যুগে যুগে আহলে হক উলামাদের উপর “ভয়ংকর কুফরি ফতোয়া”

যুগে যুগে আহলে হক উলামাদের উপর
“ভয়ংকর কুফরি ফতোয়া”

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ | সকল যামানায় যুগের মুজাদ্দেদরা সময়ের অদূরর্দশি আলেমদের “ভয়ংকর কুফরি ফতোয়া” তে আক্রান্ত হয়ে , নাজেহাল হতে হয়েছে। বিশ্বব্যাপি মুসলমান সমাজের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ প্রায় সকলের উপরেই যুগে যুগে কুফরির ফতোয়া এসেছে। উপমহাদেশের অসংখ্য আহলে হক উলামায়ে কেরাম এই স্বগোত্রের প্রতিক্রিয়াশীল অদুর্রদর্শী আলেমদের ফতোয়াবাজিতে শিকার হয়েছেন। আরো মজার তথ্য হল এসব ফতোয়া কিন্তু কুরআন হাদীসের দলিল দিয়েই দেয়া হয়েছিল!

ইতিহাস অামাদের যে চমকপ্রদ তথ্যটি দিচ্ছে তা হলো, মানুষ এসব ফতোয়াবাজদের মনে রাখেনি। কিন্তু ফতোয়ার শিকার ব্যক্তিগণের নাম ইতিহাসের পাতায় জ্বল জ্বল করছে। শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী রহ. মাওলানা কাসেম নানুতাবি রহ. মাওলানা স্যায়িদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি রহ. অাল্লামা ইকবাল রহ. মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রহসহ অসংখ্য যুগের নকীবদের উপর উপমহাদেশে সময়ে সময়ে ভয়ংকর কুফরি ফতোয়া আরোপিত হয়েছে। তাদের উপর কে বা কোন কোন প্রতিক্রিয়াশীল ওলামা ফতোয়া দিয়েছে সেটি অাজ অার কেউ মনে রাখেনি।

আরেক ভাবে বললে, যাদের নামই ইতিহাসে পরবর্তীতে সোনালী কালিতে লেখা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই এই পরিবেশ মোকাবেলা করেছিলেন। হুজুগী ফতোয়া আর নানান সমালোচনার কটিন পাহাড় অতিক্রম করে তারা অমর হয়েছেন। ইমাম বুখারী রহ. তো শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্ তাআলার কাছে যাওয়ার আর্জী পেশ করেছেন। মিশকাতের শরাহ মিরকাতুল মাফাতিহের মাকতাবায়ে রশীদিয়া সংস্করনে ইমাম বুখারীর জীবনী দেয়া আছে। সংক্ষেপে এতো সুন্দর আলোচনা আর দেখিনি। পড়ে দেখুন, চোখ দিয়ে অঝোর ধারার কান্না বের হবে। কেন তাঁকে এতো সমালোচনা আর ফতোয়াতে নাজেহাল ও অপদস্থ হতে হল সমাকালিন আলেমদের কাছে?

উপমহাদেশের অন্যতম মুহাদ্দিস যফর আহমাদ উসমানী রহ:বলেন
ان الرجل لا يبلغ درجة الصديقين حتي يرميه سبعون صديقا مثله بالكفر والزندقةوهكذا سنةالله في اولياإه
মানুষ তখনই সর্বোচ্ছ বুযুর্গ হয়,যখন তার মত কম্পক্ষে আরো ৭০জন বুযুর্গ বলবে,আরে ওতো কাফের মুরতাদ।আওলিয়ায়ে কেরামের বেলায় এটিই আল্লাহর চিরাচরিত নিয়ম। (ই’লাউস সুনান 3/28) (মুকাদ্দমায়ে মুসনাদে ইমাম আজম 1/38)

