“একটি ঐতিহাসিক চিঠি”

একটি ঐতিহাসিক চিঠি:

সম্মানিত শ্রদ্ধেয় জনাব মৌলভী আহমদ লাট সাহেব, মৌলভী ইবরাহীম সাহেব, মৌলভী আশরাফ সাহেব, মৌলভী ইসমাঈল সাহেব, মৌলভী আবদুর রহমান সাহেব, মাওলানা উসমান সাহেব, মৌলভী ২য় উসমান সাহেব!
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ,

আশা করছি আপনারা স্বভাবসূলভ দাওয়াতের কাজে রত আছেন। কেননা দাওয়াতই ঐ রহমতপূর্ণ কাজ যা মানুষের আমলকে বিগড়ে যাওয়া থেকে শুধরে দেয়। স্বভাব ও মেজাজ কখনো দুনিয়ার রঙে বিগড়ে যায় আবার কখনো দ্বীনের রঙে। অর্থাৎ কখনো দুনিয়াবী সূরতে আবার কখনো দ্বীনী সূরতে। যখন দ্বীনী সূরতে আমল বিগড়ে যায় তখন মানুষ বেশি ধোঁকার মধ্যে পড়ে। কেননা স্বভাব কখনো অন্তরের অনুগামী হয়। অর্থাৎ কখনো বাহ্যিক রূপ আর আসল রূপ মিলে যায়। আবার কখনো বিপরীতও হয়।

এজন্যই দাওয়াতের মাধ্যমে যাহের ও বাতেন উভয় মেহনত শিখবে হবে। এই ময়দানে চলাচলকারীরা চলতিপথের যাবতীয় কঠিন ঘাঁটিসমূহ অতিক্রম করে থাকে। যেসব দুস্তর ঘাঁটি সম্পর্কে মাওলানা মুহাম্মাদ উমর পালনপুরী সাহেবের মতন হযরতগণ বয়ান করে গেছেন, তা বিস্তারিতভাবে বলার অবকাশ নেই।

ঐ ঘাঁটি সমূহের মধ্যে একটি ঘাঁটি এটাও যে, পরষ্পরের মতানৈক্য ও মতভেদ সম্মুখে চলে আসা। ঠিক এসময়েই শয়তান মামুরদের মাঝে আমীর সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করে দেয়। আর তখন ঐ আমীরের (দীক্ষাসূলভ) ধমকা ধমকি যা মামুরদের জন্য ইসলাহ বা সংশোধণের কারণ ছিলো তা শত্রুতার কারণে পরিণত হয়। যা কাজ থেকে মাহরূম হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেননা আমীরের উপর খারাপ ধারণা রাখা কঠিন অপরাধ এবং বড় গুনাহ।

ঐ হাদীসসমূহ উঠিয়ে পড়ুন যার মধ্যে আমীরের আনুগত্যের গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে এবং (হাদীসের ভাষ্যমতে) শেষ পর্যন্ত এটাই বুঝা যায় যে, প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট কুফরীর পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত আনুগত্য করা ওয়াজিব। হাদীসে كفرا بواحا অর্থাৎ “স্পষ্ট কুফুরি বা্ক্য” শব্দটি উল্লেখিত রয়েছে। (উক্ত হাদীসটি বুখারীর শরীফের কিতাবুল ফিতানে বর্ণিত আছে)

আমীরের আনুগত্যের এই আবশ্যকীয়তা এজন্য যে, আমীরের আনুগত্য ছাড়া সম্মিলিত শক্তি তথা ঐক্য অসম্ভব। আর এই উম্মত ঐকবদ্ধ অবস্থাতেই শত্রুর উপর বিজয়ী হবে। আর যখন মতানৈক্য, দলাদলি ও বিভেদ সৃষ্টি হবে তখন হক্বের উপর বিদ্যমান থাকা অবস্থাতেও শত্রুুর উপর উপর জয়লাভ করতে পারবে না। যার সাক্ষী হাদীসসমূহের মধ্যে এবং সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাসের মধ্যে অগণিত পাওয়া যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, এই কাজের মধ্যে ব্যক্তিগত উন্নতি নিহীত আছে নিজের অসম্পূর্ণতার দিকে দৃষ্টিপাত করে আগ্রহ বাড়ানোর মাঝে। যদি স্বীয় অসম্পূর্ণতা দেখা থেকে নজর সরে যায় তাহলে উন্নতির দরজা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। অসম্পূর্ণতার দিকে দৃষ্টি রাখাই বিনয়ের একটা বড় দরজা। আর যখন মানুষ বিনয়ের দূর্গে প্রবেশ করে অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে যায় তখন সে আল্লাহর রহমতের আঁচল ধরে ফেলে এবং আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে তার হেফাযত হতে থাকে।

