাহেবও শূরা হয়েই বিভিন্ন বড়বড় মজমাতে বয়ান রাখার জন্য বাচ্চাদের মত আবদার করতে থাকেন। আকাবিররাও এইসব ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কারণেই তাঁকে অযোগত্য সত্ত্বেও বিরাট বিরাট মজলিসে আমল দিতে বাধ্য হন। এরপর সকল বুজুর্গরা ইন্তেকাল করলে মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহি সাদ সাহেবের বেউসূলি মুখ বুজে সহ্য করতে থাকেন।

এইসব কল্প কাহিনীর দ্বারা লেখক প্রকারান্তে আমাদের পূর্ববর্তী সকল বুজুর্গদের নামে কালিমা লেপন করলেন, তাঁদের তাকওয়া তাওয়াক্কুলের উপরে প্রশ্ন তুললেন এবং তাঁদের উপরে খেয়ানতের অভিযোগ তথা তোহমত দিলেন। হাজী সাহেব, হজরতজী, মাওলানা পালানপুরী, মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সহ পূর্ববর্তী বুজুর্গগণ যাঁরা পুরো উম্মতকে আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বড়ত্ব, কুদরত ও শক্তির পরিচয় দিয়েছেন তাঁরাই কিনা আল্লহর শক্তির মোকাবেলায় মেওয়াতীদের কথিত দাবির কাছে হার মানলেন! তাঁদের এত দিনের তাবলীগ বয়ান মুহূর্তের মধ্যে ভুলে গেলেন! শুধুমাত্র মেওয়াতীদের ভয়ে একজন অযোগ্য যুবককে সারা দুনিয়ার শূরা ও ফয়সাল বানালেন! শুধুমাত্র আবদারের কারণে এমন এক অযোগ্য যে কিনা লেখকের ভাষ্যমতে আলেমও নন তাকে এত বড় বড় মজমায় বয়ান দিলেন? উম্মতের সাথে এত বড় খেয়ানত! নবীওয়ালা এই কাজের সাথে এতো বড় খিয়ানত! জুবায়ের সাহেবও কিছু বললেন না! মুখ বুজে সয়ে গেলেন! যিনি আজীবন আল্লহর রাস্তায় জীবন ব্যয় করার তাশকিল করলেন তিনি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার এত বড় সুযোগ হারালেন!

বলাবাহুল্য এরপর আর ওই বই পড়ার রুচি আমার হয়নি। এই লেখক আব্দুল্লাহ ফারুক এবং তাঁর দোসররা নিঃসন্দেহে কাজ্জাব। তাদের কোন কথাই আর শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা সাদ সাহেবকে শুধু সামনে রেখেছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য এই মেহনতের সাথে জড়িত সকল আকাবিরদের বিতর্কিত করা। তথা এই মেহনতকেই বিতর্কিত কথা। আল্লাহ এইসব কাজ্জাবদের থেকে উম্মতকে হেফাজত করুন।

সংগ্রহে : শামীম হামিদী

Advertisements

Leave a Reply