বাংলাদেশের আলেমরাও কি ক্রমশ সমরকন্দ-বোখারার পথেই হাটছেন?

বাংলাদেশের আলেমরাও কি ক্রমশ সমরকন্দ-বোখারার পথেই হাটছেন? FB_IMG_1517860856033.jpg
=============================সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ
এক.
আব্বার কাছে শৈশবেই যখন বোখারা, সমরকন্দ, কাশগড়, গ্রানাডা, কর্ডোভার ইতিহাস পড়েছি তখন আমার কোমল হৃদয়ে বেশ আশ্চর্য জাগত। কীভাবে সম্ভব! পৃথিবীতে এত এত আমরা মুসলমানরা বেঁচে থাকতে আমাদের চোখের সামনে হাতছাড়া হল আমাদের পিতৃপুরুষের রক্ত-জলে নির্মিত তিলোত্তমা নগরীগুলো! সেখানে সেসব শহর পরাজিত হয়নি, পরাজিত হয়েছিলে আলেমদের চেতনা। ঈমানী স্পীট আর ইলমের গভীরতা। পরাজিত হয়েছিলেন শায়খুল মাশায়েখরা। সাথে পরাজিত হয়েছিল একটি সভ্যতার। একটি ঐতিহ্য আর ইতিহাসের। ইমাম বুখারী (রহঃ) এর জন্মস্থান বোখারার ইতিহাস পড়ে কেঁদেছি। এ ইতিহাস ইলমে হাদীসের সূতিকাগার থেকে ইসলাম বিতাড়ণের করুণ ইতিহাস।

আজকের আধুনিক বোখারা ও সমরকন্দ দেখলে কি এটা ভাবা যায়, একদা এ নগরীগুলো ছিল হাদিসচর্চার সূতিকাগার! পাড়ায় পাড়ায় ছিল ইলমে নববীর দরসগাহ। শহরজুড়ে ছিল শায়খুল মাশায়েখদের অগনিত খানকা। দরস তাদরিসের কোলাহল ত্বোলাবাদের পদচারনায় মূখরিত হত যে সৌভাগ্য নগরী। নিত্যদিন মসজিদে মসজিদে বসতো দরসুল কুরআনের মাহফিল। কলাল্লাহ আর কলার রাসূলের মুহুর্মুহু উচ্চারণে এখানকার পথ-ঘাট, বাড়ি-ঘর মুখরিত ছিল। সারা দুনিয়া থেকে দ্বীন ইসলাম শিখতে হেদায়তের পথিকরা ভীর জমাতেন সে বরকতময় শহরহুলোতে। আজকের গ্রানাডা আর কর্ডোভা দেখলে কি মনে হবে, একসময় এ নগরীগুলো ছিল ইসলামের স্বর্ণশিকড়ে। ইমলামি ইতিহাসে জ্ঞানচর্চার আতুড়ঘর! ছিল এসব নগর বন্দর। উলামাদের শান শওকত আর প্রভাব প্রতিপত্তিরর সীমাহীন এক বুনেদী যৌলুস ছিল সেখানে। এখানকার পথে পথে ঘোড়া হাকিয়ে ছুটেছিলেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মুজাহিদগণ।

আমি আজ ইতিহাস থেকে নিমর্মসত্য কিছু কথা লিখব। সবাই আমার সাথে একমত নাও হতে পারেন। তবে ইতিহাসকে অস্বিকার করার কোন সুযোগ নেই কারো। ইচ্ছে অনিচ্ছায় তা মানতে বাধ্য জগতের মানুষ। এটাই সত্যের বাস্তবতা। এখন এটা থেকে শিক্ষা গ্রহন করা বা না করা সেটা আপনার বিষয়।