তৃতীয় একটা জিনিস এই যে, নিজের ইয়াক্বীনকে মাখলূকের সন্তুষ্টি ও ভয়ের ধরণা থেকে সরিয়ে আল্লাহ তা’আলার উচ্চ যাতের সাথে বন্ধন সৃষ্টি করা। এমনকি আমীরের কাছ থেকে মনে মনে এতটুকুও আশা না করা যে, তিনি আমাদের আরাম দিবেন, আমাদের প্রয়োজন লক্ষ্য রাখবেন, আমাদের অবস্থার খোঁজ খবর নিবেন।

কেননা মাখলূকের কাছে প্রয়োজন নিয়ে যাওয়ার দ্বারা আল্লাহর দানের যে দরজা খাস বান্দাদের জন্য উম্মুক্ত থাকে তা আর খোলা থাকে না। সে দরজা ততক্ষণই খোলা থাকে যতক্ষন সবার থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে এবং সবার থেকে দৃষ্টি হটিয়ে নিজের খালেকের দরজায় পড়ে থাকে। তার থেকেই নিজের প্রয়োজনসমূহ পুরা করা শিখতে হবে এবং যে অবস্থায় তিনি রাখবেন ঐ অবস্থা নিজের জন্য কল্যাণকর মনে করবে। এই অবস্থা তখনই হবে যখন মানুষ আল্লাহর পথে চলবে।

যদি কেউ মাখলূকের দিকে চলে তাহলে তার হালতের মধ্যে খারাবী প্রাধান্য পাবে। অন্যথায় যদি খালেকমুখী থাকে তাহলে অপছন্দনীয় কিছু পরিস্থিতি প্রকাশ পেলেও তা কল্যাণের দিকে নেওয়ার জন্য এবং কল্যাণমুখী করার জন্যই (আল্লাহ তা’আল পক্ষ থেকে) এসে থাকে। এটি মূলত অকল্যাণ থেকে কল্যানের দিকে দৃশ্যপট পাল্টে দিতে আসে। কুরআনে বর্ণিত “হয়তো তারা প্রত্যাবর্তন করবে” আয়াতটা পড়ুন।

চতুর্থ কথা এই যে, শয়তানের একটি বড় চাল হলো, সে (নেক সূরতে ধোঁকা দিয়ে) দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ মেহনত থেকে সরিয়ে আংশিক মেহনতের দিকে নিয়ে যেতে চায়। এমনিভাবে ফরজ ইবাদত থেকে সরিয়ে নফলের দিকে নিয়ে যায়। পাশাপাশি এমন কিছু পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যদ্দরুণ ফরজের চে’ নফলের গুরুত্ব বেশি দিতে দেখা যায়। যার কারণে (শয়তানের জালে আটকে পড় ব্যক্তি) সাধারণ উম্মত থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলে। অতপর উম্মতকে নিয়ে না সে নিজে চলতে পারে। আর না উম্মত তার সাথে মিলে চলতে পারে। তখন তার মাঝে বুযুর্গী ছুটে যাওয়ার গুণ প্রকাশ পায়। যেন তিনি এই উম্মতের মাঝে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন। আর উম্মত তার হাত থেকে ছুটে পুণরায় শয়তানের কবলে পড়ে। তখন এই উম্মতের চোখে তার (উক্ত বুযুর্গের) অবস্থার অবনতি ধরা পড়ে। ফলে উম্মত তার দিকে আর ফিরে যায় না। বরং তার থেকে বেঁচে থাকাই নিজের সফলতা মনে করে।

এজন্য আসুন দুআ করি যেন আল্লাহ তা’আলা এই কাজের আযমতের সাথে চলনেওয়ালা বানিয়ে দেন।

সালাম

——

সাঈদ আহমাদ খান, মদীনা মুনাওয়ারা

তারিখঃ ৫ই রামাযান মুবারাক ১৩৯৬ হিজরী

হযরত মাওলানা আহমদ লাট সাহেব ও অন্যান্যদের নামে (চিঠি নং ১৪)
—————————————-
(হজরত মাওলানা মুহাম্মদ সাইদ আহমাদ খান রহিমুহুল্লাহ ছিলেন বিশ্বব্যাপী দাওয়াত ও তাবলিগের হারামাইন ও শরীফাইনের [মক্কা ও মদিনা] তাবলিগ জামাতের জিম্মাদার। তিনি তাবলিগ জামাতের ১ম, ২য় ও ৩য় আমিরের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৫০ বছর এ মেহনতের সাথে ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী এবং উনার সাথিদের ভাষ্যমতে সীরত, সুরত, আখলাক এবং ফিকির এ নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহিওয়াসাল্লাম এর এমন অনুসরণকারী বিরল)

Advertisements

One thought on ““একটি ঐতিহাসিক চিঠি”

Leave a Reply