নিজের অজ্ঞতা দূর করুন। আমি কঠিন কোন কিতাবের নাম বলছিনা, বেফাকের নেসাব ভুক্ত মেশকাত জামাতের ‘দেওবন্দ আন্দোলন ইতিহাস ঐতিহ্য ও অবদান’ গ্রন্থ খুলে দেখেন। যারাই উম্মতের জন্য কাজ করেছেন, তাদের প্রায় সবারর বিরোদ্ধেই নানান ফতওয়া দেয়া হয়েছে। আরো শুরু থেকে দেখলে ইমাম আবু হানীফা রহ. থেকে শুরু করে ইমাম বুখারী রহ. সহ কে বাদ পড়েছেন দেখুন।

কে যেন বলেছিলেন, ওলীদের দুইটি স্তর আছে।
(১) মাকামে ওয়ীলায়াহ,
(২) মাকামে নবুওয়াহ।
যারা মাকামে ওয়ীলায়াতে থাকেন তারা সর্বজন নন্দিত হন, দুনিয়ার কুটচাল থেকে মুক্ত থেকে খানকায় বসে দ্বীনের খেদমত করেন। আর যারা মাকামে নবুওয়াতে থাকেন, তাদের জাতির বেশির ভাগ মানুষই পছন্দ করে না। কিন্তু জাতির জন্য তাদের ত্যাগই সবচেয়ে বেশি। তারা সমালোচনায় রক্তাক্ত চামড়া খুলে মেলে দেন সমালোচকদের মাথার উপর রোদের তাপ থেকে বাঁচাতে…। এমন যুগের নকীব, জামানার মুজাদ্দেদ উলামায়ে কেরাম আগেও যেমন এমন ফতোয়াতে স্বীকার হয়েছেন তেমনি আজো তারা সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন। তাদের বিবরণ বিস্তারিত লিখলে বেশ বড় একখানা কিতাব লেখা যাবো। নিম্নে পাঠকের জন্য উপমহাদেশে আমাদের আকাবির হক্কানী উলামাদের উপর নিজেদের আবেগি লোকজনের আরোপিত কিছু “কুফরি ফতোয়া’র ইতিহাস সংক্ষিপ্তকারে তুলে ধরা হল…

===============================
শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী রহ. এর উপর ‘কুফরি’ ফতোয়া!

উপমহাদেশের সকল উলামায়ে কেরামের যাবতীয় দ্বীনী, ফিকহি সিলসিলা, হাদীসের সনদ, তাযকিয়ার শাযরাহ গিয়ে একত্রিত হয়েছে শাহ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলভীর সাথে। তাকে বাদ দিয়ে উপমহাদেশে ইমলামের ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। আপনি শুনে অবাক হবেন এই মহান যুগ সংস্কারক আলেমেদ্বীনের উপরেও তৎকালিন উলামায়ে কেরামদের একটি বড় অংশ কুফরি ফতোয়া দিয়ে রেখেছিলেন দীর্ঘদিন। এমনকি তিনি কাফের হিসাবে তাকে হত্যা করার জন্য বারবার সবোর্চ্চ চেষ্টা করেছেন এই ফতোয়াবাজ আলেম শ্রনী। (বিস্তারিত দেখুন, হায়াতে ওয়ালী পৃষ্টা নং ৩২১)

শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী ছিলেন, ঐব্যাক্তি -যিনি দীর্ঘ এগার বছর কাল সাধনার পরে কুরআন শরিফের প্রথম পুনাঙ্গ অনুবাদ করেছিলেন উপমহাদেশে। তখন সর্বত্র ফার্সি ভাষার প্রচলন ছিল। ফারসি ভাষায় তিনি কুরআনের তরজমা “ফতহুর রাহমান” প্রকাশের পর তৎকালিন উলামায়ে কেরাম না বুঝেই আরবী কুরআনকে ফার্সি করার অপরাধে তার উপর ভয়ংকর ‘কুফরি’ ফতোয়া আরোপ করেন। তার বিরোদ্ধে মিটিং মিছিল আর অবরোধ ও হামলা সহ এমন কোন নেক্কারজনক ঘটনা নেই যা, স্বগোত্রের আলেমদের দ্বারা তার উপর হয়নি। #আমিরুর_রওয়াত গ্রন্থে আছে, এমনকি এই ফতোয়ার কারনে তাকে তাঁর এলাকা থেকে অবাঞ্ছিত ঘোশনা করে বের করে দেয়া হয়েছিল। এই কুফরি ফতোয়া শাহ সাহেব রহ. এর উপর দীর্ঘ ২৫বছর দুই যুগের অধিককাল বলবৎ ছিল। (বিস্তারিত দেখুন, শাহ ওয়ালী উল্লাহ আউর উনকি সিয়াসি তাহরিক, মাওলানা উবায়দুল্লাহ)