আজ বোখারা-সমরকন্দ, গ্রানাডা আর কডোর্বা কেবলি ইতিহাস। বেদনার নীল পাঠ। বোবা কান্না আর দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। নির্মম এক বেদনার অশ্রু বিরহগাথা । সমরখন্দ -বোখারার মাদরাসার ভগ্ন দেয়ালে আজো লেখা, সে কান্নার কাহানী। নিজেদের লোকদের হাতে নিষ্টুরতা আর পরাজয়ের ইতিহাস। ভুলের খেসারত দিতে দিতে আমরা মাথার মুকুট হারিয়েছি দজলা,ফোরাত আর তাউসিবিয়ার রক্তাক্ত তীরে।

দুই.
কেন এমনটি হয়েছিল?
ইতিহাসের পাতায় পাতায়, আমি বহু খোঁজেছি সে কারন।
যা পেয়েছি তা হল,
বোখারা যখন জ্ঞান, বিজ্ঞান ও এলেম চর্চা এবং তাসাউফের মুসলিম মনীষাদের দাপট চলছিল। তখন অপশক্তির চোঁখ পরে সেখানে। তারা সরাসরি যুদ্ধে না এসে বেঁচে নেয় ভিন্নপথ। টার্গেট করে কিছু দুনিয়ালোভী আলেমদের। অপরদিকে শিল্প সংস্কৃতিতে ক্রমশ অবরোদ্ধ হতে হতে যখন তরুনরা উলামাদের হাতছাড়া হবার পথে, তখন সেখানকার উলামারা বাতিলদের চক্রান্তে নিজেরা নিজেদের মাঝে লড়াইয়ে মেতে উঠেন। আলেমরা ধর্মীয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে পারস্পরিক চরম মতবিরোধে লিপ্ত হয় পড়েন।
এ মতবিরোধ পারস্পরিক হিংসা-বিদ্ধেষে রূপ নিয়েছিল। একে অপরের উপর কুফরি ফতোয়া, বাতিল, দালাল, নাস্তিক মুরতাদ বলার প্রচলন বেড়ে গিয়েছিল। আলেমরা একে অপরকে ঘায়েল করা নিয়ে প্রচণ্ডভাবে সোচ্ছার হয়ে পড়লেন। নিজেকে একমাত্র হকের জান্ডাবাহী প্রমানে, অন্যকে বাতিল, গোমরা নির্ণয়ে ব্যস্ত জীহাদে সময় পার করতে লাগলেন।

ক্রমশ এই বিভিষিকাময় পরিস্তিতে আওয়াম, দ্বীনদ্বার মুসলমানরা আলেমদের উপর থেকে আস্থা হারাতে লাগল। কিছু আলেমরা শায়েখদের নাম ব্যাবহার করে বাতিলের ক্রিড়নকে পরিনত হলেন। নানান অপকর্মে জড়িয়ে পড়লেন। তাগুতের সাথে প্রকাশ্যে গোপনে নিজেদের স্বার্থের জন্য আতাত শুরু হতো থাকল। যে আলেম দুদিন আগে একটি বিষয়কে হারাম বলতেন, তিনিই দুদিন পর হারাম বলতে থাকেন। আওয়ামরা তাদের মতের উল্টো গেলেই তার জানাজা পড়া বন্ধ করে দিতেন। মসজিদে তালামেরে দিয়ে তা নিজের দখলে রাখতে কুন্ঠিত হতেন না কেউ কেউ। মসজিদে আলেমদের হাতেই নিগৃহীত হতেন বাবা চাচার বয়েসের মুরুব্বিরা। এক কথায় আলেমদের মতামতের উল্টো কথা বললেই বাতিল বলে তিনি আহলে এলেমদের হাতে নির্যাতিত হতেন। যা ছিল ওয়ারাসাতুল আম্বিয়াদের শানের খেলাফ। বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন কেউ কেউ বাতিলের নানা কুটচালে, ইতিহাস তাই বলে।