=====================================
মাওলানা কাসেম নানুতবী রহ এর উপর “কুফরি ফতোয়া”!

দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ক্বাসিম নানুতবী রহ.এর উপরেও খোদ তাঁর কাছের উলামাদের দ্বারা কুফরি ফতোয়া এসেছে। একবার লাখনৌর ‘পুরকাজী’ নামক অঞ্চলে ছিলেন। তখন সেখানে শিয়াদের মহররমের আনুষ্ঠানিকতা চলছে। শিয়ারা কি এবং তাদের হারাম কাণ্ডকারখানা সম্পর্কে সবাই অবগত আছেন। তো তাদের একটি প্রতিনিধি দল নানুতবী রহ. এর কাছে এসে দাওয়াত দিলো তাদের তাযিয়া মিছিল ও মাতম অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। তিনি দাওয়াত কবুল করলেন। সেখানে গিয়ে বক্তব্যও রাখলেন। তাঁর সেই বক্তব্য পরবর্তীতে অনেকের হেদায়াতের পথ খুলে দিলেও, তখন কিন্তু পুরো ভারতবর্ষে জুড়ে তার বিরোদ্ধে কুফরি ফতোয়া ও নিন্দার তুলকালাম ঘটে গেল।মানাযির আহসান গিলানী রহ. এর ভাষায় খালবালি মাচ গায়ি [সাওয়ানেহে কাসেমী ২/৬৮, মাকতাবায়ে দারুল উলূম]

শেষ হয়নি, ফতোয়া, সমালোচনায় ক্ষত-বিক্ষত। তবে নানুতবী রহ. তা থোড়াই পাত্তা দিয়েছেন, কিন্তু শেষে নিজের মানুষদের প্রশান্তির জন্য সেই দৃঢ় উত্তর শুনিয়ে দেন “শক্তিসম্পন্ন সাধক বিষ খেয়েও হজম করতে পারে বিষের কোন প্রতিক্রিয়া তাঁর দেহে প্রকাশ পায় না। যার পাকস্থলী দুর্বল সে তো সামান্য তৈল ব্যঞ্জনেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। (শিয়াদের তাযিয়া মঞ্চে)যদি হালুয়া গ্রহণ করে থাকি তাদের মঞ্চে সত্যকথাও তো পৌঁছে দিয়েছি”। [সাওয়ানেহে কাসেমী ২/৬৮, টীকায় কারী তৈয়্যব রহ. লিখেন, গ্রহণ করেছেন জানা যায় কিন্তু খেয়েছেন বলে কোন তথ্য নেই। বিস্তারিত দেখুন মুফতী ফয়যুল্লাহ আমান কাসেমী কৃত হৃদয়ের আঙিনায় নববী দাওয়াত, মাসিক পাথেয় জুলাই ও অগাস্ট ‘১৫]

==========================
মাওলানা উবায়দুল্লাহ সান্ধি রহ. এর উপর ‘কুফরি ফতোয়া!

কুফরি ফতোয়াতে শিকার হয়েছিলেন শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান রহসহ তাঁর অসংখ্য ছাত্র ও শিষ্য। তাদেরই একজন মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি। বৃট্রিশ বিরোধি বিখ্যাত রেশমি রুমাল আন্দোলনের অন্যতম মহানায়ক তিনি। উবায়দুল্লাহ সিন্ধির উপর তৎকালিন দেওবন্দি একদল আলেম তার কিছু সমকালিন চিন্তাধারা নিয়ে ব্যাপকভাবে “কুফরি ফতোয়া” প্রদান করেন। এবিষয়ে ইতিহাস গবেষক নুর উদ দীন আহমদ সিন্ধির জীবনীতে লিখেছেন, “মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি দেওবন্দে শিক্ষালাভ করেছিলেন বটে,কিন্তু তিনি দেওবন্দের বাহ্যিক রূপ, রং এবং আকৃতি-প্রকৃতির প্রতি অনুরক্ত ছিলেন না। শাহ ওয়ালী উল্লাহ যে চিন্তাধারা দ্বারা দেওবন্দের বিশিষ্ট নেতাগন অনুপাণিত ছিলেন, তিনি সে আর্দশ ও দর্শনের মর্মমূলে পৌছে ছিলেন। শায়খুল হিন্দও তাঁর এরূপ যোগ্য শিষ্যের কাছে দেওবন্দ প্রতুষ্ঠানের অন্তর্নিহিত বৈপ্লবিক লক্ষের বিষয়ে খুলে বলেছিলেন। মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি ইসলামকে যে বিশ্ব মেজাজ ও দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, খোদ দেওবন্দের উলামাদের একাংশের তা মনঃপূত ছিল না। এজন্য তাঁরা মাওলানা সিন্ধির উপর কাফেরি ফতোয়া একের পর এক আরোপ করতে থাকেন। (বিস্তারিত দেখুন, শাহ ওয়ালী উল্লাহ ও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা, ভূমিকা, মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী)

============================_=
কুতবে আলম মাদানী রহ. উপর ‘কুফরি ফতেয়া’!

বেশি দুরের কথা নয়, আমাদের সায়েস্তাগন্জে কুতবে আলম সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ কে আক্রমন করা হয়েছিল কংগ্রেসের দালাল বলে। তাকে পুড়িয়ে মারার জন্য মুসলীম লীগের মুসলমান কর্মিরা ট্রেনে তার কামরায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। আল্লাহর কুদরতে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। শাইখুল ইসলাম মাদানী রহ. এর পাগড়ী একজন টেনে খুলে নিয়ে ছিল। সেই সময়েই যখন তাঁর গায়ে হাত তোলা হচ্ছিল তখন তাঁর খাদেম আঘাতগুলো নিজের গায়ে নিচ্ছিলেন। তাঁকে রক্ষা করতে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করছিলেন। ঘটনাটি প্রায় প্রতিটি জীবনীতেই আলোচনায় এসেছে।

৪৭সালে হিন্দুস্তান জুড়ে হযরত মাদানী রহ.কে কাফের ফতওয়া প্রদানের হিড়িক পড়ে যায়। স্রোতের সাথে ভেসে আজীবন ভক্ত আল্লামা ইকবালের মতো যুগ সচেতন পান্ডিত মাদানী রহ.কে কাফের ফতওয়া প্রদান করে রীতিমত কিতাব লেখে ফেলেন। অগত্যা হযরত (রহ) নিজের অবস্তান পরিষ্কার করে ”মুত্তাহিদায়ে কাওমিয়্যাত আওর ইসলাম ”’ নামে একটি কিতাব রচনা।

এখন আপনার সিদ্ধান্ত আপনার হাতে, নিজেকে ইতিহাসের পাতায় কোনদলে দেখতে চান? যুগে যুগে ফতোয়া প্রদানকারীদের দলে? যখন কুরআন হাদিসের অসংখ্য দলীল আর কিতাব লিখে একজন না- সীহুন আমীন কে আঘাত করা হচ্ছিল, পাগড়ী টেনে নেয়াদের দলে , না তাঁর রক্ষাকারীদের দলে?
সিদ্ধান্ত আপনার…

চলবে…

Advertisements

2 thoughts on “যুগে যুগে আহলে হক উলামাদের উপর “ভয়ংকর কুফরি ফতোয়া”

Leave a Reply