একেক করে আলেমদের নানান আচরনে কুলষিত হতে থাকল নিজেদের অহংকার আর গর্বের স্থানগুলোকে। এপরিস্থিতে আর হট্টগুলের কারনে দেশ বিদেশ থেকে আলেমদের কাছে দ্বীন শিখার জন্য সাধারন মানুষের আসা বন্ধ হতে শুরু করে। আলেমরা বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পরলেন। ‘ঘোড়ার গুস্ত খাওয়া মাকরুহ না মুবাহ’ এরকম মামুলি বিষয় নিয়ে তখন বিশাল বিশাল বাহসের অনুষ্টান চলতে লাগল। সমাধান না হয়ে সেখানে দুপক্ষে খুন খারাবী হতে থাকল। কাকে পরাজিত করে কে বিজয়ী হবে এ নিয়াই ছিলেন তারাঁ মত্ত। দেশ দখল হয়ে যাচ্ছে, তরুনরা বিগড়ে যাচ্ছে, চারদিকে বাতিল শক্তি চড়াও হচ্ছে অথচ এ নিয়ে তাদেঁর চিন্তা করার সময় ছিলনা মোটেও।

ফলে ইতিহাস বলে, যে দ্বীনদ্বার মানুষটি শায়খের পা ধুয়ে দিত, অযুর পানি ঢেলে দিত পরম শ্রদ্ধা আর যতনের সাথে, সেই লোকটিই একদিন খোলা তরবারি হাতে এসে এই বুজুর্গের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করল চরম ঘৃনা আর আক্রোশ নিয়ে। সাধারন মানুষদের হাতে, নিজেদের গোলাম প্রকৃতির লোকদের হাতেই একের পর এক নির্মমভাবে খুন হতে থাকেন বড়বড় আলেমরা। ভাবতে পারেন আওয়ামদের কাছে আলেমদের নিয়ে কি পরিমান ঘৃনার মাস্যাজ পৌছেছিল। ফলাফল: বাতিল খুশি হল, দ্বীনের পরাজয় হল।

তিন.
জগতখ্যাত পণ্ডিত সৈয়দ আবুল হাসান আলী মিয়া নদভী রহ. একবার উলামায়ে কেরামের মজমায় বলেছিলেন, ‘আপনারা যদি সাধারন মানুষের সাথে না মিশেন, তাদের মনের ভাষা ও মেজাজ না বুঝে কথা বলেন। তাহলে একদিন এতোটাই দুরত্ব তৈরি হবে আলেম ও আওয়ামদের মাঝে, যে তাদেরকে আলেমদের ভাষা বুঝাতে দুভিষীর প্রযোজন হতে পারে। আপনারা যদিও ভাববেন সাধারন মানুষ আপনাদের বয়ান বুঝছে কিন্তু বাস্তবে তারা দুভাষীর উপর নির্ভর করে চলবে। তারা আপনাদের বয়ানের যে তরজমা জনগনের সামনে পেশ করবেন তারা সেটাই গ্রহন করবে। ইতিহাস দেখুন সমরকন্দ -বোখারাতে তাই হয়েছিল। একটা সময় জনগন আর আলেমদের কথাকে গ্রহন করেনি।”

ইতিহাস পাঠে জানা যায়, বোখারা পতনের আগে, আলেম আর আওয়ামদে মাঝে বাতিল শক্তি যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি করতে থাকে। আলেমদের ভাষা তখন এতো কটিন থেকে কটিন হতে থাকে জনগন কেবল বিগড়াতে থাকে। আলেমরা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধি ও নিজেদের মাঝে মতনাক্যে এত বেশি জড়িয়ে পড়েন জনগন তখন তাদের হাত ছাড়া হয়ে যায়। এমনকি অনেক আলেম তখন বাতিলের ক্রীড়নক হতে শুরু করেন। তাদের আচরনগুলো এমন ছিল, যাতে জনগন আলেমদের উপর থেকে আস্থা ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ উঠিয়ে নেয়। বড় বড় আলেমদের নাম ব্যাবহার করে তখন চলতে থাকে আলেম আওয়ামদের মাঝে দুরত্ব সৃষ্টির নীল নকশা।

বুখারার ইতিহাস পাঠ করে জানা যায়,লেলিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় যখন কমিউনিষ্টরা ক্ষমতায় আসে সে সময় বোখারা ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র ছিল। সারা বিশ্ব থেকে ছাত্ররা সেখানে দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণের জন্য যেত। একমাত্র বোখারায় অসংখ্য এমন মাদ্রাসা ছিল, যেসব মাদ্রাসায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার পর্যন্ত ছাত্র পড়াশোনা করত। বুখারার কেন্দ্রীয় মাদরাসা এত বিশাল ছিল যে, একমাত্র সহীহ বুখারীর দারস নিত একসাথে ৪০০০ হাজার ছাত্র বসে। কমিউনিষ্টরা ক্ষমতায় গিয়ে এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর দিকে নজর দেয়। তারা সামরিক হামলা করে একের পর এক ভূখন্ড দখল করে নেয়। এক পর্যায়ে তারা অবরোধ করে বোখারা।

বোখারার কেন্দ্রীয় মাদরাসা চত্বরে হাটু সমান রক্ত জমে গিয়েছিল। দিনব্যাপী আলেমদের পাইকারীহারে হত্যার পর বিকেল বেলা কমিউনিষ্টরা শহরের সাধারণ মানুষদের বোখারার বাজারে সমবেত করে। তাদের সামনে একটা লাশের খাটিয়া এনে রাখা হয়। তাতে একখন্ড কাঠ চাদর মুড়ি দিয়ে ঢেকে রাখা ছিল। এরপর বোখারার সাধারণ মুসলমানদের ওপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। মসজিদ মাদরাসা তালাবদ্ধ করে দেয়া হয়। আযান, নামায, রুজা, হজ্জ, যাকাত নিষিদ্ধ করা হয়। কুরআন পড়া আরবী শেখা, মুসলিম পরিচয় দেয়া, দাঁড়ি রাখা সবকিছু নিষিদ্ধ করা হয়। মুসলিম নাম পাল্টে রাশিয়ান নাম রাখা হয় কেউ মারা গেলে লাশ ইলেকট্রিক চুল্লিতে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়া হত, লাশ দাফন করার পর্যন্ত অনুমতি ছিল না। এমনি নির্যাতন চলে প্রায় ৭০ বছর।

এরপর বোখারা,সমরকন্দ সহ মধ্য এশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হয়ে গেলে হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ রহ. এর সময় সেখানে বাংলাদেশের তাবলীগ জামাত যাতায়াত শুরু করে। তারা আবার নতুন করে দ্বীনে ভিরতে থাকে। ভগ্ন মসজিদগুলো সংস্কার হয়ে মুবাল্লিগদের দ্বারা আবাদ হতে থাকে। মসজিদে মসজিদে আযান হতে শুরু হয়। নতুন করে বাচ্ছাদের মাদরাসা শুরু হয়।

আমি ভাবছি আমরা আজ সে পথে হাটছেন কি না। গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে সেখানকার দ্বীনদ্বার মেধাবী শত শত ছাত্রের সাথে আলাপ করে যতটুকো বুঝেছি লক্ষ লক্ষ ছাত্রের শতকার একজনও চলমান সময়ে আলেমদের ভাষা ও কথা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আলী মিয়া নদভী রহ কথা যেন অক্ষরে অক্ষরে আজ ফলে যাচ্ছে।

পর্ব -১
চলবে…

দয়াময়। এই খারাপ অবস্থা থেকে পানাহ চাই তোমার দরবারে। তুমি কঠিন পরিক্ষা আর বেজ্জতির থেকে দুনিয়া আখেরাতে আমাদের হেফাজত কর। আমিন।

Advertisements

3 thoughts on “বাংলাদেশের আলেমরাও কি ক্রমশ সমরকন্দ-বোখারার পথেই হাটছেন?

Leave a Reply